বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

মন ভালো রাখতে কোথায় যাবেন—পাহাড় না সমুদ্র?

প্রকাশিত: ০৭:৫৫, ২২ জুলাই ২০২৬ |

তখনো পুরোপুরি ভোর হয়নি। আকাশের গায়ে কালচে নীল অন্ধকারের শেষ ছায়া লেগে আছে।

ঠান্ডা বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে ইশা। সামনে গভীর উপত্যকা, মেঘের পাতলা চাদরে ঢাকা এক জগৎ। হঠাৎ দূরের দিগন্ত থেকে ফুটে এলো হালকা হলুদ আভা। এক মুহূর্তে কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফঢাকা চূড়ায় সূর্যের প্রথম সোনালি আলো এসে পড়ল।

যেন কেউ এক মুঠো গলিত সোনা ছিটিয়ে দিল পাহাড়ের গায়ে।
ইশার শরীর হালকা করে কেঁপে ওঠে। এ যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি। মনে হয় শহরের ধোঁয়া, ক্লান্তি, ব্যস্ততার বিষ; সব একসঙ্গে ধুয়ে মুছে বিলীন হয়ে গেছে।

বুক ভরে নিশ্বাস নিতেই মনে হয়, এই প্রথম সত্যি সত্যি শ্বাস নিচ্ছে সে। এই পূর্ণতা আর এই শূন্যতা—দুটো একসঙ্গে অনুভব করার অভিজ্ঞতা পৃথিবীর খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। এ এক বিশাল অনুভূতি, পাহাড় যেন মানুষকে নিজের ভেতরের মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ভ্রমণপ্রেমীদের আদিম প্রশ্ন—সমুদ্র না পাহাড়? 

সমুদ্র আমাদের উচ্ছ্বসিত করে, দৌড়াতে শেখায়। কিন্তু পাহাড় থামতে শেখায়।

নিজেকে শুনতে শেখায়। আর এই ক্লান্ত সময়ে মানুষ আসলে কী খোঁজে? শান্তি।
মানুষ পাহাড়ে যায় আসলে দুই কারণে। কেউ যায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে, আবার কেউ যায় নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমরা সবাই দুটোই চাই।

আমরা অভ্যস্ত শহরের শব্দে। যেমন ধরুন-হর্ন, ট্রাফিক, নির্মাণের শব্দ ফোনের অবিরাম নোটিফিকেশন। পাহাড়ে দাঁড়ালে এসব শব্দ একসঙ্গে হারিয়ে যায়। তার বদলে শোনা যায় ঝিঁঝি পোকার ডাক, দূরের ঝরনার শব্দ, বাতাসের ফিসফিসানিসহ আরো কত কি। এই নীরবতা আসলে নীরব নয়, এটা এক ধরনের মানসিক থেরাপি।

পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়, নিজেকে খুব ছোট লাগে। কিন্তু এই ছোট হওয়া কোনো অপমান নয়, এটা স্বাধীনতা। যে সমস্যাগুলো এতদিন বুকের ভেতর পাহাড় হয়ে ছিল—ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, টাকার চিন্তা। এই বিশাল পাহাড়ের সামনে সেগুলো হঠাৎ খুব তুচ্ছ মনে হয়। যেন ধুলোর মতো উড়ে যায়।

পাহাড় সহজ কিছু নয়। দীর্ঘ হাঁটা, ক্লান্তি, হাঁপ ধরা—সবই আছে তার কাছে। কিন্তু সেই কষ্টের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের আনন্দ। যখন চূড়ায় পৌঁছাবেন, মেঘের ওপরে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাবেন, সেই মুহূর্তের সুখ কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টের আরামেও পাওয়া যায় না। কারণ এটা অর্জনের আনন্দ। নিজের সীমা পেরোনোর আনন্দ।

পাহাড়ে গেলে কী করবেন?

কয়েক ঘণ্টার জন্য ফোনটা দূরে রাখুন। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে নয়, নিজের চোখ দিয়ে দেখুন। পাথরের রুক্ষতা ছুঁয়ে দেখুন। বাতাসের গন্ধ নিন, পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের সহজ জীবন আপনাকে নিজের জটিল জীবন নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে। কোনো এক ঢালে চুপচাপ বসে থাকুন কিছুক্ষণ। কিছু না ভেবে শুধু তাকিয়ে থাকুন দূরে। দেখবেন, নিজের সঙ্গে কথা বলা শুরু হয়ে গেছে।

সমুদ্র ঢেউ দিয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরে। পাহাড় আপনাকে আশ্রয় দেয়। জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে নতুন করে শুরু করতে চাইলে—পাহাড়ের মতো সঙ্গী খুব কমই আছে।

যদি কখনো মনে হয় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন, ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। পাহাড়ের কোনো নাম না জানা বাঁকে হয়তো আপনার পুরোনো হাসিটাই অপেক্ষা করছে।

পাহাড়ের ডাক একবার যে শুনেছে—সে জানে, সেই ডাক উপেক্ষা করা যায় না। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন হারিয়ে যাওয়া আপনার হাসির শব্দ? শুনলেই বেরিয়ে পড়ুন। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor