বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় এবার মুখোমুখি দুই বিপরীত মহাদেশের দুই দল। ইউরোপের শৃঙ্খলাবদ্ধ সুইজারল্যান্ড এবং লাতিন আমেরিকার প্রাণবন্ত কলম্বিয়া। এক দলের স্বপ্ন প্রথমবারের মতো আরও দূরে যাওয়ার, অন্য দলের লক্ষ্য হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনা।
বাংলাদেশ সময় বুধবার রাত ২টায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বিখ্যাত বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে গড়াবে শেষ ষোলোর এই মহারণ। প্রায় ৫৪ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার আধুনিক এই স্টেডিয়াম বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক ফুটবল ভেন্যু। বিশাল রিট্র্যাকটেবল ছাদ, দুর্দান্ত আলোকসজ্জা এবং সমুদ্রঘেরা ভ্যাঙ্কুভারের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বিশ্বকাপের লড়াইকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।
ভুলের কোনো সুযোগ নেই, একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের ইতিহাস। বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ড কখনো শিরোপা জিততে না পারলেও চারবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে। সেমিফাইনালের দরজা এখনো খোলা হয়নি। অন্যদিকে কলম্বিয়ার সেরা সাফল্য ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। জেমস রদ্রিগেজের জাদুকরী পারফরম্যান্স এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
এবার সেই ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে লস কফেতেরোস। দুই দল এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাত্র তিনবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়ার একটি করে জয় এবং একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। সর্বশেষ প্রীতি ম্যাচে কলম্বিয়া জয় পেয়েছে।
চলতি বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ড নিজেদের পরিচিত ছন্দেই এগিয়েছে। গ্রুপ পর্বে শক্ত রক্ষণ, দ্রুত আক্রমণ আর সংগঠিত ফুটবল খেলেই নকআউটে এসেছে তারা। প্রতিটি ম্যাচে পরিকল্পিত ফুটবল খেলেছে সুইসরা। রাউন্ড অব ৩২-এ আলজেরিয়াকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে দলের। চার ম্যাচে খুব কম গোল হজম করে তারা প্রমাণ করেছে, এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ।
কলম্বিয়ার যাত্রা ছিল আরও বর্ণিল। গ্রুপ পর্বে দারুণ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে তারা সমর্থকদের মন জয় করেছে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, উইং দিয়ে দ্রুত আক্রমণ এবং সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা তাদের অন্যতম শক্তি। শেষ বত্রিশে ঘানাকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস নিয়ে শেষ ষোলোয় এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিরা।
সুইজারল্যান্ডের ভরসা অধিনায়ক গ্রানিত জাকা। মাঝমাঠে তার নেতৃত্ব, বল বণ্টন এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরো দলকে ছন্দে রাখে। ব্রিল এমবোলোর শক্তি ও গতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। ড্যান এনডোয়ে ও রুবিন ভার্গাস দুই প্রান্তে অপ্রতিরোধ্য। রক্ষণে মানুয়েল আকাঞ্জি এবং গোলবারের নিচে ইয়ান সোমার দলের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার নাম।
কলম্বিয়ার আক্রমণের প্রাণ লুইস দিয়াস। তার ড্রিবলিং, গতি এবং একক দক্ষতা যেকোনো রক্ষণ ভেঙে দিতে পারে। জেমস রদ্রিগেজ অভিজ্ঞতা দিয়ে এখনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। জন আরিয়াস, রিচার্ড রিওস ও জেফারসন লেরমা মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রন এনে দিচ্ছেন। রক্ষণে দাভিনসন সানচেজ এবং গোলকিপার ক্যামিলো ভার্গাস দলকে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছেন।
সুইজারল্যান্ড শিবিরে আত্মবিশ্বাসের সুর। কোচ বলেছেন,’কলম্বিয়া দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক দল। আমরা নিজেদের পরিকল্পনা থেকে একচুলও সরব না। ধৈর্যই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।’
কলম্বিয়ার কোচের কণ্ঠেও দৃঢ় প্রত্যয়, ‘নকআউটে সুন্দর ফুটবল যথেষ্ট নয়, ফল আনতে হয়। আমরা জানি সুইজারল্যান্ড কতটা সংগঠিত দল। আমরা নিজেদের ফুটবল খেলতে চাই।’
কৌশলগতভাবে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় লড়াই হবে মাঝমাঠে। সুইজারল্যান্ড চাইবে ম্যাচের গতি কমিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। অন্যদিকে কলম্বিয়া দ্রুত উইং ব্যবহার করে লুইস দিয়াসের গতিকে কাজে লাগাতে চাইবে। জাকার ঠান্ডা মাথার পাসিংয়ের বিপরীতে থাকবে জেমস রদ্রিগেজের সৃজনশীলতা। এমবোলোর শক্তির বিপরীতে দাভিনসন সানচেজের রক্ষণ ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
ভ্যাঙ্কুভারের রাত হয়তো মনে রাখবে এমবোলোর কোনো দুরন্ত গোল। লুইস দিয়াসের একক নৈপুণ্যে উল্লাসে ফেটে পড়বে কলম্বিয়ান সমর্থকেরা। শেষ বাঁশি বাজার পর একটি দল এগিয়ে যাবে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে, অন্য দলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন থেমে যাবে।ভ্যাঙ্কুভারের আকাশে শেষ পর্যন্ত উড়বে কি আল্পসের লাল-সাদা পতাকা, নাকি আন্দিজ পর্বতের হলুদ-নীল-লাল রঙে রাঙাবে নতুন ইতিহাস?
Publisher & Editor