সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপে রাজনীতি, রাজনীতির বিশ্বকাপ

প্রকাশিত: ০৭:১৫, ১৫ জুন ২০২৬ | ১৪

মুখে বলার সময় সবাই বলেন, ‘খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি মেলাবেন না। খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখুন।

’ কাজের সময় সবাই নিজ নিজ সুবিধামত রাজনীতিটা সেরে নেন। উত্তর আমেরিকার তিন দেশে বসেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। ফিফা বিশ্বকাপ এমনিতেই বড়। আর এবারের বিশ্বকাপ সেই বড়রও বড়।

এবারই প্রথমবারের মতো তিনটি দেশে বসেছে বিশ্বকাপের আসর। এবারই সবচেয়ে বেশি ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে। এবারই সবচেয়ে বেশি ১০৪টি ম্যাচ হবে, আগের বিশ্বকাপের চেয়ে ৪০টি বেশি।
বলছিলাম রাজনীতির কথা।

কোনোকিছুই আসলে রাজনীতির বাইরে নয়। আর যেখানে বিশ্ব মোড়ল ডোনাল্ড ট্রাম্প আছেন, সেখানে রাজনীতি না থেকে পারেই না। এবার সবচেয়ে বড় সংশয় ছিল ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েই। যুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের সম্পর্কে এমন তিক্ততা ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ভিসা দেবে কিনা, দিলেও ইরান আসবে কিনা; সংশয় ছিল তা নিয়েই। ইরান দল শর্তযুক্ত ভিসা পেলেও সমর্থকরা দলের খেলা দেখতে যেতে পারেননি।

ইরানকেও তাদের বেজক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোতে সরিয়ে নিতে হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছিল, ইরান দলকে একদিনের ভিসা দেওয়া হবে। তাদের যুক্তরাষ্ট্রে এসে খেলা শেষে আবার দিনেই দিনেই বেজক্যাম্পে ফিরে যেতে হবে। পরে অবশ্য ভিসার মেয়াদ একদিন বাড়ানো হয়েছে। যেদিন খেলা তার আগের দিন ইরান যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি পাবে।
সোমালিয়ার শীর্ষ রেফারি ওমর আবদুল কাদির আরতান এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মায়ামি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য দেশে ফিরে বীরোচিত সংবর্ধনা পেয়েছেন আরতান। ফিফা ও উয়েফাও আরতানের এই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও ফিফা তাকে তার পূর্ণ ফি দেবে। আর উয়েফা তাকে উয়েফা সুপার কাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় রাজনীতিটা হলো আঞ্চলিক, মানে তিন যৌথ আয়োজকের মধ্যেই। দুই প্রতিবেশী মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তিক্ততায় ঠাসা।
 
গত ডিসেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সেলফিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিতে হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। কিন্তু এই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল অনেক ক্লেদ আর তিক্ততা। শুরুতে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য আলাদাভাবে আবেদনের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরে তারা ’ইউনাইটেড বিড’ নামে একসঙ্গে আবেদন করে এবং ভোটাভুটিতে জিতেও যায়। কিন্তু তাতে তিন দেশের সম্পর্কের খুব একটা উন্নতি হয়নি। হবেই বা কিভাবে, ট্রাম্প সবসময় নিজেকেই সবার সেরা ভাবেন। 

তিনি ঘোষণা করেছেন, তার দেশই এ অঞ্চলের প্রধান শক্তি। লাভের পাল্লাটাও যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই বেশি। তিন দেশের ১৬টি শহরে ১০৪টি ম্যাচ হবে। এর মধ্যে মেক্সিকো আর কানাডা পাবে মাত্র ১৩টি করে ম্যাচ। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, ফাইনালসহ নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচসহ মোট ৭৮টি ম্যাচই হবে যুক্তরাষ্ট্রে।

সেলফিতে যতই হাস্যোজ্জ্বল দেখাক ক্লডিয়া শেইনবাউম আর মার্ক কার্নি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রথম টার্গেট তারাই ছিলেন। এছাড়া বাণিজ্য, অভিবাসন, মাদকপাচার, মানবপাচারসহ নানা বিষয়ে তিন দেশের মধ্যে থাকা সমস্যাগুলোও তিক্ত বাস্তবতা।

আগে থেকেই মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত বিশ্বের উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি। আর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি সেই উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢেলেছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য করার আকাঙ্ক্ষার কথা বললে বড় এই প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও তিন দেশের আন্তঃসম্পর্কের টানাপড়েন আছে।
 
আপাতত সব রাজনীতি ভুলে বিশ্ব বুঁদ হয়ে আছে ফুটবলে। তিন যৌথ আয়োজকের সমস্যাগুলো চাপা পড়লেও মিটে যায়নি। একটি সফল বিশ্বকাপ আয়োজন তিন প্রতিবেশী দেশকে আরো কাছেও আনতে পারে। তাহলেই সফল হবে ফুটবল কূটনীতি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor