ছবি: সংগৃহীত
ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোকে আরো বড় দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইউরোপে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন নিজ দেশের আশপাশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে। বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা কতটা কমানো হবে, তা এখন পর্যালোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে ন্যাটোর সামরিক সক্ষমতার জন্য ইউরোপে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সেনা সরিয়ে নেবে, তা ইউরোপীয় মিত্র দেশ ও কানাডা জোটের দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে ওয়াশিংটনের দাবিতে কতটা সাড়া দেয়, তার ওপর নির্ভর করবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার বড় অংশের দায়িত্ব নেবে ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো। প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সহায়তা করবে। এই ব্যবস্থার আওতায় পারমাণবিক প্রতিরক্ষার বিষয়টিও থাকবে।
বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটোর সদর দপ্তরে একটি বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী এলব্রিজ কলবি জার্মানি, পোল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অন্য মিত্রদের কাছ থেকেও আরো বেশি উদ্যোগ দেখতে চায়। সাংবাদিকদের কলবি বলেন, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর কাছ থেকে ওয়াশিংটন আরো বেশি কিছু আশা করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ন্যাটোকে আরো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করা।
একই সঙ্গে জোটের সামরিক দায়িত্ব আরো ভারসাম্যপূর্ণভাবে ভাগ করে দিতে চায় ওয়াশিংটন। কলবির ভাষায়, ন্যাটোকে এমন একটি কাঠামোয় নিয়ে যেতে হবে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর এবং সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই ইউরোপে মার্কিন সামরিক অবস্থান পর্যালোচনা করা হবে।
ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা কীভাবে পূরণ করবে, তা জানতে প্রতিরক্ষা দপ্তর বিভিন্ন দেশকে একটি প্রশ্নপত্র পাঠিয়েছে। কলবি জানান, এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ প্রশ্নপত্রের উত্তর দিয়েছে। এখন সেসব উত্তর পর্যালোচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে কোন কোন দেশ উত্তর দিয়েছে, তা তিনি প্রকাশ করেননি। এই প্রশ্নপত্রে শুধু ন্যাটোর সামরিক দায়িত্ব নিয়ে তথ্য চাওয়া হয়নি। মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটি ও আকাশসীমায় মার্কিন সেনাদের প্রবেশের সুযোগ নিয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কোনো সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হলে মার্কিন বাহিনী যেন মিত্র দেশগুলোর ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারে, সে বিষয়ে আগাম নিশ্চয়তা চাচ্ছে ওয়াশিংটন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর সময় ইউরোপের কয়েকটি দেশ দ্বিধায় পড়ে যায়। কারণ, ওয়াশিংটন মিত্রদের সঙ্গে আগাম আলোচনা না করেই অভিযান শুরু করেছিল। এর পর থেকেই মার্কিন বাহিনীর জন্য ইউরোপের ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কলবি বলেন, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইউরোপেরও স্বার্থ রয়েছে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সক্ষমতা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন এমন একটি পরিস্থিতি চায়, যেখানে সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হলে আগে থেকেই কীভাবে তা পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকে।
ন্যাটোর ভেতরে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর দায়িত্ব বাড়ানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র যখন চাপ দিচ্ছে, একই সময়ে ইউরোপে নিজেদের সেনা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন। বর্তমানে ইউরোপে প্রায় ৮০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এই সংখ্যা আরো কমানো হবে কি না, হলে কতটা কমানো হবে- তা এখন পর্যালোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে আরো বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। ওয়াশিংটন প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করবে, কিন্তু ইউরোপের নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব একা যুক্তরাষ্ট্র বহন করবে না। ফলে ন্যাটোর সামরিক কাঠামোয় দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই নতুন কাঠামোয় কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দেয় তার ওপর।
Publisher & Editor