মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

হাইড্রেশন বিরতিতেই কি ভেঙে গেল আরব দলগুলোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন?

প্রকাশিত: ০২:৫১, ০৭ জুলাই ২০২৬ |

ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে ম্যাচের গতি বা মোমেন্টাম অনেক সময় ফল নির্ধারণ করে দেয়। কোনো দলই সাধারণত ৯০ মিনিট পুরোপুরি আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না। তাই যে সময় একটি দল প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে গোল করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি (পানি পানের বিরতি) নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এই বিরতিগুলো ম্যাচের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করেছে এবং বিশেষ করে তুলনামূলক দুর্বল ও আরব দলগুলোর ভালো পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা ঘোষণা দেয়, প্রচণ্ড গরম থেকে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার জন্য টুর্নামেন্টের সব ১০৪টি ম্যাচেই প্রথমার্ধের ২২তম এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭তম মিনিটে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি থাকবে। এমনকি আটলান্টা, ডালাস, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও ভ্যাঙ্কুভারের মতো ইনডোর স্টেডিয়ামেও এই নিয়ম কার্যকর করা হয়।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিরতির উদ্দেশ্য ছিল খেলোয়াড়দের পানি পান ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া, বাস্তবে কোচরা এই সময়টিকে কৌশল বদল, খেলোয়াড়দের নতুন নির্দেশনা দেওয়া এবং ম্যাচের গতি নিজেদের পক্ষে ফেরানোর সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি হাইড্রেশন বিরতিতে দেখা গেছে, খেলোয়াড়রা শুধু পানি পানই করেননি, কোচদের কাছ থেকে বিস্তারিত কৌশলগত নির্দেশনাও নিয়েছেন। ফলে বিরতির পর অনেক ম্যাচেই শক্তিশালী দলগুলো নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

এর একটি উদাহরণ কুরাসাও ও জার্মানির ম্যাচ। কুরাসাও অপ্রত্যাশিতভাবে সমতা ফেরানোর পরপরই হাইড্রেশন বিরতি আসে। বিরতির পর জার্মানি দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই আরও দুটি গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

আরব দলগুলোর ক্ষতি?

অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই হাইড্রেশন বিরতির সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে কয়েকটি আরব দলকে।

দ্য টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন বিরতির পরই ম্যাচের সবচেয়ে বড় মোমেন্টাম পরিবর্তন ঘটে। বিরতির পর উরুগুয়ে ৮০তম মিনিটে সমতা ফেরায়। সৌদি আরব যদি ১-০ ব্যবধান ধরে রাখতে পারত, তাহলে নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পুনরায় মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেতে পারত।

বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া জর্ডানও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তারা দ্বিতীয়ার্ধের বিরতির আগ পর্যন্ত সমতায় ছিল। তবে বিরতির পর ম্যাচের চিত্র বদলে যায় এবং ঐতিহাসিক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা হাতছাড়া হয়।

অন্যদিকে ব্রাজিলের বিপক্ষে মরক্কোও প্রথমার্ধে দারুণ খেলছিল। কিন্তু হাইড্রেশন বিরতির পর ব্রাজিল নিজেদের কৌশল পুনর্গঠন করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সমতা ফেরায়। শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়।

দর্শকদের বিরক্তি

প্রতিটি ম্যাচে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি দর্শকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করেছে। ম্যাচের মাঝপথে রেফারির বাঁশি বাজিয়ে খেলা থামানোর সময় অনেক স্টেডিয়ামেই দর্শকদের দুয়োধ্বনি শোনা গেছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, অতিরিক্ত গরমের অজুহাতে ফিফা মূলত সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। যদিও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দাবি করেছেন, হাইড্রেশন বিরতি থেকে সংস্থাটি এক ডলারও আয় করে না।

তবে সেই দাবিকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিরতিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Hydration Break brought to you by Powerade’ নামে স্পন্সর করা হয়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে এই বিরতিগুলো আরও বড় বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

টুখেলের আপত্তি

ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলও এই নিয়ম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি বলেন, এই বিরতি ফুটবলের স্বাভাবিক চরিত্রই বদলে দিচ্ছে।   

তার ভাষায়, এটি ম্যাচকে কার্যত চারটি আলাদা ভাগে ভাগ করে দেয়। আমি যতটা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও বেশি এটি ম্যাচের চরিত্র বদলে দেয়।

কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচেও হাইড্রেশন বিরতির পর ইংল্যান্ডের খেলায় স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায়। বিরতির আগে ইংল্যান্ড প্রতিপক্ষের বক্সে কোনো উল্লেখযোগ্য আক্রমণই গড়তে পারেনি। কিন্তু বিরতির পর একের পর এক সুযোগ তৈরি করে ম্যাচে ফিরে আসে।

দ্বিতীয় হাইড্রেশন বিরতির পর টুখেল মিডফিল্ডার ডেকলান রাইসকে রাইট-ব্যাকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই পরিবর্তনের সুফলও দ্রুত মেলে। হ্যারি কেন ৭৫ ও ৮৬ মিনিটে দুটি গোল করে ইংল্যান্ডকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেন।

ম্যাচ শেষে অবশ্য টুখেলের বক্তব্য ছিল কিছুটা সংযত। তিনি বলেন, বিরতিগুলো আমি যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। তবে সত্যি বলতে, আমি এগুলো খুব একটা পছন্দ করি না।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor