মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কলা ভালো না ওষুধ ভালো

প্রকাশিত: ০৬:৩৩, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১৩

ছোটনরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে দাদির হাঁটুর ব্যথার ককানি। ছোটন একবার জিজ্ঞেস করেছিল—দাদি, তোমার বাতের ব্যথা মানে হাঁটুর ব্যথা কত দিন ধরে?

দাদি উত্তর দেন, সেই ছোটবেলা থেকে।

ছোটন বলে, বাহ, এটা হয় নাকি?

দাদি বলেন, কি জানি রে ভাই, আমার তো মনে নাই কবে থেকে বাতের ব্যথা। অনেক বয়স হইল তো।

ছোটন ভাবে, হলেও হতে পারে। তারা তো সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে।

ফুটবল খেলতে গিয়ে ব্যথা পেলেই মনে থাকে না কী বারে ব্যথা পেয়েছিল। আসলেই অনেক দিন হয়ে গেলে মনে থাকার কথা নয়।
দাদির যত কথা ছোটন আর বড় চাচার ছেলে বিনুর সঙ্গে। দাদি একতলায়, ছোটনরা দোতলায় আর বিনুরা তিনতলায় থাকে।

যখন টিচার আসে তখন ছোটন, ছোটনের ছোট বোন বিন্তি আর বিনুরা একসঙ্গে পড়তে বসে। রাতে বিনু আর ছোটন নিচতলায় ঘুমায়। তখন রাজ্যের গল্প হয় দাদির সঙ্গে।
দাদি এমনিতে কোনো রোগ-বালাইয়ের কথা ছেলেদের সামনে বলেন না। কারণ বললেই বলবে, চলো ডাক্তারের কাছে।

 তাঁর সব সুখ-দুঃখের কথা ছোটন আর বিনুর সঙ্গে। দাদি ছোটনকে কাছে পেয়ে বলেন—বুঝলি, ডাক্তারের কাছে গেলেই অনেক ওষুধ ধরিয়ে দেয়। এসব কি আর বুড়োকালে মুখে রোচে? তোরা বল?
তার পরও অসুখ-বিসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না? ছোটন বেশ বুদ্ধি খাটিয়ে বলে। ছোটনের এখন অনেক বুদ্ধি। সে গত জানুয়ারিতে ক্লাস এইটে উঠেছে।

ছোট চাচা অফিস থেকে প্রথমে দাদির ঘরে ঢোকেন। প্রথমেই দাদি বলা শুরু করেন, আরে রাতে ঘুমাইতে পারি না। হাঁটুর এমন ব্যথা।

ছোটনের ছোট চাচা বলেন—মা, আমি তো ডাক্তার না, আমাকে বলে লাভ কি? চলো তোমাকে ডাক্তার দেখাই।

দাদি রেগে ওঠেন, তুই আমার সামনে থেকে যা। যা, গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে খা গিয়ে।

—তাহলে ডাক্তার দেখাবে না?

—নাহ্ বললাম না? না। তুই যা। দাদি পাশ ফিরে শোন। ছোট চাচা চলে যান মন খারাপ করে।

দাদি পরদিন বিনু আর ছোটনকে ডাকেন। গলার স্বর নিচু করে বলেন, আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল।

ছোটন আর বিনু অবাক, দাদি ডাক্তারের কাছে যেতে চাইছে!

—কোন ডাক্তার? বিনু জানতে চায়।

—আমার সঙ্গে চল। আমি নিয়ে যাব। আসার পথে তোদের ডালপুরি, শিঙাড়া খাওয়াব।

বাবা আর চাচা বাসা থেকে বের হয়ে গেলেই তিনজনও ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ে। কিছুদূর যেতেই শেফালির মা এসে ওদের তিনজনের সঙ্গে হাঁটতে থাকে। শেফালির মা হচ্ছে এ বাড়ির কাজের লোক এবং দাদি তার ভক্ত। তার মানে দাদির সঙ্গে আগেই পরামর্শ হয়েছে কিভাবে যাবে। শেফালির মা পথ দেখিয়ে মুরগিপট্টির গলির মুখে বিশুর ওষুধের দোকানে নিয়ে যায়। বিশু বলল, যান মাসি ভেতরে যান, ডাক্তার আছেন। এই তোমরা ছোটরা যাইয়ো না। সামনের টুলে বসো।

শেফালির মা আর দাদি ভেতরে ঢুকলেন। ডাক্তারের মরণদশা। এমন ঘ্যাগড় ঘ্যাগড় করে কাশি দেন, শুনেই ভয় লাগে। রোগী আসিবার পূর্বেই ডাক্তার মরিয়া যায় কি না!

—কী অসুবিধা? ডাক্তার জানতে চান।

শেফালির মা দাদির হয়ে জবাব দেন, বাতের ব্যথা।

—এই বয়সে বাতের ব্যথার জন্য ডাক্তারের কাছে আসতে হয়? ডাক্তার রাগ হয়ে বলেন।

—দাদি বলেন, আমি আসতাম না, এই শেফালির মা বুদ্ধি দিয়েছে।

এরপর বুড়ো ডাক্তার আর কিছু বলেন না। ঘসঘস করে ওষুধ লিখতে থাকেন। অনেক ওষুধ। তারপর বলেন, যান এবার।

সামনে বিশু বসে ছিল। শেফালির মা তাকে বলল, এই তোর ডাক্তার বড় খেকুড়ে। এটা না পাল্টালে রোগী আসব না। বিশু বলল, কই দেখি প্রেসক্রিপশন?

দাদি বললেন, এই নাও ভিজিটের টাকা। ওষুধের টাকা নাই। ওষুধ পোলারা কিনে দেবে। এই চল চল। আবার সবাই মিলে বাসার দিকে হাঁটা দেয়।
 
সন্ধ্যার পর ছোটনের বাবা ফিরে এলে দাদি বলেন, এই সব সময় তো বলিস ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তার দেখিয়েছি। এবার ওষুধ কিনে আন। এই নে প্রেসকিপশন।

ছোটনের বাবা বলেন—কিন্তু মা, কোনো ডাক্তারের নাম দেখতে পাচ্ছি না!

দাদি বলেন, ডাক্তারের নাম দিয়ে কি হবে? ওষুধের নাম আছে কি না সেটা দেখ। নাকি তা-ও নাই?

—আচ্ছা ঠিক আছে।

পরদিন সকালেই দাদিকে একগাদা ওষুধ এনে দেন। দাদি ওষুধের পরিমাণ দেখেই গজগজ করতে লাগলেন, এত ওষুধ ওই ডাক্তার ঘাটের মড়াটাকে দিয়ে আয়। এত ওষুধ আমি খেতে পারব না।

বিনুর বাবাও ততক্ষণে হাজির। বললেন—মা, এবার কিন্তু ওষুধগুলো তোমাকে শেষ করতে হবে।

দাদি বলেন, ওষুধ বেচে এক ফানা কলা নিয়ে আয়, তা-ও সবাই মিলে খাইতে পারব।

দাদির কথা শুনে ছোটন আর বিনু মনে মনে ভাবে, তাহলে আরো মজা হবে। ছোটনের বাবা বললেন—মা, অনেক টাকার ওষুধ। খাও। একদম অবহেলা করবে না।

পরের দিন দুপুরবেলা দাদি আবার ছোটন আর বিনুকে ডাকেন, শোন ভাই, একটা কাজ করতে পারবি?

দুজন একসঙ্গে বলে ওঠে, পারব।

—শোন ভাই। ওষুধ আমি খাব না। মুখে রুচি নাই। ফেলে দিয়ে লাভ কি? তার চেয়ে এক কাজ কর, ওষুধগুলো বেচে দিয়ে এক ফানা কলা নিয়ে আয়।

বিনু উৎসাহিত হয়ে বলে, কোথায় বেচব দাদি?

—বিশুর দোকানে।

ছোটন জানতে চায়, তুমি কেমন করে জানো ওই দোকানে ওষুধ কিনবে?

দাদি জানান, শেফালির মা বলেছে। আসলে শেফালির মা-ই দাদিকে সবকিছু জানায়।

ছোটন আর বিনু একমুহূর্ত দেরি করো না। তারা ওষুধ যা-তা দামে বেচে বড় বড় দুই ফানা কলা নিয়ে আসে। দাদি আর ছোটন ও বিনু মিলে বেশ কিছু কলা খায়।

সন্ধ্যাবেলা। ছোটন আর বিনু পাশে একটা বড় টেবিলে পড়ছিল। ছোটনের বাবা দাদির ঘরে এসে বলেন— মা, আজ কেমন লাগছে?

দাদি বলেন, ভালো লাগছে।

—ওষুধ খেয়েছ?

—দাদি বলেন, কলা খাবি?

—নাহ। এখন কলা খাব না। ওষুধ খেয়েছ?

—কলা খা না একটা।

—না মা, এখন নয়। কলা খেতে বলছ কেন?

—বাহ, কলা কি খাওয়ার জিনিস না?

—তা না, পরে খাব। ওষুধ খেয়েছ?

—না। ওষুধ বেচে দিয়েছি। ওষুধ বেচে কলা আনাইছি।

—অ্যাঁ, কী বলছ মা?

—কি আবার? কলা। ওষুধের চেয়ে কলা কি ভালো জিনিস না?

এমন সময় বিনুর বাবাও এসে পড়েন।

ছোটনের বাবা বলেন, আরে সব্বনাশ হয়েছে রে। মা তো সব ওষুধ বেচে দিয়েছে! ওষুধ বেচে কলা আনিয়েছে!

এ কথা শুনে ছোটন আর বিনু ভয়ে বেশি করে পড়ায় মনোযোগ দেয়।

চাচা এবার গম্ভীর মুখে দাদির কাছে জানতে চান, তোমাকে কে ওষুধ বেচে কলা এনে দিয়েছে? এতগুলো টাকার ওষুধ।

দাদি কি এখন বলে দেবেন আমাদের নাম? ছোটন আর বিনু ভয়ে কাঁটা হয়ে ভাবতে থাকে।

দাদি কোনো ভয় না পেয়ে চাচাকে বলেন, বলব কেন সেই কথা? খাবি নাকি একটা কলা?

চাচা রাগ করে উঠে চলে যান। এবার ছোটনের বাবা ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলেন, তোরাই ওষুধ বিক্রি করে মাকে কলা এনে দিয়েছিস?

ছোটন আর বিনু চুপ করে থাকে। কলার ওপর বাবা আর চাচার কেন এত রাগ? দাদি এবার ছোটনদের পক্ষ হয়ে পুরোপুরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তুই যা এখান থেকে। ইস, কলা খাবে না? ওষুধ গিলবে? মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখ, কলা ভালো না ওষুধ ভালো?

বাবা কিড়মিড় করে ছোটন আর বিনুকে বলেন, দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষছি! পাজির দল।

দাদি শুধু বলেন, তাহলে বোঝ, সাপও কলা খায়।

বাবা দাদির কথা শুনে আর একটা কথাও না বলে রাগে ঘর ছেড়ে চলে যান। ছোটন আর বিনুর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। যাক বাবা, বাঁচা গেছে এবারের মতো।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor