সুস্থ শরীরে ঘুমাতে গিয়ে অনেকেই সকালে ঘুম ভাঙার পর কথা জড়িয়ে যাওয়া, দুর্বলতা বা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যায় পড়েন। অনেক সময় ঘুমের মধ্যেই স্ট্রোক হয়ে থাকে, যা টের পাওয়া যায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে ‘ওয়েক-আপ স্ট্রোক’ বলা হয়। লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর দেরি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ঘুমের মধ্যে কেন স্ট্রোক হয়?
মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে তাকে ইশেমিক স্ট্রোক এবং রক্তনালী ফেটে রক্তপাত হলে তাকে হেমোরেজিক স্ট্রোক বলা হয়। ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক হলে মানুষ সাধারণত ঘুম ভাঙার পরই তা বুঝতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ‘লাস্ট নোন ওয়েল টাইম’ বা রোগী সর্বশেষ কখন সুস্থ ছিলেন, তা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় স্ট্রোকের সুনির্দিষ্ট সময় জানা না গেলেও উন্নত ব্রেইন ইমেজিং ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা চিকিৎসার সম্ভাবনা যাচাই করতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় জানা না থাকা মানেই চিকিৎসা বন্ধ—এমনটি নয়।
সতর্কতামূলক লক্ষণ চেনার উপায়
স্ট্রোকের সাধারণ লক্ষণগুলো চেনার জন্য ‘বিফাস্ট’ (BEFAST) পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর:
ভারসাম্য (Balance): হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা, মাথা ঘোরা বা হাঁটায় সমস্যা হওয়া।
চোখ (Eyes): হঠাৎ চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, দ্বৈত দৃষ্টি বা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।
মুখমণ্ডল (Face): হাসার সময় মুখের একপাশ ঝুলে পড়া।
হাত (Arms): একহাতে দুর্বলতা অনুভব করা বা হাত নিচের দিকে ঝুলে পড়া।
কথা (Speech): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা হওয়া।
সময়(Time): এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা গেলেই দ্রুত জরুরি সেবায় যোগাযোগ করা।
এ ছাড়া হঠাৎ অসাড়তা, বিভ্রান্তি, তীব্র মাথা ব্যথা এবং চরম ক্লান্তিও এর লক্ষণ হতে পারে। মিনি স্ট্রোক (টিআইএ)-এর লক্ষণগুলো সাময়িক হলেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।
ঘুম থেকে ওঠার পর যেকোনো স্নায়বিক পরিবর্তনকেই জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, এমনকি লক্ষণ নিজে থেকেই কিছুটা উন্নতি হলেও অপেক্ষা করা যাবে না।
ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয়
নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান এবং অনিয়মিত হৃদস্পন্দন ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ করে অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপ্নিয়া (যে সমস্যায় ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়) কার্ডিওভাসকুলার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়া সকালের দিকে রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বৃদ্ধি পায়, যা সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঘুমের গুণগত মান খারাপ হলেও রক্তপ্রবাহ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
চিকিৎসা ও পুনরুদ্ধার
সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে রোগীরা ‘থ্রম্বোলাইসিস’ (রক্ত জমাট বাঁধার ওষুধ) বা ‘মেকানিক্যাল থ্রম্বেক্টমি’ (ক্যাথিটারের মাধ্যমে রক্তনালীর বাধা দূর করা) চিকিৎসার সুফল পেতে পারেন। বিশেষ ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু রোগী এই চিকিৎসার আওতায় আসেন।
পরবর্তী সময়ে ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং অকুপেশনাল থেরাপির মাধ্যমে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালানো হয়।
স্ট্রোক নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
স্ট্রোক কেবল বয়স্কদের হয়: এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে।
ঘুমিয়ে কাটালে ঠিক হয়ে যাবে: লক্ষণ অবহেলা করলে চিকিৎসার সুযোগ কমে যায়।
সব স্ট্রোকেই পক্ষাঘাত হয়: কিছু স্ট্রোক কেবল কথা বলার ক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি বা ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ঝুঁকি কমাতে করণীয়
নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখুন, রক্তচাপ নিয়মিত মাপতে হবে, ব্যায়াম করুন, সুষম খাবার খান, ধূমপান বর্জন করুন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত নাক ডাকা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ঘুম থেকে ওঠার পর কথা, চলাফেরা বা দৃষ্টিশক্তিতে সামান্য পরিবর্তন দেখলেও অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
Publisher & Editor