শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বাংলাদেশের অসমাপ্ত বিপ্লব

প্রকাশিত: ০৮:০৫, ০৫ জুন ২০২৬ | ১২

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ‘কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ তাদের ওয়েবসাইটে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। “বাংলাদেশ’স আনফিনিশড রেভোল্যুশন’’ শিরোনামে এই প্রবন্ধ লিখেছেন অবিনাশ পালিওয়াল। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য লেখাটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।

ভূমিকা
২০২৫ সালের বড়দিনে এক বিশাল উচ্ছ্বসিত জনসমুদ্রের সামনে তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’ ওই সময়েই তাঁর ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটেছিল। এর দুই মাসের কিছু কম সময় পর ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।

বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টি আসন পায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পায় ৬৮টি আসন। নতুন ছাত্র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) লাভ করে ৬টি আসন। এই ভোট ছিল প্রায় দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এর আগে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ এমন নির্বাচনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ক্ষমতায় বসার পর হাসিনা উত্তরোত্তর কর্তৃত্ববাদী উপায়ে ক্ষমতা সুসংহত করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে এক গণ-অভ্যুত্থানের পর তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন।

শুধু নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর বাইরেও আরও একটি বড় বিষয় ঘটেছে। সেটি হলো, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জুলাই সনদ নিয়ে আয়োজিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোট এর পক্ষে পড়ে। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের নামানুসারে প্রণীত এই সনদে সাংবিধানিক, নির্বাচনী ও প্রশাসনিক সংস্কারের একটি প্যাকেজ রয়েছে, যা কিনা নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাব করেছিল।

জুলাই সনদের উদ্দেশ্য ছিল একজনের হাতে বা এক জায়গায় অতিরিক্ত ক্ষমতা জমা হওয়া বন্ধ করা। এ জন্য কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যেমন প্রধানমন্ত্রী কতবার ক্ষমতায় থাকতে পারবেন, তা সীমিত করা; বর্তমান নির্বাচনপদ্ধতির বদলে এমন ব্যবস্থা আনা, যাতে ভোটের অনুপাতে আসন পাওয়া যায়; সংসদকে দুই কক্ষে ভাগ করা; দল থেকে ভিন্নমত দিলেই সদস্য পদ হারানোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করা ইত্যাদি। এসব পরিবর্তনের লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক করা।

# যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্য থেকে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে, সেই একই কাঠামোর মধ্য থেকে তারেক রহমান কি সত্যিই বড় ধরনের সংস্কার করতে পারবেন? # অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা ছাত্রনেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠীর চাপের কারণে ইউনূস এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে বড় রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়।
একই সঙ্গে বিএনপির ফিরে আসা, জামায়াতে ইসলামীর আবার শক্তিশালী হওয়া এবং নতুন দল এনসিপির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ এখন বেশি অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি, সংস্কার, স্থিতিশীল অর্থনীতি ও সত্যিকারের গণতন্ত্র চায়। বড় ধরনের গণ-আন্দোলন বা বিপ্লব (বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ‘মনসুন রেভোল্যুশন’ বলা হয়) সাধারণত অনেক আশা তৈরি করে। কিন্তু বাস্তবে সেই আশা অনেক সময় পুরোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ধাক্কা খায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করেছে। একই সঙ্গে তারেক রহমান প্রায় কোনো বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এটি দেখে মনে হয়, দেশে একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছে। এটা শেখ হাসিনার সময়ের তুলনায় ভিন্ন। কারণ, তখন তিনি প্রায়ই বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন করতেন। তবে এখানেও একটা ধারাবাহিকতা আছে। কারণ, আবার ক্ষমতায় এসেছে একটি পুরোনো দল—বিএনপি। এই দলের নেতা তারেক রহমান হচ্ছেন দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে। উল্লেখ্য, তিনি নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় খালেদা জিয়া মারা যান।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে, সেই একই কাঠামোর মধ্যে থেকে তারেক রহমান কি সত্যিই বড় ধরনের সংস্কার করতে পারবেন?

ভাঙনের পথে
গণ-অভ্যুত্থানের আগের কয়েক মাসে অর্থনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর ভেতরে ব্যাপক উত্তেজনা জমে উঠছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে দেশজুড়ে বিএনপি ও জামায়াত–সমর্থকেরা ব্যাপক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেন। ফলে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ হাসিনা জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াগতভাবে সুষ্ঠু ছিল না বলে অভিযোগ তুলে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।

যদিও ওই মাসেই শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফেরেন, কিন্তু নির্বাচন ঘিরে সহিংস পরিস্থিতি পুরো ব্যবস্থাকে একধরনের ‘প্রেশার কুকার’ পরিস্থিতিতে নিয়ে যায়। কার্যত বিরোধী দলহীন হওয়ায় নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতির কারণে ভুগতে ভুগতে দেশের অর্থনীতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছিল। আর সেনাবাহিনীও এসব পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলন ঘটাতে পারে। এটা তারেক রহমানের সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি আনতে পারেন কি না, সেটি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে। এই চাপ তিনি কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারেন, তাঁর ওপর শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎই নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও নির্ভর করবে।
এই প্রেক্ষাপটেই শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য ৩০ শতাংশ চাকরির কোটা ঘোষণা করেন। এ পদক্ষেপ ছিল একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে সরকার সরাসরি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্তদের পক্ষেই সুবিধা দিতে চায়।

যে দেশে রাষ্ট্র চাকরি সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে এই ঘোষণা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) তরুণ-তরুণীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই তরুণ-তরুণীরা হয় বেকার, না হয় আংশিক বেকার। তাঁদের জন্য সরকারি চাকরি ছিল অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথগুলোর একটি।

শেষ পর্যন্ত ব্যাপক চাপের মুখে এই কোটা প্রত্যাহার করা হলেও কোটা ইস্যুই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হওয়ার চূড়ান্ত প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। পরে শেখ হাসিনা দমন-পীড়নের নির্দেশ দিলে এই আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং সেখানে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার, পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর হাতে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন: সেনাবাহিনী আর আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না; বরং শেখ হাসিনার নির্বাসনে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে। এর পরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে সময়ে বিদেশে থাকা এবং একাধিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়া অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশে ফিরে এলে দেশের নেতৃত্ব তাঁকে দেওয়া হবে।

এর পরবর্তী ১৮ মাস বাংলাদেশের রূপান্তরের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ইউনূস কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি স্থাপন করেন। শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকারসহ নানা ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতির বাইরে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো মূলত দুটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ছিল। তার একটি হলো অর্থনীতি এবং আরেকটি হলো নির্বাচনী রাজনীতি।

ইউনূসের অর্থনৈতিক টিম ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে ঠিক করে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে থাকা ছাত্রনেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠীর চাপের কারণে ইউনূস এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে বড় রাজনৈতিক বিরোধের কারণ হয়। তিনি আওয়ামী লীগের আবার রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেন। ফলে দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার এসে দেশের অর্থনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও সেনাবাহিনীর ভূমিকা—এই তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনে। তবে সব জায়গায় একরকম ফল হয়নি। কিছু জায়গায় উন্নতি বা সাফল্য হয়েছে, কিন্তু অনেক সমস্যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তাই এই তিন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এক নয়—প্রতিটিতে আলাদা অর্জন ও আলাদা অসমাপ্ত সমস্যা আছে।

অর্থনীতি: পরিবর্তনবিহীন স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি বাইরের ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এটি কোনো ছোট অর্জন নয়। এ অর্জনের পেছনের কারণ হলো, এই অর্থনীতি মূলত দুটি আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল—প্রথমটি হলো, তৈরি পোশাক রপ্তানি, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি; আরেকটি হলো ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স।

অর্থনীতির পতনের ধারা শুরু হয় কোভিড মহামারির সময়। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যের প্রভাবে সেই পতন আরও তীব্র হয়। এই দুই ধরনের ধাক্কা আবার শেখ হাসিনা সরকারের কাঠামোগত দুর্নীতির কারণে আরও বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালে শেখ হাসিনা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে এস আলম গ্রুপ ও বেক্সিমকোর জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন করেন। পরে দেখা যায়, এই অর্থের বড় অংশ হয় বিদেশে পাচার করা হয়েছে, নয়তো ঋণখেলাপি হয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

হাসিনার অনুগতরা (যাঁর মধ্যে সংসদ সদস্য এবং ব্যবসায়ীরাও ছিলেন) ডিম, শস্য ও রান্নার তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে কারসাজি করেন। এটি খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তোলে। ২০২৪ সালের আন্দোলন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, তা ছিল কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি এবং কথিত এই ‘ম্যাক্রো-ইকোনমিক মিরাকল’ মূলত হাসিনা-ঘনিষ্ঠ অল্পসংখ্যক কিছু ধনকুবেরেরই লাভ নিশ্চিত করেছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঠিক আগমুহূর্তে সমসাময়িক মূল্যায়ন অনুযায়ী, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও কোটা আন্দোলনের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কার্যত ‘হঠাৎ সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার’ অবস্থায় পৌঁছায়।

এক মাসের এই অস্থিরতায় দেশ আনুমানিক ১০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই প্রতিদিন ১৫ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, যা দিয়ে মাত্র তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল। মাথাপিছু মূল্যস্ফীতি প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছে যায়। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১৪ শতাংশে।

যখন ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন এমনই ছিল অর্থনীতির করুণ অবস্থা। কিন্তু তাৎক্ষণিক ও সহজ সমাধান খোঁজার বদলে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাপক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। তারা ১১টি বড় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় (যার মধ্যে ৭টি ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে) এবং একটি সম্পদ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি শুরু করে। জনগণের আমানত রক্ষার জন্য ২০২৫ সালের ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এমন ক্ষমতা দেয়, যাতে দুর্বল বা ব্যর্থ ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা বা দখল নেওয়া যায়।

নতুন নিয়োগ পাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর (যিনি আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের অর্থনীতিবিদ ছিলেন) দেশের মুদ্রার কৃত্রিমভাবে নির্ধারিত হার বাতিল করেন এবং বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক ভাসমান ব্যবস্থায় (মার্কেট বেজড ফ্লোট) নিয়ে আসেন। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই রেমিট্যান্স প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে আন্ডার-ইনভয়েসিং (কম দাম দেখিয়ে আমদানি-রপ্তানি দেখানো) এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকিও অনেকটা কমে আসে।

২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনার শাসনামলে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রভাব সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া। এই নথিতে বলা হয়, গত ১৫ বছরে হাসিনা সরকার ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুটপাট করেছে এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয় কৃত্রিমভাবে অতিরিক্ত দেখানো হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্প রিজার্ভ সংরক্ষণ করার জন্য একাধিক অবকাঠামো প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করা হয়।

ইউনূস তাঁর ব্যক্তিগত সুনাম ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের আইএমএফ ঋণ নিশ্চিত করেন এবং পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে ১৮ দফা একটি চুক্তি করার মধ্যস্থতা করে, যেখানে ন্যূনতম মজুরি ও শিল্পনিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে এই খাত থেকে এইচঅ্যান্ডএম এবং জারার মতো বৈশ্বিক খুচরা ব্র্যান্ডগুলোর সরে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস ছিল এবং মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি।

এভাবে গভীর সংকটে থাকা অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করা অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়। ফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই কাজ শুরু করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম দিন থেকেই তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট সামলাতে হয়নি। এই স্থিতিশীল পরিস্থিতি তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত থেকে আসা গুরুতর অর্থনৈতিক চাপও তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করার সুযোগ দেয়।

শেখ হাসিনার সময় যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অপব্যবহৃত হয়েছিল, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে এ রায় এখনো কার্যকর করা হয়নি। কারণ, হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে আছেন। আওয়ামী লীগকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার এ দলের অপরাধকে কারণ হিসেবে দেখায়।

নির্বাচন: অবাধ ও সুষ্ঠু, তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়
২০২৬ সালের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এই নির্বাচন অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ভবিষ্যতের একটি রাজনৈতিক সংকটের ভিত্তি তৈরি করে। এটি পুরোপুরি আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হলেও আওয়ামী লীগের এই বাদ পড়া এমন এক অতীতের ধারাবাহিকতাকেই নির্দেশ করে, যেখানে বিরোধী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ ছিল না।

১৯৭১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১, ২০০৮ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য বা কারচুপি ও জবরদস্তিমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলে অত্যন্ত সমস্যাজনক ছিল বলে বিবেচিত হয়। এসব নির্বাচন ব্যাপক ভোট জালিয়াতি এবং বিরোধী পক্ষকে পরিকল্পিতভাবে দমন করার মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল বলে ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত রয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। তাদের অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন, আর কিছু নেতাকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। একই সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়, অনেকে দেশছাড়া হন বা ভয় দেখিয়ে তাঁদের চুপ করিয়ে রাখা হয়, কিংবা সরকারের প্রতি সমর্থন দিতে বাধ্য করা হয়।

এই পদক্ষেপগুলোর ফলে বাংলাদেশের একটি পুরো প্রজন্মের তরুণ তাঁদের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় গিয়ে পৌঁছায়।

শেখ হাসিনার সময় যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) অপব্যবহৃত হয়েছিল, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই একই ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে এ রায় এখনো কার্যকর করা হয়নি। কারণ, হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে আছেন। আওয়ামী লীগকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার এ দলের অপরাধকে কারণ হিসেবে দেখায়।

বর্তমানে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সমস্যা মনে হচ্ছে না। শেখ হাসিনার অতীতের কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা এবং সাম্প্রতিক সময়ের সংবেদনশীলতা, পাশাপাশি তাঁর চলমান নির্বাসন—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব বিষয় খুবই স্পর্শকাতর। তাই আওয়ামী লীগের দ্রুত পুনরুত্থানও এখন অসম্ভব মনে হচ্ছে।

যদিও আইনের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তবু এ সিদ্ধান্ত আগের সময়ে বাংলাদেশের যেসব নির্বাচন নিয়ে সমস্যা ছিল, তার মতোই একটা কাঠামোগত সমস্যায় ফেলার সংকেত দেয়। কারণ, আওয়ামী লীগের এখনো দেশের অনেক জায়গায় সমর্থক আছেন। আর তাঁরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত—এই পরিচিতি তাঁদের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।

যদিও হাসিনা পরিবারের রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, তবু আওয়ামী লীগ সময়ের সঙ্গে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আবারও ফিরে আসতে পারে। কীভাবে, কোন পরিস্থিতিতে, কত সময় পরে এবং কোন কারণে এই পুনরুত্থান ঘটবে, তা এখনো অনুমানসাপেক্ষ। তবে বিএনপির রাজনৈতিক শক্তি যদি ভবিষ্যতে দুর্বল হয় এবং সেই শূন্যতা জামায়াতে ইসলামীও পূরণ করতে না পারে, তাহলে ২০৩১ সালের নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগের আবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আরেকটি বড় বিরোধের বিষয় ছিল ২০২৬ সালের নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথম কয়েক মাসে ইউনূস চেয়েছিলেন সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য চার থেকে পাঁচ বছরের একটি পূর্ণ মেয়াদ দেওয়া হোক। কিন্তু সেনাবাহিনী ও বিএনপি—দুই পক্ষই এ অবস্থানকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।

ইউনূসের মতে, সত্যিকারের সংস্কার করার জন্য এত সময় প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি গঠন করা ছাত্ররা এবং জামায়াতে ইসলামী এই দীর্ঘ সময়কে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক হিসেবে দেখেছিল। কারণ, নির্বাচন যত দেরি হতো, বিএনপির জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তত বাড়ত। এতে জামায়াত ও এনসিপির জন্য নিজেদের ভোটভিত্তি সম্প্রসারণের বেশি সময় পাওয়া যেত।

সেনাবাহিনীর জন্যও দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকাল মানে ছিল—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাজিস্ট্রেসির মতো দায়িত্ব তাদের আরও দীর্ঘ সময় বহন করতে হবে। ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর পুলিশ বাহিনীর ওপর জনগণের ক্ষোভ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তারা কিছু সপ্তাহ কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। পরে ধীরে ধীরে তারা স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরে আসে। পুলিশকে অনেকেই তখন হাসিনার ব্যক্তিগত বাহিনী হিসেবে দেখত। ফলে সেনাবাহিনী যত বেশি সময় রাস্তায় থাকতে বাধ্য হচ্ছিল, তাদের ভেতরেও চাপ বাড়ছিল। কারণ, সেনাসদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশিংয়ের দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী ছিলেন না।

সেনাবাহিনী: হিসাব করা সংযম
২০২৬ সালের নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করে নিজেদের দূরে রাখার মাধ্যমে তাদের পেশাদারি ও ব্যবস্থাগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করে। এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার এই তুলনামূলকভাবে তরুণ গণতান্ত্রিক দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়।

বাংলাদেশে সেনাশাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে এখানে মোট ২৯টি অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহের চেষ্টা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের আগস্ট ও নভেম্বর, ১৯৮২ ও ২০০৭ সালের চারটি অভ্যুত্থানে সফল ক্ষমতা দখল ঘটে।

কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে আন্দোলনকারীদের ওপর শেখ হাসিনার সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ থাকলেও সেনাবাহিনীর দিক থেকে গুলি না চালানোর সিদ্ধান্তকে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের পক্ষ থেকে একধরনের ‘নীরব অভ্যুত্থান’ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

অনেকের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ এমন এক পরিস্থিতিতে ছিল, যেখানে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় ওয়াকার-উজ-জামান দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের তদারকি করেন এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইউনূস তাঁকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা প্রদান করেন।

তবে অতীতের সামরিক শাসনের মূল্য ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ওয়াকার-উজ-জামান দ্রুত বেসামরিক (সিভিল) শাসনে ফিরে যাওয়ার ওপর জোর দেন এবং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে তিনি ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার আশা সীমিত করার উদ্যোগ নেন।

নতুন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
তারেক রহমানের প্রথম মেয়াদে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে। সেগুলো হলো জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির নিজের ভেতর দ্বিধা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক চাপ এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পুরোনো ও জটিল সম্পর্কের প্রভাব।

সব মিলিয়ে বোঝা যায়, ‘বিপ্লব’ বা বড় পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাস্তবে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনেক অংশ এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।

বিএনপি ও জুলাই সনদ
সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপান্তর করার সুযোগ তৈরি হয়। এর জন্য বিএনপির জুলাই সনদ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।

নির্বাচনের আগেই বিএনপি জুলাই সনদের কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি তোলে। সনদে বলা হয়েছিল, উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে প্রতিটি দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, তার অনুপাতে। কিন্তু বিএনপি বলেছিল, এটি হওয়া উচিত নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের অনুপাতে।

# ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারত হাসিনার ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করত, ভারত একজন বেসামরিক স্বৈরশাসককে সমর্থন করছে। # যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলন ঘটাতে পারে। এটা তারেক রহমানের সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। এ ছাড়া সনদে প্রস্তাব ছিল—মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল ও সরকারি কর্ম কমিশনের প্রধান নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা থাকবে না। এসব নিয়োগ সাংবিধানিকভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ করার কথা বলা হয়। বিএনপির মতে, এগুলো সংবিধানে না রেখে সাধারণ আইন দিয়েই ঠিক করা উচিত।

জুলাই সনদে বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্বাচন করবে একটি সব দলের সম্মতিতে (ঐকমত্যে) গঠিত কমিটি। এই কমিটির কাজ হবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। কিন্তু বিএনপি এতে আপত্তি জানায়। তাদের মত ছিল—যদি ওই কমিটির সবাই মিলে একমত হতে না পারে, তাহলে সিদ্ধান্তটা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে নেওয়া উচিত।

জুলাই সনদের এমন অবজ্ঞা মূলত বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে। বিএনপি শুরু থেকে যে বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে ছিল, ক্ষমতায় আসার পর তারা সেগুলোকে শুধু বাতিল বা প্রত্যাখ্যানই করেনি; বরং এমন কিছু প্রস্তাবও তারা পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করছে, যেগুলো তারা আগে সমর্থন করেছিল।

এর একটি উদাহরণ হলো সুপ্রিম কোর্টের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন। আগে বিএনপি এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিল। কারণ, এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করত। কিন্তু এখন বিএনপি এই প্রস্তাব স্থগিত করছে, যাতে বিচার বিভাগের ওপর নিজেদের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়।

মজার বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের যে অধ্যাদেশ বিএনপি ধরে রেখেছে, তা হলো আওয়ামী লীগকে সক্রিয় রাজনীতিতে স্থগিত রাখা। এমনকি তারা অন্তর্বর্তী সরকারের এই নিষেধাজ্ঞাকে আরও আনুষ্ঠানিক করেছে, যাতে দলটির মূলধারার রাজনীতিতে ফেরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিসর সীমিত করে বিএনপি এখন দলটির অবশিষ্ট কর্মী ও নেতাদের নিজেদের দলে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

যদিও এসব পদক্ষেপকে আপাতত বিএনপির ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার স্বল্পমেয়াদি কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবু এগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বিএনপির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দিকেই ইঙ্গিত করে। তারেক রহমান আদালত ও আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চান। পাশাপাশি তিনি বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ধরে রাখতে চান।

বিএনপি সরকারের আরেকটি বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে অপ্রত্যাশিতভাবে সরিয়ে দেওয়া। ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বা ক্যারিয়ার আমলাদের বদলে ওই সংবেদনশীল পদে রাজনৈতিকভাবে অনুগত একজন করপোরেট হিসাবরক্ষককে পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

যদি এসব পদক্ষেপ নিয়মিত প্রবণতায় পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশ আবার সেই ২০০৯-২০১১ সালের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, যখন শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছিলেন এবং বিরোধী দলকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। এ ধরনের প্রবণতা স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখালেও দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে ক্ষয় করে।

বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে নীরব। উভয় দলই সংসদে কঠোর লড়াই করার বদলে নতুন প্রভাবশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের ভোটভিত্তি ও জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। কিন্তু যদি বিএনপি ভবিষ্যতে জামায়াত ও এনসিপির ওপর রাজনৈতিক চাপ ও বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে, তাহলে তা সম্ভবত রক্ষণশীল ও ইসলামপন্থী ধারায় সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলনকে উসকে দেবে।

এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও শাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিএনপির একক হাতে থাকা—সব মিলিয়ে দলটির আধিপত্য আরও শক্তিশালী করছে। যদি বিএনপি জ্বালানি ও সার সংকটকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ না করে সামলাতে পারে, তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি তারা ব্যর্থ হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে, তাহলে বিএনপি আরও কঠোর বা আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

উপসাগরীয় যুদ্ধের ধাক্কা
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। এটি তাঁর সরকারের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও গুরুতর সংকট তৈরি করে।

তেলের দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ঢাকা এখন সার আমদানির জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের দিকে ঝুঁকছে, যাতে সম্পূর্ণ ফসলহানি এড়ানো যায়।

উচ্চ পরিবহন ব্যয়ের কারণে বছরের শেষের দিকে চালের দাম ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি জুলাইয়ের মধ্যে, অর্থাৎ ধান চাষের মৌসুম শুরু হওয়ার আগে সার মজুত আবার পূরণ না করা যায়, তাহলে বাংলাদেশে চাল উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে।

পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে গ্যাসের ঘাটতি কমাতে সরকার ২০২৬ সালের মার্চে কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ করে দেয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ জোগান দেয়। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বড় শিল্প খাত টেক্সটাইল উৎপাদন অনেক কমে গিয়ে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলতে থাকে।

অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা একটি দেশের জন্য এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। ঢাকার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও এই যুদ্ধ বিএনপির অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও তারেক রহমানের হাতে একটি পূর্ণ মেয়াদ রয়েছে এবং তিনি পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করতে চান।

এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ থাকা, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও শাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিএনপির একক হাতে থাকা—সব মিলিয়ে দলটির আধিপত্য আরও শক্তিশালী করছে। যদি বিএনপি জ্বালানি ও সার সংকটকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ না করে সামলাতে পারে, তাহলে তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি তারা ব্যর্থ হয় এবং অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে, তাহলে বিএনপি আরও কঠোর বা আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটি অবশ্যই এক মেয়াদেই ক্ষমতা হারাতে চাইবে না এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে সব ধরনের চেষ্টা করবে। যদিও বর্তমানে রাজনৈতিক ভুলের ঝুঁকি সীমিত, তবু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে।

নয়া দিল্লি, নয়া সম্পর্ক
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি অনেক ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার নীতির মতোই, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলের ইঙ্গিত দেয়। দলটি এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে এবং ভারতের সঙ্গে আবারও শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে। তবে হাসিনার বিপরীতে বিএনপি পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাখছে।

নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার মাধ্যমে বিএনপি তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা একসময় হাসিনা ও ভারতের ঘনিষ্ঠতার বিরোধিতা করত। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারত হাসিনার ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করত, ভারত একজন বেসামরিক স্বৈরশাসককে সমর্থন করছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করেনি। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই পুরোনো বৈশিষ্ট্যগুলো আবারও স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাই একটি ব্যতিক্রম ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশকে আবারও তার পরিচিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ফিরিয়ে এনেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ তাদের মধ্যে দলগত পর্যায়ে একটি বোঝাপড়া তৈরি করে। এই দলীয় বোঝাপড়া ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং আস্থা ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়ে, যখন ভারতের দৃঢ়ভাবে হাসিনাকে সমর্থন করার বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলা যায়, বর্তমানে বিএনপি-বিজেপি সম্পর্ক অনেকটা আওয়ামী লীগ-ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (আইএনসি) সম্পর্কের মতোই গড়ে উঠছে। অর্থাৎ পারস্পরিক আস্থা ও ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগোচ্ছে। আসলে বিএনপি ভারতের বিজেপির শাসন মডেল অনুসরণ করতে চায়, যেখানে বিজেপি ২০১৪ সাল থেকে একক দল হিসেবে ক্ষমতায় আধিপত্য বজায় রেখেছে এবং বিরোধীদের দুর্বল ও বিভক্ত করে রেখেছে। এ কারণেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এটি খুবই অস্বাভাবিক মনে হলেও নয়াদিল্লি জানিয়েছে যে তারা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ঢাকার অনুরোধ বিবেচনা করছে। বিএনপি ও বিজেপি উভয়ই দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ভুল-বোঝাবুঝির সুযোগ কমাতে চায়। তারা যৌথভাবে নিশ্চিত করতে চায়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির অংশ হলেও নিয়ন্ত্রিত একটি শক্তি হিসেবে থাকুক।

আদর্শগতভাবে দেখলে, বিএনপির রক্ষণশীল সেক্যুলারিজম (যা বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুর অধিকার স্বীকার করে) বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে একটি গ্রহণযোগ্য সংযোগের ভিত্তি তৈরি করে। এই বিএনপি-বিজেপি বোঝাপড়াই ২০২৬ সালের এপ্রিলে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্যকে বাড়তে না দিয়ে সম্পর্ককে আবারও অস্থির হওয়া থেকে রক্ষা করে।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এক অভূতপূর্ব জয় পায় এবং আসামে তাদের শক্ত ঘাঁটি বজায় রাখে। বর্তমানে মিজোরাম বাদে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী সব ভারতীয় রাজ্যে বিজেপি হয় সরকারে নেতৃত্ব দিচ্ছে, নয়তো সরকারে অংশীদার।

তবে দলগত পর্যায়ের এই বোঝাপড়া দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো (যেমন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, আন্তরাজ্য যোগাযোগ, নদীর পানিবণ্টন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যঘাটতি) সমাধান করতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

তবে এসব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতা দেখায় যে হাসিনার সময়কার কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি থেকে বাংলাদেশের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা আবার দেশের কাঠামোগত বাস্তবতার শক্তিশালী টানেও আংশিকভাবে ফিরে আসছে।

উপসংহার
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করেনি। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই পুরোনো বৈশিষ্ট্যগুলো আবারও স্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে। ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাই একটি ব্যতিক্রম ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশকে আবারও তার পরিচিত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্যে ফিরিয়ে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও আন্দোলন ঘটাতে পারে। এটা তারেক রহমানের সরকারের জন্য প্রথম বড় পরীক্ষা। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব অর্থনৈতিক উন্নতি আনতে পারেন কি না, সেটি তাঁকে প্রমাণ করতে হবে। এই চাপ তিনি কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারেন, তাঁর ওপর শুধু বিএনপির ভবিষ্যৎই নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও নির্ভর করবে। দেশটি বাইরের ধাক্কা মোকাবিলা করতে পারবে, নাকি সেই ধাক্কায় দুর্বল হয়ে পড়বে, তা-ও তাঁর ওপর নির্ভর করবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor