রাজ্যের ঘুম তিতিরের চোখে। ছোট্টমোট্ট তিতিরের ঘুমই ভাঙতে চায় না সকালে।
ইশকুলে যাবে কেমন করে? এদিকে তিতির গল্প শুনতে পছন্দ করে। তো, বাবা ঘুম ভাঙাতে গল্প বলতে থাকেন। কী গল্প? চলো শুনি—
সাগরমণি আর আলোমণি দুই বন্ধু। তারা থাকে সাগরে।
গভীর সাগরে সাঁতার কেটে বেড়াতেই তাদের আনন্দ। দুই বন্ধুর আবার পাড়া বেড়ানোর শখ। আজ এপাড়ায় তো কাল ওপাড়ায়। ঘুরতে ঘুরতে একদিন তারা হারিয়ে গেল সাগরতলের সবচেয়ে বড় বনটায়।
সেই বনে সারি সারি গাছ। কত কত প্রাণী! কত অলিগলি! এইটুকুন দুই বন্ধু তালগোল পাকিয়ে ফেলল। তারা বিশাল বনের গহিনে হারিয়ে গেল।
এদিকে সুয্যিমামা ডুবে গেল। সাগরতলে অন্ধকার নেমে এলো।
আলোমণি আলো জ্বেলে নিল। সাগরমণি সেই আলোতে দেখল, কে যেন তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতের পিঠ দিয়ে চোখ ডলে সাগরমণি চোখ বড় করে দেখল, তাইতো। সে জানতে চাইল, কে গো তুমি? কোত্থেকে এলে? আমাদের ধরে নিয়ে যাবে? নাকি খেয়ে ফেলবে?
তার মুখে এত্ত এত্ত প্রশ্ন শুনে সামনের জন বলল, আরে না না! আমি পরিমণি। জলের তলের পরি। তা, তোমরা কোথা থেকে এলে? এখানেই বা কী করছ?
আলোমণি বলে, আমাদের বাড়ি অনেক দূরে। বিচিত্রপুরে। আমরা এই বনে ঘুরতে এসে হারিয়ে গেছি। পরিমণি বলে, এতে মন খারাপের কী আছে? আমিও তো এই বনে এসেছি ঘুরতে। একদম একা। বড়দের ছাড়া। এখন তো আমিও হারিয়ে আছি!
আলোমণি অবাক হয়ে জানতে চায়, তোমার মা বকা দেন না? বাবা ধমক দেন না? আর কেমন করেই বা বাড়ি ফিরবে?
পরিমণি বলে, মোটেই না! তারা তো বেঁচেই নেই। আর বাড়ি ফিরব অ্যাবিম্যাপ ধরে।
সাগরমণি বলে, অ্যাবিম্যাপ? সে আবার কী?
পরিমণি বলে, সাগরতলে থাকো, অ্যাবিম্যাপ চেনো না? শোনো, সাগরতলের যেখানে আলো পৌঁছে না, সেখানেও যাওয়া যায় এই ম্যাপ ধরে।
দুই বন্ধু অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে চেয়ে থাকে।
আলোমণি বলে, আচ্ছা, তুমি কার কাছে থাকো?
পরিমণি বলে, ছোট ফুফু ইগলুতিয়ার কাছে। তিনিও আমার মতো ভবঘুরে। ঘুরতে ঘুরতে কই চলে যান তার ইয়ত্তা নেই। সে যাক গে, তোমাদের সঙ্গে কথা বলে বড্ড ভালো লেগেছে। আচ্ছা, তোমরা এখন বিচিত্রপুরে যেতে চাচ্ছ, তাইতো?
দুই বন্ধু মাথা নেড়ে বলল—হুম।
পরিমণি বলল, বাড়ির ঠিকানা বলো।
সাগরমণি আর আলোমণি বাড়ির ঠিকানা বলল, তারপর পরিমণি অ্যাবিম্যাপ দেখে তাদের বাড়ির পথ ধরল। যেতে যেতে রাত গড়িয়ে সকাল নেমে এলো। সাগরতলে সূর্যের আলো এলো। আলামণি তার আলো নিভিয়ে দিল। বাড়ির পথও ঘনিয়ে এলো। ওমা, তারা দিনের আলোতে দেখল, পরিমণির গায়ে কোনো রং নেই! আলোমণি বলেই ফেলল, কী গো পরিমণি, তোমার গায়ে রং নেই কেন?
পরিমণির মুখটা কালো হয়ে এলো। সে সাঁতারের গতি কমিয়ে দিল। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। সাগরমণি তার পাশে এসে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে পরিমণি বলল, মা-বাবা মরে যাওয়ার পর আমার গায়ের রংও চলে গেল। এরপর কোনো বন্ধুও হতো না আমার। আশপাশের সবাই আমাকে একরঙা বলে খেপাত। বড্ড দুঃখ আমার! তোমাদের দেখে ভালো লাগল। তাই বন্ধু মেনে নিয়ে এত দূর নিয়ে এলাম!
দুই বন্ধু বলল, ভালোই করেছ বন্ধু। চলো, আমাদের গ্রামপ্রধান রঙের জাদু জানে। তার কাছে গেলে সে জাদু দিয়ে তোমার গায়ে রং মাখিয়ে দেবে।
পরিমণির খুশি যেন আর ধরে না! সে বলল, তাহলে জলদি চলো।
তারা দ্রুত সাঁতার কেটে বিচিত্রপুরে চলে এলো।
গ্রামের সবাই রাত জেগে তাদের অপেক্ষায়। ছোট্ট সাগরমণি আর আলোমণিকে দেখে বড়রা আনন্দে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। তারা পরিমণিকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিল।
গ্রামপ্রধান সব শুনে পরিমণিকে রঙিন করে তুলল। এই দেখে সাগরমণি আর আলোমণি মুচকি হাসল। কী সুন্দর দেখাচ্ছে তাদের বন্ধুকে! এটাই তো চেয়েছিল তারা।
তবে গ্রামপ্রধান বলল, তোমাকে একটি ধাঁধার উত্তর দিতে হবে। তা না হলে তোমার রং ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।
পরিমণি বলল, কী ধাঁধা?
গ্রামপ্রধান বলল—
‘তোমাকে শুকিয়ে নিজেই সে ভিজে
উত্তরটা বলো দেখি
চেষ্টা করে নিজে?’
পরিমণির পেটে আসছে তো মুখে আসছে না। সে ভাবছে আর ভাবছে।
এমন সময় ঘুম থেকে জেগে ছোট্ট তিতির বলে, এটা তো ছাতা। মা ডেকে বলেন, তিতির, তোমার ইশকুলের সময় হয়ে গেছে। জলদি ওঠো মা। তিতির আড়মোড়া ভাঙে!
এদিকে গল্পের পরিমণির উত্তরটা আর জানা হলো না! এই উত্তরটা কি সেও জানে?
Publisher & Editor