সম্প্রতি প্রকাশিত ছোট্ট একটা খবর হলো—পাকিস্তান বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কিছু আমলাকে পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিসেস একাডেমিতে ট্রেনিং দিয়েছে। এর সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করছে পাকিস্তান। যদিও বলা হয়েছে, এ প্রশিক্ষণ বাংলাদেশি আমলাদের ‘নেতৃত্ব ও দক্ষতা’ উন্নয়নের জন্য, কিন্তু পাকিস্তানের জন্য এর উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য সুফল আরও প্রসারিত।
বাংলাদেশের আমলারা দেশের বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতি উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া পাকিস্তানের জন্য একটা বড় সুযোগ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমলাদের ট্রেনিং দেওয়ার সুযোগ বা অধিকার ছিল একচেটিয়া ভারতের।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সাহায্য ও সহযোগিতা দিয়েছিল। এই সহযোগিতার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী রাজনীতিবিদ যাঁরা স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরা মনে করেন, ভারতের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে দুর্বল করা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এসেছে, কিন্তু বিরাট একটা পাকিস্তানবান্ধব রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশে রয়েই গেল।
অপর দিকে মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ রাজনীতিও স্বাভাবিকভাবে বিকাশ ঘটল। পাকিস্তান সময়ে ভারতের দুয়ার ছিল বাংলাদেশের জনগণের জন্য পুরোপুরি বদ্ধ—রাতারাতি খুলে গেল ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি, পর্যটন ও সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত।
বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর পাকিস্তান চেষ্টা করেছে বাংলাদেশে নতুনভাবে সুযোগ খুঁজতে আর ভারত চেষ্টা করেছে তাদের পাওয়া সুযোগগুলো ধরে রাখতে। তবে মোটাদাগে বলা যায়, জুলাই আন্দোলনের আগপর্যন্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মোটামুটি একটা স্থিতিশীল পর্যায়ে ছিল। জুলাই আনল বিরাট পরিবর্তন।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর, আমলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো চুক্তিসহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অনেক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। বলা যায়, ইউনূস সরকারের সময় আমদানি বাণিজ্য ছাড়া প্রতিটি খাতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। ভিসা, পর্যটন, কূটনীতি, স্থল করিডর এবং এমনকি ক্রিকেট সম্পর্কেও দেখা গেল নানান সংকট।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জেন-জি প্রজন্ম তীব্র ভারত বিরোধিতায় ঝুঁকে পড়ল। এই পরিস্থিতিতে ইউনূস সরকারের প্রথম থেকেই পাকিস্তান চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের একটা নতুন কাঠামো তৈরি করতে।
অধ্যাপক ইউনূসকেও মনে করা হচ্ছিল পাকিস্তানের একজন ইচ্ছুক অংশীদার, তিনি একাধিকবার পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পাকিস্তান বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও খুঁজে পেল সমর্থনের মনোভাব। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি দারুণভাবে পাকিস্তানবান্ধব এবং বিএনপিকেও কোনোভাবে পাকিস্তানবিরোধী বলা যাবে না। বস্তুত বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টা ছিল পাকিস্তানের জন্য সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: শান্তি ও মর্যাদার অন্বেষণ
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইউনূস সরকারের সময় বাংলাদেশ সফরে আসেন। তিনি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাক্ষাৎ করলেন। তাঁর সঙ্গে আরও আসেন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী। বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, স্বাক্ষরিত হলো বন্ধুত্বের নানান চুক্তি। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মন্ত্রীদের সফর যতটুকু উষ্ণ ছিল, চুক্তিগুলো সে তুলনায় ততটুকু ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ, পাকিস্তানের যে আর্থিক কাঠামো, তা বড় ধরনের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ধারণ করার জন্য সহায়ক নয়।
এ সময় ভারতের কিছুই করার ছিল না। তারা অপেক্ষা করছিল বাংলাদেশের নির্বাচন এবং নতুন সরকারের। বেগম জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর শোক জানাতে বাংলাদেশে এসে জানান দিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইচ্ছুক।
একদিকে বাংলাদেশে নতুন সরকার এসেছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেরই কিছু সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা ধরা পড়েছে।
ভারতের অসুবিধা
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে সুদীর্ঘ সীমান্ত। যদিও সীমান্ত নিয়ে কোনো বিবাদ নেই; কিন্তু চোরাচালান, অনুপ্রবেশ, পুশ ইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা—এই বিষয়গুলো মাঝেমধ্যে সীমান্তের দুই পারেই তীব্র তিক্ততা সৃষ্টি করে। গঙ্গা ও তিস্তার পানির হিস্যা দুই দেশের এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এ সমস্যা থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ উপায় নেই; বৈরিতা বাড়ছেই।
বিজেপির মুসলমান বিদ্বেষী রাজনীতি এবং বাংলাদেশ হিন্দু ভোগান্তির বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোও দুই দেশের জনগণের ভেতর মাঝেমধ্যে দারুণ উত্তেজনা ও অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের জোরালো অভ্যুদয় ভারতের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভারত সমর্থক কোনো রাজনৈতিক দল এখন বাংলাদেশে নেই। বিএনপিকে বলা যায় বাস্তববাদী; যেকোনো দিকে হেলতে পারে প্রয়োজনে।
ভারতের সুবিধা
ভারতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তাদের শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো। যার ফলে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে একচেটিয়া ভোগ্যপণ্য ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছে। অভিন্ন সীমান্তের সুবিধাও প্রচুর। আমদানি-রপ্তানির পরিবহন খরচ কম এবং দুই দেশেই একে অপরের স্থল করিডর ব্যবহার করতে পারছে নিজস্ব প্রয়োজনে। স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা ও পর্যটন-সুবিধার জন্য ভারতের বিভিন্ন গন্তব্যস্থান বাংলাদেশিদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
ভারতের সঙ্গে যদিও বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে তিক্ততা আছে, তবে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবকাঠামো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়তা করছে। অপর পক্ষে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো তাদের বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দুর্বলতা।
পাকিস্তানের সুবিধা
বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থী যেসব রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের সময় দমিত ছিল, তারা এখন ক্ষমতার বৃত্তের কাছাকাছি। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তারাই দেশের রাজনীতির বিকল্প শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা পাকিস্তানের জন্য বিরাট সুযোগের সৃষ্টি করেছে।
ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান পাচ্ছে নতুন মান্যতা। এটা বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় পাকিস্তানের স্বার্থের জন্য ইতিবাচক কাজ করছে। তা ছাড়া বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের জন্য বড় একটা সুযোগ এনে দিতে পারে।
পাকিস্তানের অসুবিধা
একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়নি। তা ছাড়া রয়েছে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের বিরাট অঙ্কের সম্পদের পাওনা। এই বিষয়গুলো বারবার দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের আমদানি চাহিদা মেটানোর মতো উৎপাদন ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো পাকিস্তানের নেই। এটা পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক।
ভারতের সঙ্গে যদিও বাংলাদেশের অনেক বিষয়ে তিক্ততা আছে, তবে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক অবকাঠামো বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়তা করছে। অপর পক্ষে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হলো তাদের বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দুর্বলতা।
বাংলাদেশের ১৭ কোটি লোকের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখা যেকোনো সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাজারে চাল, ডাল, পেঁয়াজের সংকট অনেক সময় অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য অস্থির করে তোলে। ইউনূস সরকারের তীব্র ভারতবিরোধিতার সময়ও ভারত থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক: অতীতের আয়নায় ভবিষ্যতের পথচলা কেমন হবে
একাত্তরের অমীমাংসিত বিষয় ‘দুবার সমাধান’ হয়েছিল কি? কীভাবে?
তবে একটা বিষয়ে পাকিস্তানের সুবিধা আছে, সেটা হলো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সম্ভাব্য সহযোগিতা। সেটাও কতটুকু বাস্তবসম্পন্ন, তা নিশ্চিত নয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেভাবে নিজ দেশের রাজনীতিতে নাক গলাচ্ছে, তাদের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা বাড়াবে কি না, সেটাও ভাবার বিষয়।
নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ যত দিন বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন না করে, তত দিন ভারতের ওপর নির্ভরতা থাকবেই। ইউনূস সরকারের সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, ভারতের সঙ্গে ভেঙে পড়া কাঠামোগুলো জোড়া দেওয়া যত সহজ, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুনভাবে কাঠামো তৈরি তার চেয়েও অনেক কঠিন হবে। তাই বলে পাকিস্তান হাল ছেড়ে দিচ্ছে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতেই আছে।
ভারতের প্রথিতযশা সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারতীয় সরকারি মহল মনে করে, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ যেভাবে ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছে, সেটা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
কয় দিন আগে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর এক সংবাদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বাংলাদেশে তিন দিনের সফরে আসতে পারেন। তাঁদের সফরের মূল উদ্দেশ্য হবে বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা। ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস অবশ্য খবরটি অস্বীকার করেছে। মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এ সফর নিয়ে বিস্তারিত চূড়ান্ত করা হবে না।
এদিকে ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের নেতৃত্বে ‘ইসলামি ন্যাটো’ নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফকে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে এ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ নিশ্চয় এই চুক্তির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। যদি এ চুক্তি সফল হয়, পাকিস্তানের পাল্লা আরও ভারী হবে।
আমরা আগেই বলেছি, বাংলাদেশের সঙ্গে বড় ধরনের সম্পর্ক গড়তে পাকিস্তানের বেশ কিছু বড় প্রতিকূলতা রয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে রশি টানাটানিতে সম্ভবত ভারতই এখন এগিয়ে রয়েছে।
তবে এটাও ঠিক, বর্তমান ভূ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাস্তবতায় বাংলাদেশের সঙ্গে একচ্ছত্র সম্পর্ক গড়ার ক্ষমতা বোধ হয় ভারতেরও নেই। কিছু কিছু বিষয়ে পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ অগ্রাধিকার পেতে পারে। তা ছাড়া ভূরাজনীতির দুই বড় মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ বসাতে।
Publisher & Editor