দেশে বহু বছর পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে দেশের অতীতের অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে এই নির্বাচন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। একটি রক্তক্ষয়ী গণ–অভ্যুত্থান, টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রাম, রাজপথের আন্দোলন, গুম ও খুন, দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। ফলে এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘিরে মানুষের মধ্যে একটি বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, দেশ যেন সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করবে।
মানুষ আর গুম হবে না, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেড়াজালে সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্টদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে না, সাংবাদিকদের তুলে নেওয়া হবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে দখলবাজি বন্ধ হবে, আন্দোলনে গুলি চলবে না—এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
এই প্রত্যাশাকে আরও বেগবান করেছে জুলাই সনদ। জুলাই সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক দলগুলো এই সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছে। কোন সংস্কার প্রয়োজন, কোন বিষয়ে ভিন্নভাবে ভাবা যেতে পারে—এসব প্রশ্নে দিনের পর দিন মতবিনিময় হয়েছে। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা হয়েছে।
জুলাই সনদ এখন গণভোটের মুখোমুখি; অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে জুলাই সনদের একটি সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। মোটাদাগে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে; একমাত্র জাতীয় পার্টি ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে, একটি প্রায় মীমাংসিত বিষয়কেই এখন ভোটের মাঠে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে, “বিএনপি আসলে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে নয়”, “বিএনপি সংস্কারবিরোধী”। বাস্তবে এটি সংস্কার বিতর্ক নয়; এটি প্রোপাগান্ডা ও ন্যারেটিভ পলিটিকস।
রাজনীতির ভাষায়, ন্যারেটিভ পলিটিকস বা বয়াননির্ভর রাজনীতি হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে বাস্তবতার নির্বাচিত অংশ, অতিরঞ্জন এবং কখনো সরাসরি মিথ্যার সমন্বয়ে একটি গল্প তৈরি করা হয়। এরপর সেই গল্পকে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক ভাষণের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রচার করা হয়, যেন সেটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় সত্যের চেয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাস্তবতা নয়; বরং কার গল্প বেশি গ্রহণযোগ্য, রাজনীতি তখন সেই লড়াইয়ে পরিণত হয়।
বিএনপিকে ‘সংস্কারবিরোধী’ বলে রাজনৈতিক অপপ্রচার চালানো হলেও রাষ্ট্রীয় সংস্কার প্রশ্নে প্রথম দিককার উদ্যোগগুলোর একটি নিয়েছিল বিএনপি। জুলাই সনদের অনেক প্রস্তাবে দলটির দ্বিমত থাকলেও, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে বিএনপি তা মেনে নিয়ে রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা।
বিএনপির সংস্কার ভাবনা নতুন নয়। ২০১৬ সাল থেকেই দলটি রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলে আসছে। বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকতেই ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই ভিশনের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়।
বিএনপির ৩১ দফায় বলা হয়েছিল, পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না; তবে এক টার্ম বিরতি দিয়ে তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে। ফলে যখন জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সরাসরি ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব আসে, তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, বিএনপি তা মানবে না। কারণ, আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনৈতিক মাঠ অনেকটাই বিএনপির জন্য উন্মুক্ত। দলটি বর্তমানে জনপ্রিয় এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বয়স প্রায় ৬০ বছর। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে আরও অন্তত ২০ বছর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে, এমন ধারণাও প্রচলিত।
তবু অনুকূল রাজনৈতিক বাস্তবতায় থেকেও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক উদারতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এ ছাড়া কিছু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জুলাই সনদবিষয়ক গণভোটের চারটি ধারার মধ্যে দুটিতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট উপেক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উচ্চকক্ষে পিআর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি। গণভোটের দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু করা হবে এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগসংক্রান্ত প্রস্তাবেও বিএনপির আপত্তি ছিল। এই বিষয়গুলো আলাদাভাবে গণভোটের ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এত বড় আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এরপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাস্তবতা হলো, জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে আগামী সংসদ গঠিত হবে। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। যেসব সংস্কার প্রস্তাবে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও দলটি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রয়েছে।
বিএনপির সংস্কার ভাবনা নতুন নয়। ২০১৬ সাল থেকেই দলটি রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলে আসছে। বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকতেই ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই ভিশনের বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করা হয়।
এই ভিশনের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে গড়ে তোলা যেখানে ভিন্নমত, ভিন্ন বিশ্বাস ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে এবং একটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকশিত হবে।
বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিএনপি তিনটি ‘জি’র—ভালো রাজনীতি, ভালো শাসনব্যবস্থা ও ভালো সরকার—সমন্বয় ঘটাতে চায়। তিনি মনে করতেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত নির্বাহী ক্ষমতা স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা তৈরি করে। তাই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন।
ভিশন ২০৩০–এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালু করা, যেখানে উচ্চকক্ষে অভিজ্ঞ পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা থাকবেন। একই সঙ্গে প্রতিহিংসা ও সংঘাতের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও করা হয়।
২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০ পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখায় রূপ নেয়। সেখানে সরকারপ্রধান ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়। নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুসমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, উচ্চকক্ষ চালু করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, জুডিশিয়াল কমিশন, মিডিয়া কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার অঙ্গীকার—সবই সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফলে জুলাই সনদে আলোচিত বহু সংস্কারের ধারণা বিএনপি এক দশক আগেই প্রকাশ করেছিল। আজকের জুলাই সনদের যে আকাঙ্ক্ষা, তার বীজ বপন হয়েছিল ২০১৬ সালেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা রাজনৈতিক বাস্তবতার বিকৃতি এবং জাতীয় সংহতির জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দমন-পীড়ন ও আস্থাহীনতার পর রাষ্ট্রসংস্কার এবং গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি দল বা জোটের বিষয় নয়, এটি সমগ্র জাতির ভবিষ্যৎ পথনির্দেশের প্রশ্ন।
এই প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য স্বাভাবিক; ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, থাকবে দ্বিমতও। কিন্তু সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে যদি দোষারোপ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর ন্যারেটিভে পরিণত করা হয়, তাহলে সেই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ন হয়।
রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে যদি সংস্কারকে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে দেখা যায়, তবেই গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও আইনের শাসনের প্রত্যাশা বাস্তব রূপ পেতে পারে। অন্যথায় সংস্কার নিজেই আরেকটি বিভাজনের রাজনীতির শিকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
Publisher & Editor