সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬

অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে সময়মতো উঠবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ০৭:৩৪, ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৪

সকালে ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম সেট করা অনেকেরই দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে গেছে। বিশেষ করে কর্মজীবনে যারা নিয়মতান্ত্রিক থাকেন, তাদের জন্য অ্যালার্ম সেট করা আবশ্যক হয়ে ওঠে।

সকালে সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে না পারলেই অফিসের জন্য প্রস্তুত হওয়া, সকালের নাশতা করা, বাসা থেকে বের হয়ে পথ পাড়ি দিয়ে সময়মতো অফিসে যাওয়ার নানা দুশ্চিন্তা থাকে। এ কারণে আগেই ফোনে বা ঘড়িতে অ্যালার্ম সেট করে রাখা হয়, যাতে সকালে নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে ওঠা যায়।

তবে জানেন কি, অ্যালার্ম সেট না করেও সময়মতো ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করা সম্ভব? বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় স্কুলজীবনের নিয়মিত রুটিন হয়তো শরীরে একটি নির্ভরযোগ্য জৈবঘড়ি তৈরি করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সময়সূচি আরো বৈচিত্র্যময় হওয়ায় ঘড়ি বা ফোনের অ্যালার্মের শব্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া হয়।

সঠিক সময় নিজ থেকেই ঘুম থেকে ওঠার জন্য শরীরকে প্রশিক্ষিত করা শারীরিক সুস্থতায় বিভিন্ন উপকার বয়ে আনতে পারে। যেমন- সকালে ঝিমুনি কমানো থেকে শুরু করে মেজাজ ভালো হওয়া। এ ক্ষেত্রে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু সহজ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়, যা সকালে ঘুম ওঠাকে আরও সহজতর করে।

নিজ ছন্দ খোঁজা
শরীর ও মন ঠিকমত কাজ করতে দৈনন্দিন পর্যাপ্ত ঘুম হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানোর লক্ষ্য থাকা উচিত (কারণ, ছয় ঘণ্টার কম খুব অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ায়)। তবে সবার জন্য প্রযোজ্য, এমন কোনো নির্দিষ্ট বা আশ্চর্যজনক সময় নির্ধারণ নেই। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমন বলেন, আট ঘণ্টা হচ্ছে একটি মাঝামাঝি মান। কিন্তু কেউ সাত ঘণ্টা ঘুমেও ভালো থাকে, আবার কারও কারও নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। মূলত ব্যক্তির সার্কাডিয়ান ছন্দের ওপর নির্ভর করে কিছু জৈবিক পার্থক্য থাকে।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহের ছুটি বা বিশ্রামের দিন যখন কোনো অ্যালার্মের প্রয়োজন হয় না, সেদিন ঘুম থেকে ওঠার সময়ের ব্যাপারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি আদর্শ সুযোগ। কেবল পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম নয়, নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহ-পরিচালক হেলেন বার্গেস জানিয়েছেন, অন্তত একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যেতে হবে এবং তা এতটাই আগে হওয়া নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রয়োজনীয় আট ঘণ্টা পূরণ করা সম্ভব হয়। শরীর এই নিয়মিত রুটিনের প্রতিক্রিয়া পেলে এবং প্রায়ই এই রুটিনে অভ্যস্ত হলে শরীর নিজ থেকে শিথিল হতে শুরু করবে।

আলো ও ঘুমের প্রস্তুতি
শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়িকে ঘুমের সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য আলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ ব্যাপারে বেন সাইমন বলেন, আদর্শ অবস্থায় এই দুই ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করতে পারে, যাতে রাতে ক্লান্ত ও দিনে সজাগ থাকতে পারেন আপনি।

এছাড়া প্রাকৃতিক আলো আপনাকে ঘুম ও জেগে ওঠার সংকেত দেয়া হরমোনগুলোকেও সক্রিয় করে থাকে।

রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী, ঘুম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আনা জয়েস জানান, জৈবঘড়ির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হচ্ছে আলো। যা মেলাটোনিনকে বন্ধ হওয়ার নির্দেশ দেয় এবং জানান দেয় যে, ঘুম থেকে ওঠার সময় হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের ঝলমলে আলো উল্লেখযোগ্য অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব ফেলতে পারে। কেননা, এটি স্বাস্থ্যকর মাত্রায় সেরোটোনিন সরবরাহ করে থাকে। রাতে ব্ল্যাকআউট পর্দা বা যে পর্দা পরিপূর্ণভাবে আলো ঢেকে রাখে এবং আই মাস্ক ব্যবহার করা হতে পারে ভালো পরিকল্পনা। পরে সকালে ঘুম থেকে ওঠেই পর্দা সরিয়ে আলো ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়ে। এই হরমোন মানুষকে সজাগ ও কর্মপ্রস্তুত হওয়ার জন্য সহায়তা করে।

বেন সাইমন বলেন, এটি জৈবঘড়িকে জানান দেয়, ঠিক আছে, এটি আমাদের দিনের শুরু। আর আনা জয়েজ বলেন, আপনি যখন ঘুমাতে চান, তার দুই ঘণ্টা আগে থেকে শান্ত বা স্থির হওয়ার রুটিন থাকা উচিত।

এই প্রক্রিয়া কী বা কেমন হবে, তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। যেমন- সন্ধ্যায় ত্বকের যত্ন নেয়া, দাঁত ব্রাশ করা বা আরামদায়ক জামা-কাপড় পরা। আলোর তীব্রতাও কমিয়ে আনা জরুরি। কেননা, এটি শরীরকে মেলাটোনিন উৎপাদনের সংকেত দিয়ে থাকে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। আবার শরীরের তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। রাতে শরীরের মূল তাপ কমে যায়। কারণ, ওই সময় কম শক্তি ব্যয় হয়। শরীর রক্তনালীর প্রসারণের মাধ্যমে হাত ও পায়ের সাহায্যে অবশিষ্ট শক্তি বের করে থাকে। ফলে গরমে ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে কষ্ট হয় আমাদের। তীব্র গরমের জন্য ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে ফ্যান বা এসি আরামদায়ক তাপমাত্রায় আগে থেকেই সেট করে রাখলে এবং তুলনামূলক হালকা বা পাতলা পোশাক ব্যবহার করা যেতে পারে।

সময়সূচি পরিবর্তন
কর্মজীবন কিংবা ব্যক্তিগতসহ নানা কারণে ধারাবাহিক ও প্রকৃত অর্থে আরামদায়ক ঘুম হওয়া খুবই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অভ্যাসগুলোর যেকোনোটি দৈনন্দিন রুটিনে সংযুক্ত করা গেলে রাত আরও আরামদায়ক হতে পারে এবং ঘুম থেকে ওঠার প্রক্রিয়াও আরও সহজ হতে পারে।

হেলেন বার্গেসের ভাষ্যমতে―ঘুম আরামদায়ক করা ও ওঠার প্রক্রিয়া অধিকতর সহজ করার মাধ্যম একটি ধীর প্রক্রিয়া এবং খুবই ধৈর্যের ব্যাপার। তিনি বলেন, সার্কাডিয়ান ব্যবস্থা ধীর গতিতে পরিবর্তন হয়। আমার মতে, ঘুমানোর এবং জেগে ওঠার সময়, উভয় ক্ষেত্রে আধ-ঘণ্টা করে পরিবর্তন দিয়ে শুরু করা উচিত। কাঙ্ক্ষিত সময়ে ঘুমানো শুরু করতে না পারার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন আধ-ঘণ্টা করে সময় এগিয়ে আনার চেষ্টা করুন। আর সবশেষ সেই সময় ধরে রাখার চেষ্টা করুন।

কারণ, ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো হলে এবং সেটি নতুন করে পুনরায় ঠিক করার সুযোগ থাকলে, নিজের প্রতি সদয় হতে হবে। নিজস্ব ছন্দ খুঁজে পেতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। ঘুমের ক্ষেত্রে প্রধান বিষয় হচ্ছে, এটি কখনো অন-অফ সুইচ নয়। এই প্রক্রিয়ায় কাজ করে না ঘুমের এই ধরন ও ওঠা।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor