শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

ফুসফুস ক্যান্সারের টিকার আন্তর্জাতিক পরীক্ষা শুরু, প্রথম রোগীর শরীরে প্রয়োগ

প্রকাশিত: ০৫:০৯, ০১ আগস্ট ২০২৬ | ১৪

ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসায় মানুষের ওপর প্রথমবারের মতো ক্যান্সারের টিকার আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ল্যাটারব্রিজ ক্যান্সার সেন্টার (সিসিসি) এবং লিভারপুল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস সেন্টারের গবেষক ও চিকিৎসকেরা।

গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ টিকা নিয়ে কাজ করছেন, যা প্রতিটি রোগীর শরীরে থাকা ক্যান্সার টিউমারের আলাদা জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়। ফলে একই ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেও প্রতিটি রোগীর জন্য টিকাটি আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হবে। অর্থাৎ টিকাটি হবে ব্যক্তিভিত্তিক। গবেষণার অংশ হিসেবে উন্নত পর্যায়ের নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক রোগীর শরীরে এই ব্যক্তিভিত্তিক টিকা প্রথমবারের মতো প্রয়োগ করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি, যিনি এই নতুন ধরনের ক্যান্সারের টিকা গ্রহণ করেছেন। গবেষকদের মতে, ওই রোগীর ক্ষেত্রে আগে ইমিউনোথেরাপি কিছুটা কাজ করলেও পুরোপুরি সফল হয়নি। নতুন এই টিকার লক্ষ্য হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করে ক্যান্সারের টিউমার শনাক্ত করা এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে সাহায্য করা। এই টিকা তৈরিতে আধুনিক কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রথমে রোগীর টিউমারের জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে ক্যানসারের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর জন্য আলাদা টিকা তৈরি করা হয়। এতে ‘ডগিবোন ডিএনএ’ (ডিবিডিএনএ) নামে পরিচিত একটি কৃত্রিম ডিএনএ প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে দ্রুত, কম খরচে এবং বড় পরিসরে ব্যক্তিভিত্তিক ক্যান্সারের টিকা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার মানুষের নন-স্মল সেল ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়ে।

আর বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এমন ক্যান্সারের মধ্যে তৃতীয়।
 
‘নিওভ্যাক’ নামে এই প্রথম ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল ২৬ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড অনুদান দিয়েছে। এই গবেষণায় ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী, জিনবিজ্ঞানী, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিশেষজ্ঞ, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসক এবং শিল্প খাতের অংশীদারেরা একসঙ্গে কাজ করছেন। গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্ল্যাটারব্রিজ ক্যান্সার সেন্টারের পরামর্শক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান অটেনসমায়ার এবং অধ্যাপক নাটালিয়া সাভেলিয়েভা। তারা দুজনই লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেমস, মলিকিউলার অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজি ইনস্টিটিউটের সদস্য।

অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান অটেনসমায়ার বলেন, যেসব রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি পুরোপুরি কাজ করে না, তাদের জন্য এই ব্যক্তিভিত্তিক টিকা নতুন আশা তৈরি করতে পারে। এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে টিউমারের এমন অংশ শনাক্ত করতে সাহায্য করবে, যেগুলো আগে সহজে ধরা পড়ত না। ফলে শরীর ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে আরো কার্যকরভাবে লড়াই করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, টিকা তৈরিতে ব্যবহৃত ‘ডগিবোন’ প্রযুক্তি চিকিৎসা তৈরির সময় এবং খরচ দুটিই কমাতে পারে। এতে ভবিষ্যতে আরো বেশি রোগীর কাছে ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।

ক্ল্যাটারব্রিজ ক্যান্সার সেন্টারের মেডিক্যাল অনকোলজি পরামর্শক এবং লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ক্লিনিক্যাল প্রভাষক ডা. কার্লেস এসক্রিউ বলেন, বর্তমানে খুব কম রোগী ইমিউনোথেরাপি থেকে দীর্ঘমেয়াদি উপকার পান। বেশির ভাগ রোগী হয় শুরুতেই এই চিকিৎসায় সাড়া দেন না, অথবা কিছুদিন পর শরীরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়। তার মতে, এই গবেষণার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো এমন রোগীদের জন্য নতুন চিকিৎসার পথ খোঁজা, যারা প্রথমে চিকিৎসায় ভালো সাড়া দিলেও পরে সেই চিকিৎসা আর কার্যকর থাকে না। সফল হলে এই ব্যক্তিভিত্তিক টিকা উন্নত পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor