আধুনিক ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় এবং শক্তিশালী পেসার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যশপ্রীত বুমরা। ভারতকে দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতানোর কারিগর হিসেবে অনেকেই তাকে বর্তমান সময়ের সেরা বোলার বলে মনে করেন। তবে এবারের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) আসরে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন চিত্র।
মাঠের পারফরম্যান্সে বুমরা এখন এতটাই নিষ্প্রভ যে, টুর্নামেন্টের অন্যতম কম কার্যকর বোলারদের তালিকায় তার নাম সবার উপরে উঠে এসেছে। চলতি আসরে যারা অন্তত ৩০ ওভার বোলিং করেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে বোলিং গড় এখন এই ভারতীয় পেসারের।
এবারের আইপিএলের শুরুটা বুমরার জন্য ছিল একেবারেই হতাশাজনক। আসরের প্রথম পাঁচটি ম্যাচে তিনি কোনো উইকেটের দেখাই পাননি। কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে শুরু করে দিল্লি ক্যাপিটালস, রাজস্থান রয়্যালস, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু এবং পাঞ্জাব কিংস—সব দলই অনায়াসে খেলেছে বুমরার বোলিং। নিজের ষষ্ঠ ম্যাচে এসে গুজরাট টাইটানসের সাই সুদর্শনকে আউট করার মাধ্যমে তিনি প্রথম উইকেটের খাতা খোলেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ৮ ম্যাচে অংশ নিয়ে তার শিকার সংখ্যা মাত্র দুই উইকেট। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো তার বোলিং গড়, যা বর্তমানে ১৩২.০০। অর্থাৎ, প্রতিটি উইকেটের পেছনে তাকে খরচ করতে হয়েছে ১৩২ রান।
এবারের আইপিএলে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বোলিং করা শীর্ষ দশ বোলারের মধ্যে বুমরার পারফরম্যান্স সবচেয়ে শোচনীয়। যেখানে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর ভুবনেশ্বর কুমার মাত্র ১৫.৫২ গড়ে ১৭ উইকেট নিয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন, সেখানে বুমরা কার্যত লড়াই থেকে ছিটকে গেছেন। এমনকি ঈশান মালিঙ্গা, প্রিন্স যাদব বা জফরা আর্চারদের মতো বোলাররাও ২০-এর নিচে গড়ে উইকেট সংগ্রহ করছেন। অথচ গত আসরে ইনজুরি কাটিয়ে ফিরেও ১২ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছিলেন বুমরা, যেখানে তার ইকোনমি রেট ছিল ঈর্ষণীয় ৬.৬৮। এমনকি গত ৮ মার্চ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দেশের শিরোপা জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
পরিসংখ্যানের পাশাপাশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারদের মনে বুমরাকে নিয়ে ভীতি কমে যাওয়া। একসময় ট্রাভিস হেড বা সঞ্জু স্যামসনরা যাকে সাবধানে খেলতেন, এখন তাকে মাঠের বাইরে পাঠাতে দ্বিতীয়বার ভাবছেন না ব্যাটাররা। এমনকি ১৫ বছর বয়সী তরুণ বৈভব সূর্যবংশীও বুমরার এক ওভারে দুটি ছক্কা হাঁকিয়ে সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচে ৪ ওভারে ৫৪ রান দিয়ে রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়েছেন এই পেসার। ব্যাটারদের ওপর যে আধিপত্য তিনি বজায় রাখতেন, চলতি আসরে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
বুমরার এই আকস্মিক ফর্মহীনতার পেছনে নানা কারণ বিশ্লেষণ করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। ভারতের সাবেক অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত মনে করেন, অতিরিক্ত খেলার ক্লান্তিই বুমরাকে সাধারণ বোলারে পরিণত করেছে। এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে টানা টেস্ট সিরিজের ব্যস্ত সূচি কাটিয়ে আইপিএলে নামতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ইংল্যান্ড সফরে ৩ ম্যাচে ১১৯ ওভারের দীর্ঘ বোলিং স্পেল তাকে শারীরিকভাবে শ্রান্ত করে ফেলেছে। শ্রীকান্তের মতে, তার বোলিংয়ে আগের সেই ধার আর নেই।
অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূলে রয়েছে মানসিক এবং শারীরিক উভয় সংকট। রবিচন্দ্রন অশ্বিন মনে করছেন, মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের টানা হার এবং নিজের উইকেট না পাওয়ার নেতিবাচক প্রচারণা তাকে মানসিক চাপে ফেলেছে। অন্যদিকে সাবেক ক্রিকেটার মোহাম্মদ কাইফের ধারণা, পুরনো পিঠের ইনজুরি তাকে আগের মতো শতভাগ উজাড় করে দিতে বাধা দিচ্ছে।
Publisher & Editor