শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনতে হয়? নিজেকে সামলাবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ১২:১৪, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১০

‘তোমার বিয়ে হচ্ছে না কেন?’, ‘তোমার বয়সী অমুকের তো বিয়ে হয়ে গেছে’, ‘তমুক চাকরি করছে, তুমি কী করছ?’ পরিবারের অনুষ্ঠান, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা পরিচিত মানুষের সঙ্গে আড্ডায় এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় অনেককে। কখনো এসব কথা বলা হয় কৌতূহল থেকে, কখনো পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

কিন্তু অন্যের সঙ্গে বারবার তুলনা করা হলে তা বিরক্তি, অস্বস্তি ও মানসিক চাপের কারণ হতে পারে।
জীবনের প্রতিটি মানুষের পরিস্থিতি, সুযোগ, পছন্দ ও লক্ষ্য আলাদা। কেউ আগে চাকরি পান, কেউ পড়াশোনা শেষ করতে সময় নেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত কারণে বিয়ের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেন। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে গিয়ে হতাশ না হয়ে এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজেকে সামলানো যায়, তা জানা জরুরি।

অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করবেন না
‘অমুকের বিয়ে হয়ে গেছে’, ‘তমুক ভালো চাকরি পেয়েছে’ এ ধরনের কথা শুনলে নিজের জীবনকে পিছিয়ে পড়া মনে হতে পারে। কিন্তু অন্য কেউ জীবনের একটি ধাপে পৌঁছেছেন মানেই আপনাকেও একই সময়ে সেখানে পৌঁছাতে হবে, এমন নয়।

প্রত্যেকের জীবনের পথ আলাদা। অন্যের সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে না দেখে নিজের লক্ষ্য, পরিস্থিতি ও অগ্রগতির দিকে মনোযোগ দিন।

আপনি কোথায় যেতে চান এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে কী করতে পারেন, তা নিয়ে ভাবুন।
সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন নেই
কেউ বিয়ে, চাকরি, আয় কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করলেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে হবে, এমন নয়। ব্যক্তিগত বিষয়ে কতটুকু জানাবেন, তা আপনার নিজের সিদ্ধান্ত।

এমন পরিস্থিতিতে শান্তভাবে বলতে পারেন, ‘সময় হলে জানাব’, ‘নিজের মতো করে চেষ্টা করছি’ কিংবা ‘এটা নিয়ে আপাতত কথা বলতে চাই না।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েও ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান বোঝানো যায়।

বিরক্ত হলেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেবেন না
একই ধরনের প্রশ্ন বারবার শুনলে রাগ বা বিরক্তি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই মুহূর্তে পাল্টা অপমান করে কথা বললে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।

কথা বলার আগে কয়েক সেকেন্ড থামুন। ধীরে শ্বাস নিন এবং নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করুন। মনে রাখুন, অন্যের মন্তব্য আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না। প্রয়োজন হলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন কিংবা সেখান থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরে যান।

তুলনা করলে ভদ্রভাবে নিজের অবস্থান জানান
কেউ যদি বারবার অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে চুপ করে সব সহ্য করা কিংবা ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়া—কোনোটিই একমাত্র পথ নয়। শান্তভাবে নিজের বক্তব্য জানানো যায়।

যেমন বলতে পারেন, ‘সবার জীবন এক রকম নয়, প্রত্যেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী এগিয়ে যায়।’ আবার বলা যায়, ‘ওর জন্য ভালো হয়েছে, আমিও নিজের মতো করে চেষ্টা করছি।’

এতে অন্যের সাফল্যকে ছোট না করেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা সম্ভব।

লোকের কথা থামাতে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেবেন না
বিয়ে, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার নিয়ে সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই নিজের প্রস্তুতি ও পছন্দের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবেন। কিন্তু শুধু অন্যের প্রশ্নের উত্তর দিতে বা সমালোচনা বন্ধ করতে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

বিয়ের ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছা, মানসিক প্রস্তুতি ও উপযুক্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। চাকরি বা ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও অন্যের সঙ্গে তুলনা করে হতাশ হওয়ার বদলে নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণে মনোযোগ দিন।

বারবার খোঁচা দিলে সীমা নির্ধারণ করুন
কেউ আপনার অস্বস্তি বোঝার পরও একই বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করলে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানাতে পারেন। যেমন, ‘আপনারা আমার ভালো চান, সেটা বুঝি। তবে এই বিষয়টি নিয়ে বারবার কথা হলে আমি অস্বস্তি বোধ করি। সময় হলে নিজেই জানাব।’

নিজের সীমা জানানো অভদ্রতা নয়। বরং সম্মান বজায় রেখে নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অযাচিত আলোচনা বন্ধ করার একটি উপায়। তবে সবাই আপনার বক্তব্য বুঝবেন, এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো।

নিজের মূল্য অন্যের মন্তব্য দিয়ে বিচার করবেন না
কারও ভালো চাকরি হয়েছে কিংবা কারও বিয়ে হয়ে গেছে বলে তিনি আপনার চেয়ে জীবনে বেশি সফল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। জীবনের সাফল্য শুধু বিয়ে, চাকরি বা আয় দিয়ে মাপা যায় না।

আপনি কী শিখছেন, কীভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন, কোন দক্ষতা অর্জন করছেন এবং নিজের জীবনে কী পরিবর্তন আনছেন—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মন্তব্যকে নিজের যোগ্যতার চূড়ান্ত বিচার হিসেবে না দেখে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।

প্রয়োজনে কথোপকথন থেকে সরে আসুন
সবাই আপনার পরিস্থিতি বুঝবেন, এমন নয়। শান্তভাবে বোঝানোর পরও কেউ যদি খোঁচা দিতে থাকেন, তাহলে বারবার নিজেকে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। অন্য প্রসঙ্গে চলে যেতে পারেন, অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন কিংবা প্রয়োজন হলে সেখান থেকে সরে আসতে পারেন।
 
পরিবার বা কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে সীমা বজায় রাখা যায়, তা ঠিক করতে পারেন। এসব কথার কারণে দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

নিজের জীবন নিজের গতিতে এগিয়ে নিন
অন্যের সঙ্গে তুলনা করে কথা শুনতে হলে মন খারাপ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে মনে রাখা জরুরি, অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন ও সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করার দরকার নেই।

নিজেকে সামলানো মানে সব কথা মেনে নেওয়া বা চুপ করে থাকা নয়। বরং আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের অবস্থান বোঝানো, প্রয়োজনমতো সীমা নির্ধারণ করা এবং নিজের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে চলাই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের জীবন নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার সবার থাকলেও আপনার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারই।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor