মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬

বাবার পত্রিকা বিক্রি, বড় ভাইয়ের ত্যাগ– কষ্টের দিন পেরিয়ে অশোকের গতির ঝড়

প্রকাশিত: ০৩:৪৬, ০৭ এপ্রিল ২০২৬ |

বাড়ির সামনে বারান্দার মতো জায়গায় দুই ভাইয়ের অনুশীলন দিয়ে শুরু। যদিও আর্থিক অনটনের জন্য বড় ভাই বেশি দিন খেলতে পারেননি। কারণ পত্রিকা বিক্রেতা বাবার কাঁধেই যে পুরো সংসার। ফলে অক্ষয় শর্মা বড় ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে দেন। তাদের সেই সংগ্রামের দিন পেরিয়ে আইপিএলে ১৫৪ কিলোমিটার গতির ঝড় তুলে আলোচনায় অক্ষয়ের ছোট ভাই অশোক শর্মা। 

শৈশবে বড় ভাই অক্ষয়কে লক্ষ্য করে বল করতেন অশোক। উদ্দেশ্য ছিল একটাই– তাকে আঘাত করা। আর সেটা সম্ভব ছিল দ্রুতগতির বলেই। অক্ষয় বলেন, ‘আমি তাকে দ্রুতগতির বল করে আঘাত করতাম। প্রতিশোধ নিতে সেও দ্রুত বল করা শুরু করে। তখন ভাবিনি সে এত ভালো হয়ে উঠবে।’ তার দাবি– স্কুল ক্রিকেটে অশোকের গতিময় বল এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে প্রতিপক্ষ ব্যাটাররা আউট হওয়ার জন্য নয়, ভয়ে স্টাম্প ছেড়ে দূরে সরে যেত। অনেকের পাঁজর ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বল হাতে এমন গতি তোলার কাজ কোনো কোচের অধীনে হয়নি, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত চেষ্টার ফল। বড় ভাইকে লক্ষ্য করে করিডোরে ছোট ভাইয়ের আঘাতের চেষ্টা, যা তাকে টেনে নিয়ে যায় মাঠ পর্যন্ত। স্কুল ক্রিকেটের পর আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে গুজরাট টাইটান্সের হয়ে ১৫৪.২ কিলোমিটার গতি তুললেন অশোক। 

তার এতদূর আসার নেপথ্য সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, রামপুরা থেকে জয়পুর প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। অশোকের বাবা নথুনাল শর্মা দিনে চাষাবাদ করতেন এবং পত্রিকা বিতরণের কাজ করতেন রাতে। মাসে তার আয় ছিল মাত্র ১০ হাজার টাকা। ফলে পরিবার চেয়েছিল ছেলেরা পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি করুক। কিন্তু দুই ভাই–ই ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিল। আর্থিক সীমাবদ্ধতায় একজনকেই সুযোগ দেওয়া সম্ভব ছিল। বড় ভাই অক্ষয় নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করে ছোট ভাইকে এগিয়ে দেন। অশোককে ভর্তি করানো হয় জয়পুরের আরাবালি ক্রিকেট একাডেমিতে, যার পরিচালক ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার বিবেক যাদব।

বিবেকের সেই ক্রিকেট একাডেমি আগেই আলোচনায় এসেছিল কয়েকজন ক্রিকেটারের আইপিএলে দল পাওয়ার সুবাদে। যদিও তাদের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার খুব একটা অভিজ্ঞতা ছিল না। করোনার সময় অশোকের প্রয়াণ হলে, তার ভাই এখন একাডেমির দেখভাল করেন। যেখানে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অনুশীলনে যেতেন অশোক। পরে হোস্টেলে থেকে মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন শুরু করেন এবং ২০১৯ সালে রাজস্থান অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পান। কিন্তু করোনা মহামারিতে বন্ধ হয়ে যায় খেলা। একই সময় কোচ বিবেকের মৃত্যু তাকে বড় ধাক্কা দেয়।

অগত্যা কঠিন সেই সময়ে দুই ভাই অক্ষয়-অশোক পরিবারের খামারে কাজ করতে নেমে পড়েন। যদিও পাশাপাশি ক্রিকেট কোচিংও চালিয়ে যাচ্ছিলেন অক্ষয়। অশোক ২০২২ সালে প্রথম কলকাতা নাইট রাইডার্সের ডাকে আইপিএলে সুযোগ পান, যদিও ম্যাচ খেলা হয়নি তার। তখন পুরো গ্রামে তাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, পরে রাজস্থান রয়্যালসে নাম লেখালেও তার ভাগ্য বদলায়নি। ওই ফ্র্যাঞ্চাইজিতেও খেলার স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন অশোক। এবার গুজরাটের হয়ে খেলতে নেমে গতির ঝড় তুলে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের।

আইপিএলে অবশ্য অশোকের চেয়েও বেশি গতি তোলার নজির আছে। সে হিসেবে উমরান মালিক, মায়াঙ্ক যাদবদের উত্তরসূরী বলা যায় তাকে। ২৩ বছর বয়সী এই পেসার গুজরাট কোচ আশিষ নেহরার অধীনে আরও উন্নতি করবেন বলে প্রত্যাশা বড় ভাইয়ের। অশোককে জাতীয় দলে খেলতে দেখার ইচ্ছা জানিয়ে অক্ষয় বলেন, ‘সে যেন কম্পিউটারের মতো, যেখানে বল করতে বলবে, সেখানেই বারবার করতে পারবে। এখন সবাই তার কথা বলছে। কিন্তু লক্ষ্য অনেক দূরে, ভারতীয় দলের নীল জার্সি পেতে হলে তাকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।’

অক্ষয়-অশোকের বাবাকে এখন আর কাজ করতে হয় না। ছেলেরা আর করিডরে না খেলায় সমালোচনা ‍শুনতে হয় গ্রামের মানুষের কাছ থেকে। সর্বশেষ সৈয়দ মুসতাক আলি ট্রফিতে ৭ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি বোলার হয়েছিলেন অশোক। গুজরাট তাকে দলে নিয়েছিল ৯০ লাখ রুপিতে। যদিও এখনও হয়তো বলার মতো কিছু করতে পারেননি, তবে পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ম্যাচে বোলিং দেখে অশোককে ‘খুবই মূল্যবান’ বলে মন্তব্য করেন গুজরাট অধিনায়ক শুভমান গিল। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor