শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

৪৫ বছর পর যেভাবে ধরা পড়লেন জিয়াউর রহমান হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত মোজাফফর

প্রকাশিত: ০১:৪৪, ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১৫

পরিচয় গোপন করে প্রায় ৪৫ বছর ধরে আত্মগোপনে ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে তিনি গ্রেফতার হন।

মোজাফফর হোসেন ছিলেন খুবই ধূর্ত। তবে শেষ পর্যন্ত ডিবির চৌকশ টিমের কাছে হার মানে তার সব চালাকি। নিখুঁত ও পেশাদার অপারেশন ছকে একপর্যায়ে বৃত্তবন্দি হয়ে পড়েন তিনি। ডিবির কাছে তথ্য ছিল-বনানীর ডিওএইচএসের একটি বাসায় থাকেন এই মোজাফফর। তার নাকের নিচে আছে একটি বড় তিল। মেয়ে এয়ারটেল অফিসে চাকরি করেন। জাস্ট এই দুটি ক্লু। এটিকে সামনে রেখে মাসের পর মাস মোজাফফরকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে ডিবির চৌকশ টিম। 

অতঃপর বুধবার রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গভীর রাতে দরজা নক করতেই সামনে আসেন বয়োবৃদ্ধ এক ব্যক্তি। নাম জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি মোজাফফর’। এবার গোয়েন্দা চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার নাকের নিচে ধরা পড়ে সেই কালো তিল। কালবিলম্ব না করে হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয় ডিবি। এভাবেই এক বড় মাফিয়ার ফেরারি জীবনের অবসান ঘটে। ইতোমধ্যে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে সেনাসদরে হস্তান্তর করা হয়েছে। 

এতদিন পর কীভাবে ধরা পড়ল ইতিহাসের এই খলনায়ক, জানতে চাইলে অভিযানে থাকা ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে অপরাধীরা কত ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এই মোজাফফর। নিজের অবয়ব, চালচলন, এমনকি পেশা ও বাসস্থান পরিবর্তন করে সে দীর্ঘদিন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। এ কারণে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু ছিল না। তবে অপরাধ যতই নিখুঁত হোক না কেন, অপরাধীর কোনো না কোনো চিহ্ন বা সূত্র থেকেই যায়। এটাই নির্মম নিয়তি। আর সেই সূত্র ধরেই এত বছর পর তাকে ডিবি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। 

গ্রেফতারের সূত্র জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ডিবির বিশ্বস্ত টিম জানতে পারে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তার মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা একটি সম্ভাব্য বাড়ির ঠিকানা চিহ্নিত করেন। বাড়িটি চিহ্নিত করার পর ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে দূর থেকে লক্ষ্য রাখেন এবং ছদ্মবেশে সার্বিক পরিবেশ ও মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ক্লু আগে থেকেই নথিবদ্ধ ছিল। তার নাকের ঠিক নিচে একটি আঁচিল বা তিল সদৃশ কালো দাগ রয়েছে। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না। অভিযানে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই চিহ্নটিকে তাদের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসাবে নির্ধারণ করেন।

বুধবার গভীর রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। করা হয় অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা। গোয়েন্দা দল ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে দরজা খোলার পর অত্যন্ত নাটকীয় ও সুকৌশলে এগোয় পুরো প্রক্রিয়া। দরজা খেলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেফতারবিষয়ক কোনো ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। মেয়ের নাম ধরে জানতে চান অমুক (তার মেয়ে, যিনি এয়ারটেলে কাজ করেন) বাসায় আছেন কিনা। এ সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন। 

তবে এত রাতে অফিসের লোক বাসায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই ঘরের ভেতর থেকে কৌতূহল ও কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়। এজন্য বাসার ভেতর থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে এগিয়ে এসে জানতে চান, ‘এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়। গোয়েন্দারা তখন কৌশলগতভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন। বাড়ির অল্প আলোতেও কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত তিল বা আঁচিলটি। এ সময় কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে এবং কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা’। মুখ থেকে একথা শোনার পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি ডিবির চৌকশ দল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে বের হয়ে আসে হ্যান্ডকাফ। অতঃপর মোজাফফরের দুই হাত বন্দি হয়ে যায় ডিবির শিকলে। চোখের পলকে দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশী ও সুচতুর পলাতক আসামির হাতজোড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আইনের খাঁচায়। এরপর হতভম্ব চাহনি আর অপ্রস্তুত আত্মসমর্পণ বুঝিয়ে দেয়, ডিবির এই নিখুঁত অপারেশন কতটা নিঁখুত ও পরিপক্ব ছিল। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor