বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে ‘চায়না–শক’ কতটা সত্য

প্রকাশিত: ১০:০৬, ২০ আগস্ট ২০২৬ | ১৩

জনপরিসরের খুব কম বিষয়ই আছে, যেগুলো নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে একটি ধারণা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত।

প্রচলিত এ ধারণা হলো, একটি ক্ষমতাবান অভিজাত গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য উন্মুক্ত করেছিল। এর ফলেই বিপুলসংখ্যক উৎপাদনশিল্পের চাকরি চলে যায় এবং দেশটিতে শিল্পায়নের শক্তি কমে। ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—দুই দলের রাজনীতিবিদ, মূলধারার গণমাধ্যম, নানা মতের ভাষ্যকার এবং এমনকি অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও অনেকে এ ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেন। কিন্তু এ বর্ণনার সব অংশই সঠিক নয়।

২০০০ সালে চীনের সঙ্গে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বেড়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এর ফলে কি যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে বিপুলসংখ্যক চাকরি কমেছিল?

২০১৩ সালে অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটর, ডেভিড ডর্ন ও গর্ডন হ্যানসনের একটি গবেষণায় বলা হয়, চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে চাকরি কমার সম্পর্ক রয়েছে। তাঁদের হিসাবে, ১৯৯০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পে নিট ১৫ লাখ চাকরি কমেছিল। পরে ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও ব্রেন্ডান প্রাইসকে সঙ্গে নিয়ে করা গবেষণায় তাঁরা দেখান, চীনা আমদানির প্রতিযোগিতার কারণে ২০১১ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৪ লাখ চাকরি হারিয়ে থাকতে পারে।

তবে এ সংখ্যাগুলো বড় না ছোট, তা বুঝতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের স্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত একটি সাধারণ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি ছাড়তেন বা তাঁদের চাকরি শেষ হয়ে যেত। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২৫ হাজার ছিলেন উৎপাদনশিল্পের শ্রমিক। এটি ওই সময়ের বিশেষ কোনো ঘটনা ছিল না। গত পাঁচ বছরেও যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে চাকরি ছাড়ার বা হারানোর মাত্রা মোটামুটি একই রকম রয়েছে।

এ ছাড়া বাণিজ্য উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু আমদানির প্রতিযোগিতার দিকটি দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ১৯৮০, ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য এবং আরও ব্যাপকভাবে বিশ্বায়নের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্যও নতুন ও বড় সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, বাণিজ্য উন্মুক্ত হলে একটি দেশের মোট কর্মসংস্থানের ওপর এর প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। কারণ, আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে কোনো খাতে চাকরি কমলে রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠান ও খাতে নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ রবার্ট ফিনস্ট্রা ও তাঁর সহলেখকেরা বাণিজ্যের এই দুই দিকই হিসাব করার চেষ্টা করেছেন।

নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির চারপাশে দেয়াল তুলে দেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতিও ধীর করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতের দিকে ভয় নিয়ে নয়, আশাবাদ নিয়ে এগোতে হবে। অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উদারতাকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির বাধা হিসেবে দেখা ভুল। বাস্তবে এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।
২০১৯ সালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণাও চীন-ধাক্কার তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে সমর্থন করে। গবেষণায় বলা হয়, ১৯৯১ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে চীনা পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯ লাখ চাকরি কমেছিল। অন্যান্য দেশের পণ্যের আমদানি প্রতিযোগিতার কারণেও আরও চাকরি হারিয়েছিল। কিন্তু একই সময়ে রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে প্রায় সমপরিমাণ নতুন চাকরিও তৈরি হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্পের কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও বিবেচনা করা দরকার। ১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকে ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট পর্যন্ত মোট কর্মসংস্থানে উৎপাদনশিল্পের অংশ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় এ দীর্ঘমেয়াদি পতনের গতি বরং ধীর হয়েছিল।

অর্থাৎ উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতা চীন-ধাক্কার অনেক আগেই শুরু হয়েছিল এবং কয়েক দশক ধরে চলছিল। ২০০০ বা ২০০১ সালে উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থানের অংশে এমন কোনো স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়নি, যাকে বড় মোড় বলা যায়। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বরং এ ধারণাকে সমর্থন করে যে উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থান কমার প্রধান কারণ ছিল উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি, শুধু বাণিজ্য প্রতিযোগিতা নয়।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির তৃতীয় কাপ এসপ্রেসো কফি খাওয়ার সিদ্ধান্তের মতো সহজ বা একক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। এর পেছনে অনেক কারণ ও সিদ্ধান্ত কাজ করেছে।

হ্যাঁ, ২০০০ সালে চীনকে স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্কের মর্যাদা দেওয়া হয় এবং ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্য হয়। কিন্তু ১৯৮০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর চীনের স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্কের মর্যাদা নবায়ন করত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের আগের দুই দশকেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দ্রুত বেড়েছিল।

আমার হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিতে চীনা পণ্যের অংশ বাড়তে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে এই অংশ ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৯৩ সালে তা দ্বিগুণের বেশি হয়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়। ১৯৯৯ সালে ছিল ৮ শতাংশ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার পরও এ প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানিতে চীনা পণ্যের অংশ ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ২০০৭ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়।

তবে তথাকথিত চীন-ধাক্কা সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ভূমিকা যতটা বড় বলে মনে করা হয়, বাস্তবে তা অতটা ছিল না। ২০০০ সালের আগে প্রতিবছর চীনের বাণিজ্য মর্যাদা নবায়ন করতে হতো। স্থায়ী স্বাভাবিক বাণিজ্যসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ফলে সেই অনিশ্চয়তা দূর হয় এবং এতে চীনের রপ্তানি বাড়তে সাহায্য করে। কিন্তু চীনের রপ্তানি বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী সংস্কার। চীন নিজেই তার শুল্কহার কমিয়েছিল এবং অর্থনীতিতে নানা সংস্কার করেছিল। এসব পদক্ষেপও চীনের উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করার সিদ্ধান্ত কোনো রহস্যময় ক্ষমতাবান অভিজাত গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের রপ্তানি বেড়েছিল লাখোকোটি মানুষের বিকেন্দ্রীভূত ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফলে। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্রমেই চীনে তৈরি পণ্য কিনতে শুরু করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পরও সেই প্রবণতা চলতে থাকে।

তাই চীন-ধাক্কার ঘটনাকে এমন প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা ঠিক নয় যে বাণিজ্য উন্মুক্ত করা শ্রমজীবী মানুষের ক্ষতি করে। এটিও ঠিক নয় যে কোনো শক্তিশালী ও কূটকৌশলী অভিজাত গোষ্ঠী সচেতনভাবে এমন একক সিদ্ধান্ত নেয়, যার ক্ষতি হয় যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের।

২০০০-এর দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বরং অন্য শিক্ষা নেওয়া উচিত। প্রথমত, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা যতটা ভেবেছিলেন, এক খাত থেকে অন্য খাতে শ্রমিকদের স্থানান্তর বাস্তবে ততটা সহজ নয়। কোনো খাতে অর্থনৈতিক সুযোগ কমে গেলে সেই খাতের শ্রমিকদের নতুন ও সম্প্রসারণশীল খাতে চলে যাওয়া কঠিন। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সুযোগ কমে যাওয়া অঞ্চল থেকে মানুষ আগের তুলনায় কম স্থানান্তরিত হতে চান। এমনকি পুরো শ্রমবাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি করার মতো দ্রুতগতিতেও তাঁরা অন্যত্র যান না।

এ শিক্ষা ভবিষ্যতের নানা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সময়ে নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। প্রযুক্তির কারণে কোনো এলাকার অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেলে সেখানকার শ্রমিকদের অন্যত্র যেতে সরকারি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। নতুন চাকরিতে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে শ্রমিকদের আয় অনেক কমে গেলে তাঁদের জন্য বড় অঙ্কের আয়ের ভর্তুকির কথাও ভাবা যেতে পারে।

কিন্তু নীতিনির্ধারকদের অর্থনীতির চারপাশে দেয়াল তুলে দেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতিও ধীর করার চেষ্টা করা ঠিক হবে না। ভবিষ্যতের দিকে ভয় নিয়ে নয়, আশাবাদ নিয়ে এগোতে হবে। অর্থনৈতিক গতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উদারতাকে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির বাধা হিসেবে দেখা ভুল। বাস্তবে এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor