শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই

প্রকাশিত: ০৬:৪৫, ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১১

লন্ডনে বসে আমি সম্প্রতি একটি নতুন নীতিমালা প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ শুরু করেছি। এতে আমার সঙ্গে আছেন গবেষক জেমা চেং’এর ডেং। 

আমাদের লক্ষ্য হলো পশ্চিমা দেশগুলো এবং ব্রিকস প্লাস নামে পরিচিত দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়ানো। ব্রিকস প্লাস বলতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আরও কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতিকে বোঝায়। আমরা বোঝাতে চাই যে সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার মতো বড় সমস্যাগুলো কোনো দেশ একা সমাধান করতে পারবে না।

কিন্তু এই কাজ করতে গিয়ে আমি একটি কথা বারবার শুনেছি। অনেকেই বলেন, পশ্চিম বা ব্রিকস প্লাস আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসল বিষয় হলো শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। তাদের মতে, এই দুই শক্তিধর দেশ যেদিকে যাবে, বাকিরা সেদিকেই অনুসরণ করবে।

এই ধারণা কি ঠিক? অর্থনীতির দিক থেকে দেখলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো, আর চীনের প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলার। জাপান, জার্মানি ও ভারতের অর্থনীতি চীনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে যদি একসঙ্গে ধরা হয়, তাহলে তাদের অর্থনীতিও বড় শক্তি হিসেবে দাঁড়ায়। এর আকার ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ২১ ট্রিলিয়ন ডলার।

বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি একাই বাকি জি-৭ দেশের সম্মিলিত অর্থনীতির চেয়েও বড়। অন্যদিকে চীনের অর্থনীতি বাকি ব্রিকস প্লাস দেশগুলোর সম্মিলিত আকারের প্রায় দ্বিগুণ। এই শতাব্দীতে বৈশ্বিক জিডিপি বৃদ্ধির অর্ধেকের বেশি এসেছে এই দুই দেশ থেকে। তাই তাদের অর্থনৈতিক নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রভাব সারা বিশ্বের ওপর পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়ে তারা যদি একমত হতে পারে, তাহলে তার প্রভাব সবার ওপর পড়ে।

আসলে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান কোনো এক বা দুই দেশের হাতে নেই। পৃথিবীর যেকোনো দেশ চাইলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য দরকার এমন ধারণা ও নেতৃত্ব, যা অন্য দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে এবং একসঙ্গে কাজ করতে রাজি করাতে পারে।
তবু এই সরল ধারণাটিকে জটিল করে তোলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমত, জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন আট শ কোটির বেশি মানুষ; আর এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলে এক-চতুর্থাংশের কম। ইউরোপের জনসংখ্যাও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। ব্রিকস প্লাসের অনেক দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটির বেশি। তাই শুধু দুটি দেশ দিয়ে পুরো বিশ্বকে বোঝা ঠিক নয়।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান জিডিপির হিসাব অনেকটাই নির্ভর করে ডলারের মূল্যের ওপর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলার তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী ছিল। কিন্তু যদি ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়, তাহলে চীনের অর্থনীতির আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একইভাবে ভারতের অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার হয় এবং ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যা তাকে বিশ্বের দশটি বড় অর্থনীতির একটি করে তোলে।

অন্যভাবে বললে, যদি ডলারের মূল্য ৩০ শতাংশ কমে যেত এবং অন্য সবকিছু একই থাকত, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য অনেক কম চোখে পড়ত। তখন চীনের অর্থনীতি প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে যেত এবং ব্রিকস প্লাসের অন্য দেশগুলোর তুলনায় চীনের ব্যবধানও এত বড় থাকত না। ভারতের অর্থনীতি ইতিমধ্যে এই দশকে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জনসংখ্যা কাঠামো এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে এই ধারা সামনে আরও চলবে।

এই বিশাল অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। জলবায়ু পরিবর্তন বা মহামারি প্রতিরোধের মতো বৈশ্বিক সমস্যা কি ভারতের মতো ১৪০ কোটি মানুষের দেশকে বাদ দিয়ে সমাধান করা সম্ভব? একইভাবে ইউরোপ এবং অন্যান্য বড় জনসংখ্যার দেশগুলোকেও বাদ দেওয়া যাবে না।

তৃতীয় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বলেন, চীনের শক্তি না থাকলে ব্রিকস টিকত না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই জোট শুধু টিকে থাকেনি, বরং একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জোটকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার ধারণা প্রথমে ব্রাজিল ও রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেই এসেছে। অর্থাৎ চীন একাই সবকিছু ঠিক করে—এমন ধারণা সঠিক নয়।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেইওয়াই ট্যাং এবং ব্রায়ান ওং ইউয়ে শান তাদের একটি নতুন বইয়ে দেখিয়েছেন যে ব্রিকস প্লাসের প্রতিটি দেশের নিজস্ব জটিল উদ্দেশ্য আছে। চীন, ভারত বা অন্য দেশগুলোর ভূমিকা সব সময় সহজভাবে বোঝা যায় না। যেমন পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক সাফল্য ও নেতৃত্বের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তেমনি ব্রিকস প্লাসের দেশগুলোরও সেই সুযোগ আছে।

পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এখান থেকে একটি বড় শিক্ষা আছে। তাদের ব্রিকস প্লাসের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে ভাবতে হবে। বিশেষ করে ইউরোপকে নিজেদের অর্থনীতিতে স্থায়ী সংস্কার আনতে হবে এবং এমন বৈশ্বিক উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ব্রিকস প্লাসসহ অন্য দেশগুলো অংশ নিতে আগ্রহী হয়।

আমি নিজে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। তখন দেখেছি, একটি দেশ চাইলে তার অর্থনৈতিক শক্তির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাজ্য তখন বৈশ্বিক একটি সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছিল এবং বিশ্বকে সচেতন করেছিল।

আসলে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান কোনো এক বা দুই দেশের হাতে নেই। পৃথিবীর যেকোনো দেশ চাইলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্য দরকার এমন ধারণা ও নেতৃত্ব, যা অন্য দেশগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে এবং একসঙ্গে কাজ করতে রাজি করাতে পারে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor