শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

ঝড়ের গতিতে লেখা এক স্বপ্নের গল্প

প্রকাশিত: ০২:৩৯, ১০ জুলাই ২০২৬ | ১০

ফুটবলের ইতিহাসে তাদের অবদান কেবল গোলের সংখ্যায় মাপা যায় না। একটি দৌড়, একটি ড্রিবল কিংবা একটি নিখুঁত পাস পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। উসমান দেম্বেলে সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। বল পায়ে তাঁর গতি বিদ্যুতের ঝলকানি, ড্রিবলিং শিল্পীর তুলির আঁচড়। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে মুহূর্তেই এলোমেলো করে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গার।

১৯৯৭ সালের ১৫ মে ফ্রান্সের ভার্ননে জন্ম নেওয়া মাসুর উসমান দেম্বেলের শৈশব ছিল সংগ্রামের। পশ্চিম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা দেম্বেলের বাবা উসমান সিনিয়র এবং মা ফাতিমাতা দেম্বেলে কখনোই অর্থবিত্তের প্রাচুর্য পাননি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। ছোটবেলায় অনেক সময় পুরোনো বুট পরেই অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে। দারিদ্র্য তার স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি। মা সব সময় ছেলেকে বলতেন, কঠোর পরিশ্রম একদিন সব কষ্টের জবাব দেবে। সেই কথাই আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার একমাত্র ভালোবাসা। স্থানীয় মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল নিয়ে অনুশীলন করতেন। তার অসাধারণ প্রতিভা নজরে আসে ফরাসি ক্লাব রেনের। সেখান থেকেই শুরু হয় পেশাদার ক্যারিয়ার। মাত্র একটি মৌসুম খেলেই তিনি জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন। সেখানেই ইউরোপের অন্যতম বিস্ফোরক তরুণ ফুটবলার হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেন।

২০১৭ সালে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা তাকে বিপুল অঙ্কের ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে দলে ভেড়ায়। এই অধ্যায়টি ছিল সুখ-দুঃখে ভরা। একের পর এক চোট তাকে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে রেখেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, দেম্বেলের ক্যারিয়ার হয়ত শেষ হয়ে যাচ্ছে। সমালোচনা, হতাশা আর ব্যর্থতার মাঝেও তিনি হার মানেননি। কঠোর অনুশীলন আর আত্মবিশ্বাসের জোরে আবারও ফিরে আসেন নিজের সেরা রূপে। ২০২৩ সালে পিএসজিতে যোগ দিয়ে তিনি নতুন করে নিজের ক্যারিয়ারকে উড়ান দেন।

ক্লাব ফুটবলে দেম্বেলের অর্জন ঈর্ষণীয়। বার্সেলোনার হয়ে একাধিক লা লিগা ও অন্যান্য শিরোপা জিতেছেন। বর্তমানে পিএসজির আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান ভরসা তিনি। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তার অবদান অসাধারণ। দুই পায়ে সমান দক্ষতায় ড্রিবলিং, গতি এবং নিখুঁত অ্যাসিস্ট তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতেও তার অবদান অনন্য। ২০১৬ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ২১ বছর বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও শেষ পর্যন্ত শিরোপা অধরা থেকে যায়, তবু তার গতি ও আক্রমণভাগে অবদান ছিল প্রশংসিত।

চলতি বিশ্বকাপে দেম্বেলে আরও পরিণত এক যোদ্ধা। গোলের চেয়ে তার অবদান অনেক বড়। প্রতিটি ম্যাচে তার দৌড়, প্রেসিং, ড্রিবলিং এবং সুযোগ তৈরির ক্ষমতা ফ্রান্সের আক্রমণকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনের বিপক্ষে এবং রাউন্ড অব ১৬-এ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তিনি ছিলেন ফরাসি আক্রমণের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন একের পর এক আক্রমণ। এই বিশ্বকাপে তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ফ্রান্সকে সেমিফাইনালের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

দেম্বেলের খেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অনিশ্চয়তা। তিনি কোন মুহূর্তে ডান দিকে কাট করবেন, কখন বাম পায়ে শট নেবেন কিংবা কখন নিখুঁত পাসে গোলের সুযোগ তৈরি করবেন তা আগে থেকে বোঝা প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডাররাও তাকে থামাতে হিমশিম খান।

দেম্বেলে বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় দলের জন্য খেলতে চাই। গোল করাটা আনন্দের, কিন্তু সতীর্থকে দিয়ে গোল করাতে পারলেও আমি একই রকম খুশি হই।’ -এই একটি বাক্যই তার ব্যক্তিত্বকে তুলে ধরে। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে দলীয় অর্জনই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে দেম্বেলেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘উসমান যখন নিজের সেরাটা খেলতে পারে, তখন তাকে থামানো পৃথিবীর যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।’ আর সাবেক বার্সেলোনা কোচ জাভি হার্নান্দেজ তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন, ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা ওয়ান-অন-ওয়ান ফুটবলার।’

দেম্বেলের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি তার ফেরার গল্প। ইনজুরির কারণে বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। অনেকেই যখন তার ক্যারিয়ার শেষ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তখনই তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসেন। সেই ফেরা আজ বিশ্বের অসংখ্য তরুণ ফুটবলারের জন্য অনুপ্রেরণা।

উসমান দেম্বেলে সংগ্রাম, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। দারিদ্র্য, চোট কিংবা প্রতিকূলতা কোনো কিছুই যে স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না। শুধু ফ্রান্সের নয়, বিশ্ব ফুটবলের কোটি সমর্থকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক অনন্য শিল্পী, যার প্রতিটি দৌড়ে লুকিয়ে থাকে নতুন ইতিহাস লেখার সম্ভাবনা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor