শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

সংসদে খালেদা ও হাসিনা সরকারের শেষ বছরের অর্থনীতির তুলনা দিলেন অর্থমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০৭:৪১, ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১

দুই দশক আগে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ বছরে দেশের অর্থনীতি কেমন ছিল, তার সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ বছরের অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

তিনি বলেছেন, দেড় যুগের ব্যবধানে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠেছে।

অর্থমন্ত্রী কিছু ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েরও চিত্র তুলে ধরেছেন।  

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে এ বিষয়ে বিবৃতি দেন তিনি।

এ বিধি অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিবৃতি দিতে পারেন। এ সময় কোনো প্রশ্ন রাখার সুযোগ নেই।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি একটি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে’ জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণের কাছে ‘দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায়’ বিশ্বাস করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির’ সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।

‘প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে’

অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রয়াত খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের শেষ অর্থবছরে (২০০৫-০৬) স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সে সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে, আর মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশে।

শিল্প ও কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির মন্থরতার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৩-২৪ সালে নেমে আসে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৩০ শতাংশে। 

কর্মসংস্থানে কাঠামোগত সংকট
দেশের কর্মসংস্থানের চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কাজ তৈরি না হওয়ায় তরুণদের বড় অংশকে কৃষিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এতে ছদ্ম-বেকারত্ব বেড়েছে এবং উৎপাদনশীলতা কমেছে।

তিনি বলেন, গত এক দশকে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজন প্রায় ৪ শতাংশ কমলেও এ খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতে অবদান বাড়লেও কর্মসংস্থান কমেছে।

বর্তমানে কৃষিখাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ দিলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এ খাতে নির্ভরশীল বলে ভাষ্য অর্থমন্ত্রীর। এ অবস্থা ‘কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি’র ঝুঁকির পরিচায়ক বলে মনে করেন তিনি।

সঞ্চয় কমেছে, বেড়েছে বহিঃখাতের চাপ

বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ভারসাম্য নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ সালে বিনিয়োগ বেড়ে জিডিপির ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় কমে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৪২ শতাংশে।

অর্থমন্ত্রীর মতে, এই ঘাটতি মেটাতে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, ফলে বহিঃখাতে চাপ বেড়েছে।

টাকার মান কমেছে, আমদানি ব্যয় বেড়েছে

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭ দশমিক ২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা হয় ১১১ টাকা, আর ২০২৪-২৫ সালে দাঁড়ায় ১২১ টাকায়।

তিনি বলেন, ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। 

মুদ্রা সরবরাহ ও ঋণপ্রবাহে ধীরগতি

মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রেও ধীরগতির চিত্র তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।

২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ বা এম২ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ, রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এম২ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশে, আর রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।

তিনি বলেন, ২০০৬ সালের জুনে অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে নেমে আসে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ শতাংশে নামার তথ্য দিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ মন্থরতা ও ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপে ইঙ্গিত দেয়।

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০০৫-০৬ সালের ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৩-২৪ সালে ৯ দশমিক ৮ শতাংশে এবং ২০২৪-২৫ সালে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি। 

রাজস্বে অগ্রগতি নেই, ঘাটতি বেড়েছে
রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি মনে করেন তারেক রহমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে মোট রাজস্ব ছিল ৪৩৯ বিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সেই সময় ব্যয় ছিল জিডিপির ১১ দশমিক ১ শতাংশ, ফলে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

২০২৩-২৪ সালে রাজস্ব বেড়ে ৪ হাজার ৯০ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়ালেও জিডিপির অনুপাতে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশেই স্থির থাকে। একই সময়ে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ২ শতাংশে, ফলে ঘাটতি হয় ৪ দশমিক ০৫ শতাংশ।

আমির খসরু বলেন, কেবল ঘাটতি বাড়েনি, ব্যয়ের মানও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মেগা প্রকল্পে অতিমূল্যায়নের পাশাপাশি সম্ভাব্যতা যাচাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে হয়নি। ফলে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারেনি। লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র প্রতিবেদনে বিষদভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

সুদ ব্যয়ের চিত্র ‘উদ্বেগজনক’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকারি ঋণের গঠনে ‘অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫-০৬ সালে মোট সরকারি ঋণ ছিল জিডিপির ৩৭ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই সময় সুদ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা।

২০২৩-২৪ সালে মোট ঋণের অনুপাত প্রায় একই থাকলেও অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশে, আর বৈদেশিক ঋণ নামে ১৭ দশমিক ১ শতাংশে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণের একটি অংশ নন-কনসেশনাল বা অনেকক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক হওয়ায় ঋণের স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্রকে ‘উদ্বেগজনক’ বর্ণনা করে তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সালের ৮৫ বিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৩-২৪ সালে সুদ পরিশোধ বেড়ে ১ হাজার ১৪৭ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার মানে ১৩ গুণের বেশি বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে এসএমইসহ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন আমির খসরু। 

রপ্তানি-আমদানি বেড়েছে, কিন্তু চাপও বেড়েছে
বহিঃখাতের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। সেই সময় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ, আমদানি প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ২ শতাংশ। রেমিটেন্স ছিল ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং রিজার্ভ ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

২০২৩-২৪ সালে রপ্তানি বেড়ে ৪০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ৬৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে গেলেও এই দুই সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক বলে জানান তিনি।

একই সময়ে রেমিটেন্স ২৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও হুন্ডি ও অর্থপাচারের কারণে রিজার্ভ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে বলে তার দাবি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রেমিটেন্স বেড়ে ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ানো এবং গত ডিসেম্বরে গ্রস রিজার্ভ ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে ওঠার তথ্যও দেন আমির খসরু।

বৈষম্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়েও সমালোচনা
মাথাপিছু আয় বাড়লেও তার সুফল সবার মধ্যে পৌঁছায়নি বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, আয় বাড়লেও সেই আয়ের সিংহভাগ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর হাতে।

বৈষম্যের সূচক হিসেবে তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য তুলে ধরেন। তার মতে, আয়ভিত্তিক জিনি সহগ ২০০৫ সালে ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা ২০২২ সালে বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯-এ দাঁড়ায়।

২০০৫ সালে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের ৩৫ গুণ, যা ২০২২ সালে বেড়ে ৮১ গুণ হয়েছে বলে জানান তিনি।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও ভাতার পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে তীব্র সমালোচনা
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকির কারণে আর্থিক খাত ‘ধ্বংসের কিনারে’ গেছে বলে সংসদে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়ায়।

মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিএআর ২০০৫ সালের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে ৩ দশমিক ০৮ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি।

খেলাপি ঋণের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা পাশ কাটিয়ে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী। 

তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনাতেও দীর্ঘদিন সমস্যা ছিল।

তিনি বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে ১০ বিলিয়ন ডলার অতিরঞ্জনের একটি তথ্য বিভ্রাট দীর্ঘদিন ধরে চলছিল, যা সম্প্রতি সংশোধন করা হয়েছে।

বাজার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

১ কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি
বর্তমান সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া শুরু হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সব পরিবারকে দেওয়া হবে। প্রকৃত কৃষক, মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পাইলটিং শুরু হয়েছে।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এছাড়া ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মধ্যে আইসিটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, সড়ক-রেল-নৌ ও বন্দর অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ, সুনীল অর্থনীতি ও ইকো-ট্যুরিজমে ১০ লাখ কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গঠন করে ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড চালু, নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচি, কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নেওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি।

‘জম্বি’ প্রকল্প বাতিলের কথা
সরকারের উন্নয়ন দর্শনের অংশ হিসেবে জনগুরুত্বহীন, দীর্ঘদিন চলমান এবং অর্থায়নহীন ‘জম্বি’ প্রকল্প চিহ্নিত করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংসদে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মান বাড়ানো, বাস্তবায়নকাল মেনে চলা এবং পরিবীক্ষণ জোরদারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা, করব্যবস্থার অটোমেশন, ঋণনির্ভরতা কমানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি কাঠামো সংস্কার, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, এসএমইবান্ধব ঋণ পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের কথাও বলেন তিনি।

পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে বিএসইসিকে ‘প্রকৃত স্বাধীনতা’ দেওয়া, বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন এবং করপোরেট বন্ড, সুকুক ও গ্রিন বন্ড চালুর উদ্যোগের কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।  

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ‘নতুন চাপ’
বিবৃতিতে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার দশ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আমির খসরুর ভাষ্য, জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর ফলে মার্চ থেকে জুন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও এলএনজিতে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে আরও প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে সরকারকে।

এতে বাজেট ঘাটতি যেমন বাড়বে, তেমনই প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় বিদেশি মুদ্রার সঞ্চিতি বা রিজার্ভে চাপ ফেলবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস এক ঘণ্টা আগে বন্ধ, ডেলাইট ব্যবহার বাড়ানো, এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মার্কেট ও সুপারমল বন্ধ, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, সময়মতো ভর্তুকির টাকা ছাড় এবং অতিরিক্ত বাজেট সহায়তার উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, জ্বালানির আন্তর্জাতিক উচ্চমূল্য সত্ত্বেও ‘জনগণের কষ্টের কথা’ মাথায় রেখে সরকার আপাতত মূল্য সমন্বয় না করে পূর্বের মূল্যই বহাল রেখেছে।

নতুন বাজেটের প্রত্যাশা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা যেমন বড়, তেমনই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যার কারণেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আমাদের এবারের লক্ষ্য কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং একটি টেকসই, স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তোলা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor