সকাল থেকে বড়শি হাতে বসে আছে বাবু। পুকুরটা তাদের বাড়ির পাশেই।
পারে একটা পুরনো শিউলি গাছ। তার নিচে বসলে রোদ লাগে না, আবার বাড়ি থেকেও দেখা যায় না। বাবুর এই জায়গাটা পছন্দ। আজ সে ঠিক করেছে, বড় একটা মাছ ধরবে।
তার বড়শিতে নতুন সুতা। নতুন বঁড়শি। টোপও নতুন। শুধু মাছটাই পুরনো।
একটা পুঁটি।
বাবু মাছটার দিকে তাকিয়ে এমন মুখ করে যে, মনে হয় মাছটা তাকে অপমান করেছে। সে মাছটা পারে ফেলে দেয়। মাছটা লাফাতে লাফাতে বলে, তোরা এত জ্বালাস কেন?
বাবু থমকে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
তারপর চারদিকে তাকায়।
কে বলল?
পুঁটি বলে, আমি।
বাবু নিচু হয়ে মাছটার দিকে তাকায়।
তুই কথা বলিস?
না। আমার পেটটা কথা বলে। আমি শুধু মুখ নড়াই।
বাবু ভ্রু কুঁচকে বলে, মাছ আবার কথা বলে নাকি?
পুঁটি বিরক্ত হয়ে বলে, মানুষ আবার এত বোকা হয় নাকি?
বাবু আর কথা বাড়ায় না। মাছটা বলে, সকাল থেকে তিনবার টোপ ফেলেছিস।
হুম।
দুবার কেঁচো।
হুম।
একবার রুটি।
হুম।
রুটিটা বাসি ছিল।
বাবু অবাক হয়ে যায়।
তুই বুঝলি কিভাবে?
খেয়ে বুঝেছি।
বাবু মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকে। পুঁটি বলে, এখন আমাকে পানিতে ছাড়।
কেন?
আমার বাড়ি যেতে হবে।
তোর বাড়ি কোথায়?
এই পুকুরেই।
কোন পাড়ায়?
পুঁটি একটু ভেবে বলে, তৃতীয় শাপলার নিচে।
বাবু হেসে ফেলে।
শাপলারও আবার পাড়া আছে?
আছে। তোদের যেমন বাজারপাড়া, আমাদের তেমন শাপলাপাড়া।
বাবু মাছটাকে পানিতে ছেড়ে দেয়। পুঁটি ডুব দেওয়ার আগে মাথা তুলে বলে, কাল আসিস।
কেন?
একটা কথা আছে।
পরদিন বাবু আবার আসে। বড়শি নিয়ে। পুঁটি সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর মুখ তোলে।
এই যে!
বাবু বলে, কী কথা?
বড়শি নামা।
কেন?
তোকে একটা জিনিস দেখাব।
বাবু বড়শি পানিতে ফেলে। কিছুক্ষণ পর সুতা টানতে শুরু করে। বাবু ভাবে, এবার বুঝি বড় মাছ। টেনে তোলে। আবার পুঁটি। বাবু চিৎকার করে, তুই!
পুঁটি বলে, আমি।
তুই বড়শিতে এলি কেন?
দেখানোর জন্য।
কী?
পুঁটি মুখে করে একটা ছোট্ট চকচকে জিনিস ফেলে দেয়। বাবু সেটা তুলে নেয়। একটা আংটি। বাবুর দাদির আংটি। দুই মাস আগে হারিয়েছিল। বাবু দৌড়ে বাড়ি যায়। দাদি আংটি দেখে প্রথমে চুপ করেন। তারপর বলেন, কোথায় পেলি?
বাবু বলে, পুঁটি দিয়েছে।
দাদি কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
কোন পুঁটি?
যে কথা বলে।
দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তোর দাদারও এই রোগ ছিল।
কী রোগ?
ছোট মাছের সঙ্গে গল্প করা।
বাবু হেসে ফেলে। পরদিন পুকুরে গিয়ে সে অনেকক্ষণ পুঁটিকে খোঁজে। পায় না। সে ডাক দেয়, এই পুঁটি!
কোথাও কোনো উত্তর নেই। বাবু আবার ডাকে।
এই!
পানির ওপর কয়েকটা বুদবুদ ওঠে। তারপর খুব নিচু গলায় শব্দ আসে, আজ ব্যস্ত আছি।
বাবু বলে, কোথায়?
তোর দাদির হারানো চশমা খুঁজতে।
বাবু হেসে ফেলে।
চশমা আবার পানিতে?
পুঁটি বলে, মানুষের জিনিস কোথায় থাকে, সেটা মানুষই সবচেয়ে কম জানে।
তারপর পানিটা শান্ত হয়ে যায়। বাবু ঘাটে বসে থাকে। বড়শিটা পাশে পড়ে থাকে। অনেকক্ষণ পর সে সেটাকে তুলে নেয়। তারপর খুলে রাখে। আজ মাছ ধরবে না। আজ তার মনে হচ্ছে, পুকুরে মাছের চেয়ে গল্পই বেশি।
Publisher & Editor