সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের লাগাতার বরখাস্ত ও ছাঁটাইয়ের ফলে চীনের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার সক্ষমতা বা প্রস্তুতি হয়তো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এতে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার মূল উৎস এই সামরিক বাহিনীর ওপর প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত ও পোক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন যখন তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণ করার প্রচেষ্টা জোরদার করছে এবং তাইওয়ানের পাশাপাশি দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরের তীব্র বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে, তখন এই ছাঁটাই অভিযানের দিকে কড়া নজর রাখছেন আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
চলতি সপ্তাহে ক্ষমতাসীন পলিটব্যুরোর (কমিউনিস্ট বা বামপন্থী রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ও নির্বাহী কমিটি) পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনীর দুই শীর্ষ নেতা ঝাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলিকে কমিউনিস্ট পার্টি ও সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কারের খবর এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের সর্বশেষ পদক্ষেপ এটি।
ঝাং ইউশিয়া ছিলেন শি চিনপিংয়ের বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তাকে শির সবচেয়ে কাছের সামরিক মিত্র হিসেবে দেখা হতো।
তিনি চীনের শীর্ষ প্রতিরক্ষা কমান্ড বডি ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’ (সিএমসি)-এ শির ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় সারির ডজনখানেক কর্মকর্তা সিএমসি, থিয়েটার কমান্ড এবং বিভিন্ন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে স্থলাভিষিক্ত হলেও সাত সদস্যের নীতি-নির্ধারণী এই পরিচালনা কমিটির পাঁচটি পদ এখনো ফাঁকা পড়ে আছে।
‘ক্ষমতাচ্যুত’ করায় শক্তিশালী হচ্ছে শির হাত
সিঙ্গাপুরভিত্তিক চীনা নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক জেমস চার বলেছেন, ঝাং এবং সামরিক বাহিনীর সাবেক শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তা মিয়াও হুয়ার অনুসারীদের পদচ্যুত বা বরখাস্ত করার মাধ্যমে শি চিনপিংয়ের হাত আরও শক্তিশালী হয়েছে।
জেমস বলেন, ‘আমরা আশা করতে পারি যে শি চিনপিং চীনের সামরিক বিষয়ের ওপর নিজের সিদ্ধান্তমূলক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বজায় রাখবেন এবং এর পরিবর্ধিত রূপ হিসেবে পার্টি ও রাষ্ট্রের ওপরও তার আধিপত্য বজায় থাকবে।
কারণ, যে পিপলস লিবারেশন আর্মিকে (পিএলএ) নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে শি চিনপিং চীনের আধুনিক ইতিহাসে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাহীনতা দূর করতে সবচেয়ে বড় অভিযান পরিচালনা করেছেন। এর ফলেই মূলত তাকে প্রতিষ্ঠাতা নেতা মাও সেতুংয়ের পর দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।
আমলাতন্ত্রের বিশাল বলয়ের মধ্যে থাকা লাখো মানুষের বিরুদ্ধে কম-বেশি তদন্ত চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে পার্টি, সরকার ও সামরিক বাহিনীর বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তদন্তের মুখোমুখি এবং বরখাস্ত করা হয়েছে।
চীনের থিঙ্কট্যাংক ‘গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউশন’-এর প্রেসিডেন্ট তিয়ান শিচেন বলেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত উপাদান নির্মূল করলে সশস্ত্র বাহিনীর রাজনৈতিক ভিত্তি, একতা এবং সামগ্রিক যুদ্ধ সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার বদলে আরো শক্তিশালীই হয়।’
ঝাং এবং লিউর বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে এসেছিল জানুয়ারিতে, যদিও তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কী শাস্তি দেওয়া হচ্ছে তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ব্যাপক রদবদলে নানা প্রশ্ন
সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে ব্যাপক রদবদল সত্ত্বেও চীন তাদের বর্তমান প্রতিরক্ষা অবস্থান বজায় রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রাখা এবং ক্রমান্বয়ে জটিল সামরিক মহড়া চালিয়ে যাওয়া।
তবে এই ছাঁটাই অভিযানের ফলে চীনের যুদ্ধ করার সক্ষমতা, বিশেষ করে স্বশাসিত গণতান্ত্রিক দ্বীপ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের সক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উল্লেখ্য, তাইওয়ানকে চীন নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে, যদিও তাইপে চীনের এই সার্বভৌমত্বের দাবি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সাথে সংক্ষিপ্ত কিন্তু রক্তক্ষয়ী সীমান্ত যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ঝাং। এটিই ছিল বাস্তব যুদ্ধে চীনের সর্বশেষ অংশ নেওয়ার ঘটনা। সেই হিসেবে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা থাকা সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন এই ঝাং।
লন্ডনের টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের চীন বিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতি উপদেষ্টা রুবি ওসমান বলেন, ‘পিএলএ তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমকে এই বিশৃঙ্খলা বা উত্তাল পরিস্থিতি থেকে মুক্ত রাখলেও, এত বড় মাপের ওলটপালট জটিল কোনো সামরিক অভিযানে, বিশেষ করে তাইওয়ানে পূর্ণমাত্রার কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সমস্যা তৈরি করবে না, তা ভাবা কঠিন।’
ওসমান আরো বলেন, ‘তবে শি চিনপিং স্পষ্টতই স্বল্পমেয়াদি এই বিঘ্নকে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা ও যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য একটি দেওয়ার মতো মূল্য হিসেবেই দেখছেন।’
শুরুতে এই শুদ্ধি অভিযান দুর্নীতিকে লক্ষ্য করে শুরু হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে, পিএলএর অভিজাত ‘রকেট ফোর্স’-এর কেনাকাটার বিষয়গুলো, যা চীনের ঐতিহ্যবাহী ও পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে ধীরে ধীরে এই অভিযান একটি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে, যাকে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, পিএলএ প্রধানত রাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং পার্টির সেবা করার জন্যই বিদ্যমান, এই বার্তাটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা তিয়ান বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সেই বক্তব্য খারিজ করে দেন, যেখানে বলা হয়েছিল শি চিনপিংয়ের ‘ব্যক্তিগত ক্ষমতা’ কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। তিয়ান বলেন, পিএলএ-র মূল নীতিই হলো ‘সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির চূড়ান্ত ও পরম নেতৃত্ব।’
সিঙ্গাপুরের এস. রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জেমস চার বলেছেন, তিনি আশা করছেন না যে ২০২৭ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণাঙ্গ কংগ্রেসের আগে কমিশনের শীর্ষ প্যানেলের খালি পদগুলো পূরণ করা হবে।
ঐ অনুষ্ঠানে শি চিনপিং তার চতুর্থ পাঁচ বছরের মেয়াদ নিশ্চিত করবেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সম্ভাবনা থেকেই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করার তাগিদ আরো তীব্র হয়েছে।
পদ পূরণের এই বিলম্ব চীন এবং বিদেশি সামরিক বাহিনীর মধ্যকার যোগাযোগ ও সংলাপে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা বজায় থাকার এই সময়ে কূটনীতিকদের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ডং জুন তার পদে বহাল থাকলেও, তিনি ক্ষমতাসীন পলিটব্যুরো বা সিএমসির সদস্য নন। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যান্য সমকক্ষদের তুলনায় তাকে কম শক্তিশালী মনে করা হয়।
২০২৪ সালে বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভানের সঙ্গে ঝাংয়ের বৈঠককে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সামরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে ঝাংয়ের স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’-এর ইন্দো-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের প্রধান বনি গ্লেসার বলেন, মধ্যবর্তী এই সময়ে শি চিনপিং হয়তো কিছু সিদ্ধান্ত একাই নিচ্ছেন।
Publisher & Editor