ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ৪৪০ কোটির বেশি টাকার দলীয় তহবিল নিয়ে চলমান আইনি লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা উচ্চ আদালত। আদালত দলটির হিসাব পুরোপুরি সচল করার আবেদন মেনে না নিয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছে। দলীয় কার্যক্রম চালানোর জন্য সীমিত পরিসরে অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও প্রতিটি ব্যয় হবে আদালতের নিযুক্ত বিশেষ কর্মকর্তার অনুমোদনের ভিত্তিতে। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ মিললেও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা আপাতত আদালতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল।বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব বা কোন পক্ষ প্রকৃত দল, সেই প্রশ্ন এই মামলার বিষয় নয়। আদালতের মূল লক্ষ্য হলো তদন্ত চলাকালে আইনগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে দলীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া রোধ করা।এই উদ্দেশ্যে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুব্রত তালুকদারকে বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটির তিনটি প্রধান ব্যাংক হিসাব তার তত্ত্বাবধানে থাকবে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে কোনো অর্থ তোলার আবেদন করা হলে তিনি ব্যয়ের উদ্দেশ্য, প্রয়োজনীয়তা এবং যৌক্তিকতা পরীক্ষা করবেন। তার লিখিত অনুমোদনের পরেই ব্যাংক অর্থ ছাড় করতে পারবে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে মাসিক এক লাখ ২৫ হাজার টাকা সম্মানী দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।শুনানিতে তৃণমূলের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল পরিচালনা করতে নিয়মিত আর্থিক ব্যয় অপরিহার্য। দলীয় হিসাবের প্রতিটি লেনদেন নির্বাচন কমিশন ও আয়কর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। সেই হিসাব স্থগিত করে দিলে রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক সাংগঠনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। তিনি আদালতকে জানান, দলীয় কার্যালয়ের পরিচালন ব্যয়, কর্মচারীদের বেতন, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ার জন্য নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। এসব ব্যয় বন্ধ হয়ে গেলে দল পরিচালনায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।
তদন্তকারী সংস্থার পক্ষে আদালতে বলা হয়, চলমান আর্থিক অনিয়মের তদন্তের অংশ হিসেবেই সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, একটি বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানোর সময় বেশ কিছু সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে আসে। সেই সূত্র ধরেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং প্রায় ৪৪০ কোটি ৪২ লাখ টাকার অর্থ স্থগিত করা হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত একদিকে তদন্তের স্বার্থ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে দলীয় প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে নেওয়ার সুযোগও রেখেছে। আদালত কর্মচারীদের বেতন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় এবং মামলাসংক্রান্ত খরচের জন্য অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ কর্মকর্তার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্দেশের মাধ্যমে আদালত তদন্ত প্রক্রিয়াকে অক্ষুণ্ন রেখেই রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে থামিয়ে দেয়নি। আবার দলকেও স্বাধীনভাবে তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেয়নি। ফলে দুই পক্ষের স্বার্থের মধ্যে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ কোনো বড় রাজনৈতিক দলের আর্থিক লেনদেন আদালতের নিযুক্ত কর্মকর্তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এতে তদন্তের স্বচ্ছতা যেমন বজায় থাকবে, তেমনি প্রতিটি ব্যয়ের হিসাবও আদালতের নজরদারিতে থাকবে। মামলার পরবর্তী শুনানি সেপ্টেম্বর মাসে হওয়ার কথা রয়েছে। ততদিন পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বহাল থাকবে। ফলে আগামী কয়েক মাস তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্ত আদালতের নিযুক্ত বিশেষ কর্মকর্তার অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে।
Publisher & Editor