কিডনি রোগ অনেক সময় নীরবে শরীরে অগ্রসর হয়। ফলে বড় আকারের ক্ষতি হওয়ার আগে অনেক রোগীই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। এবার কিডনি রোগ আরও দ্রুত শনাক্ত ও মূল্যায়নে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক তিনটি প্রযুক্তি তৈরি করেছেন ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মাদ্রাজ (আইআইটি মাদ্রাজ) এবং ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ (সিএমসি), ভেলোরের গবেষকরা।
আইআইটি মাদ্রাজের অধ্যাপক জি. এল. স্যামুয়েল এবং গবেষক জেনিফার ডিলাইটার নেতৃত্বে, সিএমসি ভেলোরের অধ্যাপক সন্তোষ ভারুগিসের সহযোগিতায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষক দলটি কিডনি মূল্যায়নের তিনটি ভিন্ন পর্যায়ের জন্য প্রযুক্তি তৈরি করেছে—ক্লিনিক্যাল ও ল্যাবরেটরি তথ্য ব্যবহার করে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর ঝুঁকি পূর্বাভাস, সিটি স্ক্যানে কিডনির বিভিন্ন অস্বাভাবিকতা শনাক্ত ও শ্রেণিবিন্যাস এবং রোগীর নির্দিষ্ট থ্রিডি কিডনি মডেল তৈরি করে টিউমারের পরিমাণ নির্ণয়।
এই উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৭ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজে আক্রান্ত। সংস্থাটি কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে সহজ রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করার পরামর্শ দেয়।
কিডনি রোগ শনাক্তে তিনটি এআই প্রযুক্তি
প্রথম প্রযুক্তিটি একটি মেশিন-লার্নিং মডেল, যা ক্লিনিক্যাল ও ল্যাবরেটরি তথ্য বিশ্লেষণ করে একজন ব্যক্তির ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর ঝুঁকি পূর্বাভাস দিতে পারে। গবেষকরা এর জন্য একটি ব্যবহারবান্ধব প্রোটোটাইপ ইন্টারফেসও তৈরি করেছেন। চিকিৎসকদের কাছে মডেলটির পূর্বাভাস আরও নির্ভুল ও সহজবোধ্য করতে কাজ চলছে।
দ্বিতীয় প্রযুক্তিটি একটি ডিপ-লার্নিংভিত্তিক সিটি ইমেজ ক্লাসিফায়ার। এটি ১২ হাজারেরও বেশি কিডনি ছবির মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হয়েছে। প্রযুক্তিটি কিডনিকে চারটি শ্রেণিতে শনাক্ত করতে পারে—স্বাভাবিক কিডনি, কিডনি সিস্ট, কিডনিতে পাথর এবং কিডনি টিউমার। কিডনির সিটি-ভিত্তিক এই মাল্টিক্লাস শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে গবেষণাটি ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রোলজির ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব নেফ্রোলজিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তৃতীয় প্রযুক্তিটি সিটি স্ক্যান ব্যবহার করে রোগীর নির্দিষ্ট কিডনির থ্রিডি মডেল তৈরি করে। এর মাধ্যমে কিডনিতে থাকা টিউমারের আয়তন এবং কিডনির কত শতাংশ অংশ আক্রান্ত হয়েছে, তা হিসাব করা সম্ভব।
আইআইটি মাদ্রাজের অধ্যাপক জি. এল. স্যামুয়েল বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন বুদ্ধিমান ব্যবস্থা তৈরি করা, যা চিকিৎসকদের দ্রুত ও আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। ক্লিনিক্যাল জ্ঞানের সঙ্গে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে আমরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছি, যা কিডনি রোগ দ্রুত শনাক্ত করতে এবং রোগীর জন্য আরও বিস্তারিত তথ্য দিতে চিকিৎসকদের সহায়তা করবে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিডনি চিকিৎসার পথে
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিগুলো একটি ‘কিডনি ডিজিটাল টুইন’ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি হবে একজন রোগীর কিডনির একটি রোগী-নির্দিষ্ট ভার্চুয়াল প্রতিরূপ। এর মাধ্যমে চিকিৎসকরা রোগের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে পারবেন।
গবেষক জেনিফার ডিলাইটা বলেন, কিডনি রোগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এআই প্রযুক্তিগুলো ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের আগেভাগে শনাক্ত করতে এবং আরও কার্যকরভাবে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সহায়তা করতে পারে। রোগী-নির্দিষ্ট ইমেজিং প্রযুক্তিটি বিশেষভাবে আশাব্যঞ্জক, কারণ এটি প্রচলিত পরিমাপের বাইরে গিয়ে রোগের বিস্তার সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা দিতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগুলো এখনও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে বৃহত্তর ও অতিরিক্ত রোগী-তথ্য ব্যবহার করে এগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।
কেন কিডনি রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ?
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদ্রোগ—বিশেষ করে হার্ট ফেইলিউর—আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নিয়মিত ও সময়মতো পরীক্ষা করলে কিডনির গুরুতর ক্ষতি হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
এই দিক থেকে আইআইটি মাদ্রাজ ও সিএমসি ভেলোরের গবেষণা কিডনি চিকিৎসায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক অগ্রগতি। তবে এসব প্রযুক্তি চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়; বরং চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ-এর ঝুঁকি পূর্বাভাস থেকে শুরু করে সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ এবং কিডনি টিউমারের ত্রিমাত্রিক পরিমাণ নির্ণয়—তিনটি প্রযুক্তিই ভিন্ন পদ্ধতিতে একই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে: কিডনি রোগ আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং ভবিষ্যতে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিকভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা করা।
বৃহত্তর পরিসরে আরও গবেষণা ও যাচাইয়ের পরই বোঝা যাবে, এই প্রযুক্তিগুলো গবেষণাগার থেকে বাস্তব চিকিৎসা ব্যবস্থায় কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
সূত্র: এনডিটিভি
Publisher & Editor