বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পেলে নয়, মেসিকে ‘ইতিহাসের সেরা’ বললেন ব্রাজিলিয়ান তারকা

প্রকাশিত: ০১:৩৩, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১

লিওনেল মেসির প্রতি নিজের মুগ্ধতার কথা আগেও জানিয়েছেন ফেলিপে মেলো। এবারও আর্জেন্টাইন মহাতারকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সাবেক এই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার। মেলোর মতে, মেসিই ইতিহাসের সেরা ফুটবলার।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের উসিনা দেল আর্তেতে অনুষ্ঠিত ‘২০২৬ ওলে সামিট’-এর প্রথম দিনের আলোচনায় অংশ নেন মেলো। সেখানে নিজের ক্যারিয়ার, ব্রাজিলের বর্তমান দল, মেসি, নেইমার ও আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে কথা বলেন তিনি।

ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর বর্তমানে ব্রাজিলের গ্লোবোতে ফুটবল বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছেন মেলো। পাশাপাশি ব্রাজিলের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব আমেরিকানো দে কাম্পোসের মালিকও তিনি। দুই বছর আগে ক্লাবটি কেনার পর তার অধীনে দলটি দ্বিতীয় বিভাগের শিরোপা জিতেছে। আগামী মৌসুমে রিও ডি জেনেইরোর তৃতীয় বিভাগে খেলবে তারা।

প্রায় ৪২ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া মেলোর আর মাঠে ফেরার ইচ্ছা নেই। তবে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত ফুটবল খেলেন তিনি। পাশাপাশি টেনিস খেলছেন এবং বক্সিংয়েও ফিরেছেন। একসময় জিউ-জিৎসুও করতেন এই সাবেক ফুটবলার।

ব্রাজিলের বর্তমান দল নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন মেলো। কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা কোচ মনে করলেও তার কৌশলের সঙ্গে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ফুটবলধারার পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মেলো বলেন, ‘ব্রাজিলের হয়তো ইতিহাসের সেরা কোচ, অথবা সেরা তিনজনের একজন আছেন—আনচেলত্তি। কিন্তু ব্রাজিলের নিজস্ব একটা ডিএনএ আছে। সেটি ইতালিয়ান কোচের খেলার ধরন থেকে আলাদা।’

আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারায় হতাশ মেলো। নরওয়ের বিপক্ষে দলের খেলার ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তার মতে, ব্রাজিলের মতো দলের নরওয়ের বিপক্ষে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

মেলোর ভাষায়, ‘ব্রাজিলের ফুটবল হলো সাম্বার ফুটবল। আমরা নরওয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেললাম। এমন একটি দলের কাছে বল দিয়ে দিলাম, যারা জীবনে কিছুই জেতেনি। নরওয়ের বিপক্ষে খেলতে ভয় পাওয়া—ব্রাজিলের ফুটবলের জন্য এটা ভয়ংকর ব্যাপার।’

নেইমারের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেছেন মেলো। তার মতে, জাতীয় দলে ফিরতে হলে নেইমারের নিজের ইচ্ছাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘নেইমারের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সে চাইলে ফিরতে পারে। তার সেই মানের যথেষ্ট সামর্থ্য আছে। তবে তাকে ফিরতে চাইতে হবে,’ বলেন তিনি।

ব্রাজিলের দলীয় সমন্বয় আরও উন্নত করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন মেলো। তার মতে, শক্তিশালী দলীয় কাঠামো থাকলে ব্যক্তিগত প্রতিভা আরও ভালোভাবে ফুটে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘দলীয় শক্তি ব্যক্তিগত প্রতিভাকে অনেক সহায়তা করে। দল শক্তিশালী হলে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত দক্ষতা আরও উজ্জ্বল হয়। সেটা না হলে ব্যক্তিগত প্রতিভাও ঠিকভাবে ফুটে ওঠে না।’   

এরপরই আসে মেসির প্রসঙ্গ। আর্জেন্টাইন তারকার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে মেলো বলেন, মেসিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া উন্মাদনা আলাদা এক ব্যাপার।

তিনি বলেন, ‘মেসিয়ান চক্রের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে। মেসি যেখানে থাকে, সেখানে অনেক মানুষকে সঙ্গে টেনে নেয়। অনেক মানুষ মেসির জন্য আর্জেন্টিনার জার্সি পরে। ব্রাজিলেও একসময় রোনালদো, নেইমার ও রোমারিওকে ঘিরে এমনটা হয়েছে।’

মেসির প্রশংসা করতে গিয়ে মেলো জানান, অনেক ব্রাজিলিয়ানও আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির আরও একটি বিশ্বকাপ জয় দেখতে চেয়েছিলেন। তবে ব্রাজিলিয়ান হিসেবে নিজের দেশের প্রতি সমর্থন সবসময়ই থাকবে বলে জানান তিনি।

মেলো বলেন, ‘মেসি একেবারে পাগল করা ব্যাপার। অনেক ব্রাজিলিয়ানও চেয়েছিল আর্জেন্টিনা মেসির জন্য আরেকটি বিশ্বকাপ জিতুক। আমিও মেসির ভক্ত। আমার কাছে সে সেরা। কিন্তু আমি ব্রাজিলিয়ান। তাই সব সময় চাই ব্রাজিল জিতুক।’

এরপর আরও সরাসরি মেসিকে ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হিসেবে উল্লেখ করেন মেলো। তিনি বলেন, ‘মেসি ইতিহাসের সেরা। আমি পেলেকে খেলতে দেখিনি। জিকোকেও দেখিনি। রোনালদো, রোনালদিনিও, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, জিদান, নেইমার—অনেকেই আছেন। কিন্তু মেসিই ইতিহাসের সেরা।’

মেসির বিপক্ষেও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে মেলোর। স্পেনে আলমেরিয়ার হয়ে খেলার সময় মেসির বার্সেলোনার বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করেছিলেন তিনি। পরে ব্রাজিলের হয়ে রোজারিওতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ও পেয়েছেন।

মেসি, নেইমার ও রোনালদিনিওর মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন বলেও মন্তব্য করেন মেলো। তার ভাষায়, ‘মেসি, নেইমার, রোনালদিনিওদের কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়া অসম্ভব। বল চলে যায়, আর তারা বলটা নিজেদের কাছে রেখে দেয়।’

মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনা নিয়েও আশাবাদী মেলো। তার মতে, মেসির জায়গা নেওয়ার মতো কেউ নেই। তবে দেশটির ফুটবল কাঠামো শক্তিশালী হওয়ায় মেসি না থাকলেও আর্জেন্টিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল হিসেবে থাকবে।

মেলো বলেন, ‘মেসির কোনো বিকল্প নেই। একসময় আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা ছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনাকে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হয়েছে। আমি মনে করি, মেসি থাকুক বা না থাকুক, ম্যারাডোনা থাকুক বা না থাকুক—আর্জেন্টিনা সব সময়ই শক্তিশালী থাকবে।’

মেসি-পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনার জন্য বর্তমান কোচকে ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মেলো। রেসিং দে সানতান্দেরে আর্জেন্টিনার বর্তমান কোচের সঙ্গে দুই বছর খেলেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কোচের ওপর আস্থা রয়েছে তার।

মেলো বলেন, ‘মেসির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোচকে ধরে রাখা। আমরা রেসিং দে সানতান্দেরে দুই বছর একসঙ্গে খেলেছি। সে খুব পরিণত, খুব বুদ্ধিমান। তার সঙ্গে এমন একটি দল আছে, যেখানে অনেক সাবেক ফুটবলার কাজ করছেন। তারা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।’

ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকেও গভীরভাবে সম্মান করেন মেলো। পর্তুগিজ তারকার পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘আমি ক্রিস্তিয়ানোর প্রেমে পড়েছি। সে অবিশ্বাস্য পেশাদার। ৪১ বছর বয়সেও তার শরীর ১৮ বছরের ছেলের মতো। সে একটা দানব।’

তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে রোনালদোর ক্ষেত্রে দলীয় সহায়তার প্রয়োজন আরও বেড়েছে বলে মনে করেন মেলো। মেসির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মেলোর ভাষায়, ‘২৫ বা ৩০ বছর বয়সে ক্রিস্তিয়ানো একাই সবকিছু করত। এখন তার জন্য দলকে কিছু করতে হয়। মেসির ক্ষেত্রে সেটা নয়। ম্যাচ কঠিন হলে এবং খেলা আটকে গেলে সে নিচে নেমে আসে। সতীর্থদেরও গোল করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। সে সম্পূর্ণ একজন খেলোয়াড়।’

দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়েও নিজের মত জানিয়েছেন মেলো। কনমেবল ও ফিফার ‘লেজেন্ড’ হিসেবে থাকতে পেরে গর্বিত তিনি। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ে করা পুরোনো মন্তব্যের প্রসঙ্গেও কথা বলেন মেলো।

তার মতে, এমবাপ্পে হয়তো তখন মন্তব্যটি করার সময় বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ভাবেননি। মেলো বলেন, ‘আমার মনে হয়, সে তখন কী বলেছিল, তা নিয়ে ভাবেনি। এখন একই প্রশ্ন করা হলে হয়তো বলবে, দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল শক্তিশালী।’

দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের ফুটবলের পার্থক্যের পেছনে অর্থনীতি ও মাঠের অবকাঠামো বড় কারণ বলে মনে করেন মেলো। তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলে আমাদের মাঠের ঘাস খুব খারাপ। ইউরোপে অর্থনৈতিকভাবে তারা অনেক শক্তিশালী। আর্জেন্টিনাতেও অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। পার্থক্যটা মূলত অর্থনীতি ও ভালো ফুটবলের জন্য প্রয়োজনীয় মাঠে। এখান থেকেই বড় বড় খেলোয়াড় উঠে আসে।’

ভবিষ্যতে কোচিং ক্যারিয়ার নিয়েও বড় স্বপ্ন রয়েছে মেলোর। চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা লিবার্তাদোরেস ও বিশ্বকাপ জেতাই তার লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘আমি কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগ, লিবার্তাদোরেস ও বিশ্বকাপ জিতব। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার। পাঁচ বছর লাগুক বা ১০ বছর। সৃষ্টিকর্তাকে সামনে রেখে সব সময় এগিয়ে যাব।’

কোন ক্লাব দিয়ে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করতে চান, সেটিও জানিয়েছেন মেলো। তার পছন্দ আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বোকা জুনিয়র্স। মজা করে তিনি বলেন, ‘বোকা জুনিয়র্স। রিকেলমের মতো করে বলছি।’ বোকা সভাপতি হুয়ান রোমান রিকেলমের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানান মেলো।

বোকা জুনিয়র্সের কোচ হওয়ার সুযোগ পেলে সাহসী ফুটবল খেলানো দল গড়তে চান মেলো। তার ভাষায়, ‘আমার দল এমন হবে, যেখানে খেলোয়াড়েরা সাহস নিয়ে খেলবে। রক্ত গরম থাকবে। আমি গার্দিওলার মতো খেলতে পছন্দ করি। কৌশলগতভাবে আমার খেলায় গার্দিওলার অনেক প্রভাব আছে।’

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor