মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

তীব্র জ্বর হলেও শুরুতে ধরা পড়ে না ডেঙ্গু, যেসব লক্ষণে হবেন সতর্ক

প্রকাশিত: ০৮:২৫, ২১ জুলাই ২০২৬ |

ডেঙ্গু জ্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ালেও, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শনাক্ত করা বেশ কঠিন হতে পারে।

বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এটি বায়ুর মান, পানি সম্পদ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের মতো বিভিন্ন বিষয়কে প্রভাবিত করছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়াগত ঘটনাগুলো এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যা বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে এই পরিবর্তনগুলো ডেঙ্গু জ্বরের আচরণেও নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। এটি এখন আর কেবল বর্ষাকালের পূর্বাভাসযোগ্য কোনো রোগ নয়, বরং বছরজুড়ে থাকা এক আগ্রাসী বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়েছে।

ঐতিহ্যগতভাবে ডেঙ্গুকে প্রধানত বর্ষাকালের রোগ হিসেবেই দেখা হতো। কারণ, ভারী বৃষ্টিপাত এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে এবং এই মশাই ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের ফলে এই মশার ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও প্রজননকাল বৃদ্ধি পেয়েছে। উষ্ণ আবহাওয়া মশার বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, তাদের কামড়ানোর হার বাড়ায় এবং ডেঙ্গু সংক্রমণের সময়কাল প্রলম্বিত করে। এর ফলে এমন সব অঞ্চলেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে, যা আগে মশার বেঁচে থাকার জন্য বেশ শীতল বলে বিবেচিত হতো।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও প্রাথমিক পর্যায়ে এটি শনাক্ত করা সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, র্যাশ বা ফুসকুড়ি এবং সামান্য রক্তপাত। এই লক্ষণগুলো অন্যান্য সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণের মতোই হওয়ায়, অতিরিক্ত পরীক্ষা ছাড়া চিকিৎসকদের জন্য ডেঙ্গু সঠিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকরা বলেন, যদি আপনার টানা হালকা জ্বর থাকে এবং স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করেন, তবে আপনার চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শনাক্তকরণ পদ্ধতিতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আপনার শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ (ভাইরাল লোড) যদি যথেষ্ট বেশি না হয়, তবে পরীক্ষায় তা ধরা নাও পড়তে পারে। এ কারণেই প্রথম চার থেকে সাত দিনের মধ্যে রক্ত পরীক্ষাতেও অনেক সময় ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে চিকিৎসকেরা কিছুটা অনিশ্চয়তায় ভোগেন এবং প্রায়শই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, যদি কোনো চিকিৎসক প্লীহা  সামান্য ফুলে যাওয়া বা প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখেন, তবে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা শুরু করে দেন। কারণ, এই চিকিৎসায় কোনো ক্ষতি নেই। অন্যদিকে, ডেঙ্গু যদি গুরুতর আকার ধারণ করে (যাকে অনেক সময় ব্রেকবোন ফিভার বা হাড়ভাঙা জ্বর বলা হয়), তবে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও জোর দিয়ে বলেন, যদি আপনার দুই-তিন দিন ধরে জ্বর থাকে, যার কোনো স্পষ্ট কারণ নেই এবং জ্বর খুব একটা বেশিও নয়, তবুও আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এটি অন্য কোনো রোগও হতে পারে, তবে সেই মুহূর্তে ডেঙ্গুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী কী?

সংক্রামিত মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ১০ দিন পর সাধারণত ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং তা ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত হঠাৎ করে উচ্চমাত্রার জ্বর আসে। এর পাশাপাশি শরীরে তীব্র ব্যথা, চোখের পেছনে প্রচণ্ড ব্যথা এবং ত্বকে স্পষ্ট ফুসকুড়ি দেখা দেয়। কারও কারও ক্ষেত্রে পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। যেমন—হালকা থেকে মাঝারি বমি বমি ভাব, একটানা বমি হওয়া এবং সম্পূর্ণ ক্ষুধামন্দা।

গুরুতর ক্ষেত্রে, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম-এ রূপ নিতে পারে, যার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

গুরুতর সতর্ক সংকেত বা লক্ষণগুলো হলো:

•    তীব্র পেটে ব্যথা

•    একটানা বমি হওয়া

•    নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত

•    অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ

•    শরীরে পানি জমা

•    রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া

•    চরম অবসাদ বা ক্লান্তি

প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার ৩ থেকে ৭ দিন পর, ঠিক যখন উচ্চমাত্রার জ্বর কমতে শুরু করে, তখনই এই সতর্ক সংকেতগুলো প্রকাশ পায়। জটিলতার ঝুঁকি কমাতে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor