বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শরম পেয়েছি, জাতির কাছে ক্ষমা চাই

প্রকাশিত: ০২:১৭, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |

মহান মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর জন্মবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন ও পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। 

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ দাবি জানান।

মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে শরম পেয়েছি, আমি জাতির কাছে ক্ষমা চাই। আমরা জেনারেল ওসমানীর প্রতি কোনো মর্যাদা রাখিনি। তার সম্পর্কে কোনো পাঠ্যপুস্তকে একটা তথ্যও নেই।

ওসমানীর যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা, তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন এবং পাঠ্যপুস্তকে তার জীবন ও অবদান অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) মরহুম জেনারেল এমএজি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী ছিল। ঘটনাক্রমে আমি ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে কিছু বিষয় লক্ষ্য করি। আমার মনে হয়েছে, এই দেশে জেনারেল ওসমানী নামে কোনো লোকের জন্মই হয়নি।

পরে নিজে বিষয়টি জানার চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, টেলিভিশন অনুসরণ করলাম, পত্রিকায় দেখলাম। কিন্তু জেনারেল ওসমানীর জন্মবার্ষিকীর বিষয়টি নিয়ে কোথাও কোনো নিউজ নাই।

বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নানা ধরনের টকশো হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, টকশোজীবীরা ভালোই করছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গটি কেউ প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শরম পেয়েছি।

মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, আমি ভাবলাম, আমি তো একটা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে আছি— এটা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক। এখানে মাত্র একটা মিটিং হয়েছে। আমি ভাবছিলাম, উনারা তো কিছু... আমি কুমিল্লায় ছিলাম। কুমিল্লা থেকে এসে প্রোগ্রামে যোগদান করেছি।

তথ্যমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত না থাকার কথা উল্লেখ করে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, তথ্যমন্ত্রী এখানে নাই। এত কিছু টেলিভিশনে দেখায়, এটা দেখানোর সুযোগ হয় নাই। টেলিভিশনে দেখায় না এমন কিছু আমাদের দেশে নাই।

দেশে অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে কত লাখ চ্যানেল, তাও আমি জানি না। আমরা কেউ করলাম না। সবাই তো সরকারের কাছে দায়বদ্ধ।

এরপর তিনি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এমনকি একটি ছোট্ট স্মৃতিচারণ করে বলব, ৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। খেমকারণ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। সেই যুদ্ধে যদি জেনারেল ওসমানীর ইনভলভমেন্ট লাগত... জেনারেল জিয়া পরে হয়েছেন, না থাকত—খেমকারণ সেদিন পাকিস্তান রক্ষা করতে পারত না। ওই অংশ পর্যন্ত ভারত দখল করত।

জেনারেল ওসমানীর অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অন্তত তার অবদানের জন্য এই দেশের মানুষের, যারা সংশ্লিষ্ট, স্মরণ রাখা উচিত। মুক্তিযুদ্ধে কী করেছেন, এটা নিয়ে বলতে গেলে ঘণ্টা লাগবে।

এরপর নিজের ক্ষোভের কথা তুলে ধরে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, আমি শুধু বলব, আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শরম পেয়েছি। আমি জাতির কাছে ক্ষমা চাই। আমরা জেনারেল ওসমানীর প্রতি কোনো মর্যাদা রাখিনি।

পাঠ্যপুস্তকে জেনারেল ওসমানীর অবদান যথাযথভাবে তুলে না ধরার অভিযোগ করে তিনি বলেন, তার সম্পর্কে কোনো পাঠ্যপুস্তকে একটা কিছু নাই। এইটা একটা ষড়যন্ত্র বলে মনে করি, যাতে মানুষ তাকে মনে না রাখে।

নিজে বিভিন্ন বই সংগ্রহ করে বিষয়টি যাচাই করার চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো পাঠ্যপুস্তক—আমি যা বই সম্ভব কালেকশন করেছি, বাচ্চাদের বই, স্কুলের বই—এক দিনের মধ্যে কোথাও আমি দেখি নাই। হতে পারে আমার না জানা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুলে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, এই দেশটা বাংলাদেশ এবং এটা আমরা স্বাধীন করেছি কারও দয়ায় নয়।

জেনারেল ওসমানীর সামরিক জীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমএজি ওসমানী সরকারের একজন ছিলেন, যিনি রিটার্ন করার পরে যাকে প্রমোশন দেওয়া হয়নি শুধু বাঙালি হওয়ার কারণে, ইস্ট বেঙ্গলের নেতৃত্বের কারণে। সেই ব্যক্তি কমান্ড গ্রহণ করেছিলেন।

জেনারেল ওসমানীকে নিরহংকার, সৎ ও সাহসী ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরহংকার, সৎ, সাহসী—কোনো লোক যদি বাংলাদেশে জন্ম হয়ে থাকে, জেনারেল ওসমানী একজন।

তিনি জেনারেল ওসমানীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বলেন, আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

এরপর স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে সংসদীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানান মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, আপনার কাছে আশা করি, আমি নোটিশও দিয়েছি। এজেন্ডা দিয়ে এই সময়ে সংসদ থেকে একটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত—তার জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা বাধ্যতামূলক অথবা জাতীয় কর্মসূচিতে, পুস্তকে তার জীবন যাতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ব্যাপারে একটি সরাসরি সিদ্ধান্ত আপনার কাছে প্রত্যাশা করছি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor