ছবি: সংগৃহীত
ফ্রান্সের চলমান বিশৃঙ্খলা থেকে এ পর্যন্ত কেবল একজনই পরিষ্কার বিজয়ী হয়েছেন—মারিন লো পেন। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে দেশজুড়ে শহর ও নগরগুলোকে গ্রাস করা এই সহিংসতা ও দাঙ্গা কট্টর ডানপন্থী, ইউরো-সন্দেহবাদী এবং অভিবাসনবিরোধী এই প্রার্থীর জন্য এক পরম আশীর্বাদ হিসেবে এসেছে।
যখন ভবনগুলোয় আগুন জ্বলছিল, দোকানপাট লুট হচ্ছিল এবং পুলিশের ওপর হামলা চলছিল, তখন এই দাঙ্গার চিৎকারের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল জরাজীর্ণ স্কুল, জ্বালানির দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের গড়ে তোলা শান্তিপূর্ণ গণ–আন্দোলন।
ফ্রান্স ও ইউরোপের বাকি অংশজুড়ে মানুষ শহরগুলোর কেন্দ্রস্থলে অগ্নিকাণ্ড ও ভাঙচুরের দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছে। শান্ত মফস্সল শহর লিমোজেসের ১৯ শতকের টাউন হল এবং মার্সেইয়ের সিটি হলে থাকা ‘মারিয়ান’-এর আবক্ষ মূর্তি ধ্বংসের মতো ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীকগুলোর ক্ষতিসাধন এবং দুই হাজারের বেশি দোকানে লুটপাট মানুষকে আতঙ্কিত করেছে।
ইউরোপ কেন যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে
যদিও ফ্রান্সের একটি দীর্ঘ বিপ্লবী ঐতিহ্য রয়েছে। তবে এটি কোনো সাম্যবাদী বিদ্রোহী বা শ্রমজীবী যোদ্ধাদের কাজ ছিল না; বরং এতে অংশ নিয়েছিল সুবিধাবাদী লুটেরাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া নিহিলিস্ট ও নৈরাজ্যবাদী ‘ব্ল্যাক ব্লক’ গ্যাং।
এমানুয়েল মাখোঁ এখন একজন ক্ষমতা হারানো বা ‘লেম-ডাক’ প্রেসিডেন্ট, যাঁর কাছে এমন কোনো বাস্তব সমাধান নেই। রোববার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মাখোঁ এই সহিংসতা এবং বিশ্বের বুকে ফ্রান্সের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় তাঁর ‘রাগ ও লজ্জা’ প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু তিনি এতটাই ব্যাপকভাবে ঘৃণিত (এমনকি যাঁরা টানা দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকের কাছেও) যে শৃঙ্খলা ও আলোচনার জন্য তাঁর আহ্বানকে বড় একটি অংশ পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।
এর বিপরীতে, লো পেন একটি গম্ভীর ভিডিও বার্তা জারি করেছেন। একটি ডেস্কে বসা অবস্থায় তাঁকে বেশ প্রেসিডেন্ট-প্রেসিডেন্ট লাগছিল, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল জাতীয় তেরঙা পতাকা (কিন্তু কোনো ইইউ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকা ছিল না) এবং বইয়ের তাক।
লো পেন বলেন, লাখ লাখ ভুক্তভোগী ফরাসি মানুষ কোনো কিছু না ভেঙে বা না পুড়িয়েও ‘নৈরাজ্যজনক অভিবাসন’ এবং জীবনযাত্রার অতিরিক্ত ব্যয়ের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিলেন। ছয় মাসের মধ্যে তাঁদের সামনে সুযোগ আসবে ‘পুনর্বহাল হওয়া কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তা’র এক ভিন্ন পথের পক্ষে ভোট দেওয়ার।
মাখোঁর সংখ্যালঘু সরকার এক মারাত্মক দুশ্চক্রের মধ্যে আটকা পড়েছে। ফ্রান্সের ঋণ এবং বাজেট–ঘাটতির টানাপোড়েন তাঁকে এমন কোনো সুযোগ দিচ্ছে না, যা দিয়ে তিনি বিক্ষোভকারীদের শান্ত করতে টাকা খরচ করবেন। তাঁর মধ্যপন্থী-ডানপন্থী শাসনের এক দশক ধরে স্ফীত হয়ে ওঠা সরকারি খাত সংস্কার করতে বা জনসেবার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
দেশটি বর্তমানে এক যুবসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একটি অর্থনৈতিক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে এবং যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি রয়েছে এক ভূরাজনৈতিক সংকট, যেখানে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ইউরোপের বিরুদ্ধে এক গোপন প্রচ্ছন্ন যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
প্রগতিশীল ইউরোপীয় সামাজিক নীতিগুলোর বিদেশি সমালোচকেরা এই আগুনে ঘি ঢালছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপহাস করে লিখেছেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে!’ এ পরিস্থিতির জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে তিনি ফরাসিদের পরামর্শ দেন—‘অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আপনাদের সীমান্ত বন্ধ করুন এবং নিয়ন্ত্রণ নিন।’
ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিরিল দিমিত্রিয়েভ ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে ‘ইউরোপের আত্মঘাতী পতন’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং এর পেছনে বিশৃঙ্খল অভিবাসনকেও দায়ী করেছেন।
বিভিন্ন সংকটের এই একসঙ্গে উপস্থিতি ফরাসি সরকারের জন্য কৌশলে ঘুরে দাঁড়ানোর খুব কম সুযোগই রেখেছে, যারা একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টে সামান্য ব্যয় সংকোচনকারী বাজেট পাস করতেই হিমশিম খাচ্ছে। আপাতত সরকার ধরে ধরে কারফিউ জারির মাধ্যমে সহিংসতা নেভানোর চেষ্টা করছে।
১৯৬৮ সালের মে মাসের ছাত্র-শ্রমিক অভ্যুত্থানের এক মাস পর, যা শার্ল দ্য গলের শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত ভোটাররা তাঁর দলকে এক বিশাল বিজয় উপহার দিয়েছিলেন—যে দলটি দেশে আইনশৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অবশ্য এর এক বছর পর, আঞ্চলিক বিকেন্দ্রীকরণ-সম্পর্কিত একটি গণভোটে হেরে দ্য গল পদত্যাগ করেন।
২০ বছর আগে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী থাকা গলিস্ট নেতা দমিনিক দো ভিলপ্যাঁ বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৭৮৮ সালের (ফরাসি বিপ্লবের ঠিক এক বছর আগে) ‘আঁসিয়াঁ রেজিম’ বা প্রাচীন রাজতন্ত্রের পতনের প্রাক্কালের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যখন ফ্রান্স অনাবৃষ্টি, ফসলের হানি এবং খালি রাজকোষের মুখোমুখি হয়েছিল।
এটি হয়তো একটু বাড়িয়ে বলা রূপক হতে পারে। তবে দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্র, মর্যাদাহীন রাজনৈতিক শ্রেণি এবং এক স্থবির আমলাতন্ত্র, যা এক ধীরগতির আর্থিক সংকটকে থামাতে পারছে না—এসব মিলে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাজিকে আরও অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছে।
গত সপ্তাহের এই বিস্ফোরণের আগপর্যন্ত, স্কুল ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে ক্ষোভ এবং তরুণ আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি বর্বরতার প্রতিবাদ—সবকিছুই উগ্র বামপন্থী নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁর প্রচারণাকে চাঙা করছিল বলে মনে হচ্ছিল। কিছু জনমত সমীক্ষায় তিনি মধ্যপন্থী এদুয়ার্দ ফিলিপকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিলেন।
তবে লুটপাট বা পুলিশের ওপর হামলার স্পষ্ট নিন্দা করতে মেলঁশঁর অনিচ্ছা এবং এই সহিংসতাকে ‘একটি সমাজের সাধারণ জীবনের অংশ’ বলে লঘু করে দেখা হয়তো তাঁকে সেসব মধ্যপন্থী বামপন্থী ভোটারের সমর্থন থেকে বঞ্চিত করবে।
বিনিয়োগকারীরা এই সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আতঙ্কিত হয়ে ফরাসি শেয়ার ও বন্ড বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফ্রান্সের পুঁজিবাজারের এই মন্দা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথ বদলে দিতে পারে, যেখানে ভীতসন্ত্রস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হয়তো কোনো সংকটকালে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মধ্যপন্থী প্রার্থীর পেছনে এসে দাঁড়াতে পারে।
১৯৬৮ সালের মে মাসের ছাত্র-শ্রমিক অভ্যুত্থানের এক মাস পর, যা শার্ল দ্য গলের শাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় ভীত ভোটাররা তাঁর দলকে এক বিশাল বিজয় উপহার দিয়েছিলেন—যে দলটি দেশে আইনশৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অবশ্য এর এক বছর পর, আঞ্চলিক বিকেন্দ্রীকরণ-সম্পর্কিত একটি গণভোটে হেরে দ্য গল পদত্যাগ করেন।
ঐতিহাসিক তুলনা সব সময় ঝুঁকিপূর্ণ। গত সপ্তাহের সহিংসতা ভোটারদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলার পক্ষে একটি বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা লো পেনকে এলিসি প্রাসাদে (ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন) পৌঁছে দিতে পারে।
কিন্তু আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে এবং প্রচারণাটি শুধু এটি নিয়েই চলে যে কে অর্থনীতিকে বাঁচাতে পারবে, তবে তিনি নিরাপত্তা বিষয়ে কঠোর এবং রাজকোষ নীতিতে আরও দক্ষ কোনো প্রার্থীর কাছে হেরেও যেতে পারেন। কারণ, অর্থনীতিই হলো লো পেনের দুর্বল জায়গা।
এখন পর্যন্ত ফিলিপ বা অন্যান্য মধ্যপন্থী এবং মধ্য ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের কেউই প্রচারণায় খুব একটা আগুন জ্বালাতে পারেননি। তবে ফরাসি রাজনীতিতে ছয় মাস অনেক দীর্ঘ সময়।
Publisher & Editor