ছোটবেলায় মা যখন অফিসে যেতেন, বাবাই আমাদের সামলাতেন। আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, পড়ে গেলে ওষুধ লাগিয়েছেন।
প্রথম ‘অ আ ক খ’ শিখে যখন ‘বাবা’ বলেছিলাম, তাঁর মুখটা খুশিতে ভরে গিয়েছিল। অফিস থেকে ফিরে চা না পেলে, খবরের কাগজ বা টিভির রিমোট না পেলে বাবা রাগ করতেন। এখন বুঝি—রাগ না, ওটা ছিল আমাদের কাছে আবদার। বাবার সঙ্গে মেলায় গেছি, বৃন্দাবন, আগ্রা, দিল্লি বেড়াতে গেছি।
পূজার সময় বাবা হাতে অল্প কিছু পকেট মানি দিতেন। তা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ফুচকা খাওয়া, মেলায় খেলনা কেনার আনন্দই আলাদা। বাবার রাগ খুব বেশি। মায়ের সঙ্গে ঝগড়া হলে সেই রাগটা আমাদের ওপর এসে পড়ত।
পড়া ভুল হলে বা কোনো ভুল কাজ করলে বাবা মারধরও করতেন। আমি একটু মোটা বলে বাবার কিছু মন্তব্যও আমাকে খুব কষ্ট দিত। একবার একটা অনুষ্ঠানে আমাদের সবাইকে ব্যাগ দেওয়া হচ্ছিল। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে দেখলাম সবাই তিন-চারটি করে নিয়ে যাচ্ছে। লোভ সামলাতে না পেরে আমিও একটা অতিরিক্ত ব্যাগ নিয়েছিলাম।
দেখে বাবা ভীষণ রেগে সবার সামনে খুব বকা দেন। বলেছিলেন, ‘তুমি চুরি করলে কেন?’ ভয় পেয়ে বলেছিলাম, ‘সবাই তো নিচ্ছে, তাই নিলাম।’ কিন্তু বাবা কোনো অজুহাত শোনেননি। পাশাপাশি তাঁর মনটা অসম্ভব নরম। বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলাম একটা ফোন কিনে দিতে। গত পূজায় আমাকে ফোন আর একটা স্মার্ট ওয়াচ কিনে দিয়েছিলেন। আজকাল বাবাকে খুব একটা কাছে পাই না। রাতেও কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাবাকে খুব একটা চোখের সামনে পাই না বলে মাঝেমধ্যে তাঁকে দেখলে একটা আলাদা ভয় ও দূরত্ব কাজ করে। পিছুটান বা জেদ ছাড়ানোর জন্য বাবা আমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখাতেন, পরীক্ষার সময় পড়া না হলে ‘বাড়ি থেকে বের করে দেব’ বলেও ভয় দেখাতেন। রাত করে বাড়ি ফিরলে খেতে দিতেন না। শাস্তি দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে সারা দিন বিদ্যুৎ ও এসি বন্ধ করে রাখতেন। বাবা মানুষ হিসেবে বড্ড জটিল। কখনো খুব আপন, কখনো খুব কঠিন। জানি বাবা সব সময় আমাকে বোঝেন না। তবু বাবা, তোমায় ভালোবাসি।
Publisher & Editor