জোরপূর্বক অন্যের পুকুর-সম্পদ দখলের অভিযোগ * ড্রাইভারকে দিয়ে রাফিকে হত্যার মিশন বাস্তবায়ন
ঢাকার দোহারে স্থানীয় যুবক রাফি করিম হত্যাকাণ্ডের পর আত্মগোপনে চলে যান ফ্যাসিবাদ আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ‘ভাতিজা’ মিজানুর রহমান শাহিন। দেশ ছেড়ে পালিয়ে কাতারে গিয়ে আশ্রয় নেন। এ সুযোগে জার্মানি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত বুধবার ঢাকাস্থ জার্মান দূতাবাসে ভিসাসংক্রান্ত সাক্ষাৎকার ছিল। মূলত ওই সাক্ষাৎকার দিতে দেশে এলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়েন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাবেক এ ‘ক্যাশিয়ার’। রাফি হত্যায় দোহারের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এদিকে, শাহিন গ্রেফতারের পর তার জুলুমবাজি নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছে এলাকাবাসী। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ায় এলাকার শতবর্ষী পুরনো পুকুরসহ অন্যের সম্পত্তি জোর করে আত্মসাৎ করাই ছিল শাহিনের ধ্যান-জ্ঞান। এক দিনের জন্য ব্যাংকে চাকরি না করেও চাচার ক্ষমতায় একলাফে বাগিয়ে নেন কমিউনিটি ব্যাংকের দোহার শাখার ম্যানেজারের পদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধিভুক্ত বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য ছাড়াও পুলিশ সদর দপ্তরে ছড়ি ঘোরানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের ২০ মে রাতে দোহারের শাইনপুকুর এলাকায় পূর্বশত্রুতার জেরে স্থানীয় যুবক রাফি করিমকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। রাফির মা আনোয়ারা খানম বাদী হয়ে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে দোহার থানায় মামলা করেন। শুরুতে মামলার এজাহারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাতিজা শাহিনকে আসামি করা হয়নি। অন্য আসামিদের গ্রেফতারের পর জবানবন্দিতে শাহিনের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসে।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, নিজ গোষ্ঠীর লোকজন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছের আত্মীয়স্বজন ও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর নির্যাতন চালাতেন শাহিন। কারও সম্পত্তি বা পুকুরে চোখ পড়লে নামমাত্র মূল্যে লিখে নিতে চাইতেন। কেউ দিতে না চাইলে জোর করে দখল করতেন তারা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গ্রামের সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন শাহিন। রাফিদের পারিবারিক পুকুরের অংশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বিক্রির জন্য চাপ দেন। তারা পুকুর বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় সেটি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। রাফিদের বাড়ি যাওয়ার পথও তারা বন্ধ করে দেয়। শাহিনের ইন্ধনে মন্ত্রীর বাড়ির কর্মচারী ও তার গাড়ির ড্রাইভার আল আমিন রাফির পরিবারের ওপর অত্যাচার ও হুমকি দিতে থাকে।
রাফির এক স্বজন বলেন, ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাফিরা তাদের পুকুর দখলমুক্ত করে। এতে তার ওপর ক্ষুব্ধ হয় শাহিন। পরে তার নেতৃত্বে রাফিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যা তারা পরে জানতে পেরেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক জামাল উদ্দিন বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, রাফি হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি শহিদ, টিটু, হুকুম আলী ও আলামিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এদের মধ্যে ড্রাইভার আল আমিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে শাহিনের সম্পৃক্ততা ও নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেন। জবানবন্দিতে আলামিন বলেছেন, শাহিন শাইনপুকুর এলাকার বেশ কয়েকটি দীঘি দখল করেন। দখল করা দীঘিগুলোর মধ্যে রাফি করিমদের কয়েকটি দীঘি রয়েছে। ৫ আগস্টের পর রাফি করিম তাদের দীঘির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর জের ধরে শাহিন তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। শাহিনের নির্দেশে তারা (আলামিনসহ অন্যরা) রাফি করিমকে কুপিয়ে হত্যা করে।
স্থানীয়রা অভিযোগে বলেন, শুধু রাফি হত্যা নয়, ফ্যাসিবাদ আমলে শাহিনদের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে নির্যাতন, মামলায় ফাঁসিয়ে দিতেন। তাদের ভয়ে সেসময় পুলিশও মামলা নিত না। অভিযোগে আরও বলা হয়, এলাকার মানুষকে নির্যাতন করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার দাপটে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই একলাফে কমিউনিটি ব্যাংকের দোহার শাখার ম্যানেজারের পদ বাগিয়ে নেন। ব্যাংকে চাকরি করলেও তার ধ্যান-জ্ঞান ছিল দখলবাজি ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখা। পুলিশে নিয়োগ, বদলি, প্রমোশনে তদবিরসহ বহু অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জামাল উদ্দিন বলেন, পুলিশ জানত না যে, শাহিন বিদেশে পালিয়ে গেছেন। রাফিকে হত্যার আগে তার কোনো পাসপোর্ট ছিল না। ঢাকায় এসে পাসপোর্ট করেন। অন্যদিকে, শাহিন যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সেজন্য আদালতে নির্দেশনা চেয়েছিলেন। তবে আদালতের নির্দেশনার কপি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানের আগেই দেশ ছেড়ে যান তিনি। এর মধ্যে বুধবার ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটকের পর তার বিদেশ যাওয়ার তথ্য জানা যায়। জামাল উদ্দিন বলেন, রাফি হত্যার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আজ শুক্রবার পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার জন্য তাকে আদালতে তোলা হবে।
Publisher & Editor