শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

একটি স্বপ্ন বাঁচবে, আরেকটি ভেঙে যাবে

প্রকাশিত: ০২:৩৮, ১০ জুলাই ২০২৬ |

আজ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ হবে না। একটি যুগের পরীক্ষা, একটি দেশের স্বপ্ন আর একটি প্রজন্মের আবেগ জড়িয়ে থাকবে। জয় শুধু সেমিফাইনালে ওঠা নয়, জয় মানে ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় লেখা। হার মানে কোটি মানুষের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস।

বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কোয়ার্টার-ফাইনালে তেমনই এক মহারণ অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশ সময় শনিবার দিবাগত রাত ১টায় লস অ্যাঞ্জেলেসের ইনগেলউডের সোফি স্টেডিয়ামের ঝলমলে আলোয় মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই শক্তিশালী দল ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং রুডি গার্সিয়ার নেতৃত্বে নতুন স্বপ্ন দেখা বেলজিয়াম।

শেষ বাঁশি বাজার পর একটি দল পৌঁছে যাবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। অন্য দলটি বিদায় নেবে অপূর্ণতার বেদনা নিয়ে। লড়াই শুধু ৯০ মিনিটের নয়, সাহস, কৌশল, ধৈর্য এবং স্বপ্নেরও লড়াই।

ম্যাচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চার দশকের পুরোনো এক স্মৃতি। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও বেলজিয়াম। অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচ টাইব্রেকারে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে শেষ চারে উঠেছিল বেলজিয়াম। সেই হার আজও স্প্যানিশ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে গেঁথে আছে। প্রায় চল্লিশ বছর পর আবার বিশ্বকাপের শেষ আটে দেখা। এবার কি প্রতিশোধ নেবে স্পেন, নাকি ইতিহাস আবারও বেলজিয়ামের পক্ষেই হাসবে?

পরিসংখ্যান স্পেনের দিকেই ঝুঁকে আছে। দুই দলের ২৩টি মুখোমুখি লড়াইয়ে স্পেনের জয় ১২টি, বেলজিয়ামের মাত্র ৫টি। ছয়টি ম্যাচ ড্র হয়েছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পরিসংখ্যান খুব কমই শেষ কথা বলে। একটি ভুল, একটি নিখুঁত পাস ,একটি জাদুকরী মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ইতিহাস।

লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন এই বিশ্বকাপে শিল্প আর শৃঙ্খলার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। বল দখল, দ্রুত পাস, নিখুঁত প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষকে ধৈর্যের সঙ্গে ভেঙে ফেলার যে দর্শন স্পেনের ফুটবলের পরিচয়, সেটাই আবারও দেখা যাচ্ছে এই দলে। তারা ম্যাচ জিতছে না, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও প্রতিষ্ঠা করছে।

পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠা স্পেন শিরোপার অন্যতম দাবিদার। দলের প্রতিটি বিভাগ যেন একে অন্যের পরিপূরক। রক্ষণে দৃঢ়তা, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণে সৃজনশীলতা স্পেনকে ভাঙা যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন।

দলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই লামিন ইয়ামাল। কিশোর বয়সেই তিনি ভবিষ্যতের ফুটবলের প্রতীক। তার পায়ের গতি, ড্রিবলিং এবং ভয়হীন মানসিকতা প্রতিটি ম্যাচেই নতুন বিস্ময়ের জন্ম দিচ্ছে। মাঝমাঠে পেদ্রির নিখুঁত পাসিং, রদ্রির নেতৃত্ব, মিকেল মেরিনোর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মিকেল ওয়ারসাবালের সৃজনশীলতা স্পেনকে দিয়েছে এক অনন্য ভারসাম্য।

বেলজিয়ামকে অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। এই দলটি এখন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী দলগুলোর একটি। তাদের যাত্রাপথই সেটির প্রমাণ। রাউন্ড অব ৩২-এ সেনেগালের বিপক্ষে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেও তারা পিছিয়ে ছিল ০-২ গোলে। অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ৩-২ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় রেড ডেভিলসরা।

শেষ ষোলোতে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে। এই বদলে যাওয়ার গল্পের অন্যতম মুখ থিবো কর্তোয়া। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই গোলকিপার স্পেনকে খুব কাছ থেকে চেনেন। আতলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দীর্ঘ সময় খেলেছেন তিনি। গত এক যুগের বেশি সময় তার কেটেছে স্পেনেই।

কর্তোয়ার কণ্ঠে তাই প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মবিশ্বাসও। তার ভাষ্য, ‘স্পেন অবশ্যই ফেভারিট। বল দখল, দ্রুত প্রেসিং এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে তারা অসাধারণ। আমাদের দলেও এমন অনেক ফুটবলার আছে, যারা এক মুহূর্তেই ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে। তাদের রক্ষণে যে ছোট ছোট ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে, সেটাই কাজে লাগাতে হবে।’

বিশ্বকাপে অঘটন যে প্রতি আসরেই ঘটে, সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন কর্তোয়া। ব্রাজিল, জার্মানি, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের বিদায়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, ‘এবারও নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব। ইউরো চ্যাম্পিয়নদের বিদায় করাতে পারলে সেটি হবে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি।’

ম্যাচে ব্যক্তিগত লড়াইটাও হবে সমান আকর্ষণীয়। একদিকে লামিন ইয়ামালের বিস্ময়, পেদ্রির শিল্প, রদ্রির নেতৃত্ব এবং মিকেল মেরিনোর নির্ভরতা। অন্যদিকে কেভিন ডি ব্রুইনার অভিজ্ঞতা, জেরেমি ডকুর বিস্ফোরক গতি, রোমেলু লুকাকুর শক্তিমত্তা এবং থিবো কর্তোয়ার অদম্য নৈপুণ্য।

ডি ব্রুইনার জন্য হয়ত এটি শেষ বিশ্বকাপ। অন্যদিকে ইয়ামালের জন্য এটি বিশ্ব ফুটবলের নতুন রাজপুত্র হয়ে ওঠার আরেকটি সুযোগ। কৌশলগত দিক থেকেও ম্যাচটি হবে ভিন্ন দুই দর্শনের সংঘর্ষ। স্পেন চাইবে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তুলতে। ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ে তুলে সুযোগ তৈরি করতে। অন্যদিকে বেলজিয়াম অপেক্ষা করবে একটি ভুলের জন্য। বল পেলেই বিদ্যুৎগতির পালটা আক্রমণে স্পেনের রক্ষণ ভেঙে দিতে চাইবে তারা।

সম্ভবত মাঝমাঠের লড়াইটিই নির্ধারণ করবে ম্যাচের ভাগ্য। রদ্রি ও পেদ্রি যদি ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে স্পেন এগিয়ে থাকবে। আর যদি ডি ব্রুইনা ও ডকু দ্রুত ট্রানজিশনে সফল হন, তাহলে বেলজিয়ামও ইতিহাস গড়তে পারে।

নকআউট ম্যাচে নায়ক আর খলনায়কের ব্যবধানের সময় মাত্র একটি মুহূর্ত। একটি গোললাইন ক্লিয়ারেন্স, একটি দুর্দান্ত সেভ, একটি নিখুঁত কর্নার কিংবা একটি অসাধারণ ফিনিশই লিখে দেয় নতুন ইতিহাস।

লস অ্যাঞ্জেলেসের রাত শেষ হবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। এই রাতের গল্প হয়ত বহু বছর ধরে বলা হবে। হয়ত এই রাতেই আরও বড় তারকা হয়ে উঠবেন লামিন ইয়ামাল। হয়তো কেভিন ডি ব্রুইনা শেষবার প্রমাণ করবেন এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার তিনি। একটি দেশের পতাকা উড়বে আনন্দে। অন্য দেশের পতাকা নেমে আসবে নিঃশব্দ বিষাদে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor