বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

মোরগছানার আশ্চর্য ভ্রমণ

প্রকাশিত: ০৬:৪৫, ০৪ মার্চ ২০২৬ |

আমি আছি! কোথায় আছি? জানি না। গুটিসুটি মেরে বসে থাকব? মোটেই না!

ঘিরে থাকা জিনিসটা গোলগাল। অনেক আঁধার। আঁধার পাড়ি দিতে হবে।

ভাঙতে হবে আড়মোড়া।
ডানা আর পা ছড়াতেই মটমট মটর মট। বড় হলো ফাটল। আলো! অনেক কিছু দেখছি।

সুপারিগাছ, লাউয়ের মাচা, উঠানে শুকাতে দেওয়া লাল মরিচ, মায়ের মুখ! এক পা দু পা করে খোসা ছেড়ে বাইরে আমি।
কী বিশাল দুনিয়া! আরো গোটা কতক ডিম। ভাবছি, খোসা ছেড়ে বেরিয়ে এসে কী অবাকই না হবে ওরা!

ওটা কী? মা বলল, আকাশ। পৃথিবীটা তবে আরেকটা ডিম? আকাশ সেটার খোসা? ওই যে দূরে! নীল খোসাটা নেমে এসেছে নিচে।

এবার তবে ওটা ভেঙে বের হতে হবে।
একদিন ছুটে গেলাম দূরের নীলচে খোসার কাছে। ধরা দেয় না। কে যেন বলল, ওটা দিগন্ত। ধরা যায় না।

বললেই হলো!

খবরে দেখলাম মানুষ যাবে মহাকাশে। আমিও যাব!

আবেদন করেছি মহাকাশ অফিসে। আমাকে নিয়ে গেল খুব আদর করে। আমার জন্য স্যুট আর হেলমেটও বানিয়েছে।

রকেট ছাড়বে একটু পর। একটুও ভয় লাগছে না। খোসা আজ ভেঙেই ছাড়ব।

৩...২...১...। উঠছি তো উঠছি। পাখি, মেঘ, বিমান, স্যাটেলাইট—সবাইকে ছাড়িয়ে গেলাম। ওমা! আকাশটা তো খোসা নয়। সব ফাঁকা!

থামল রকেট। আসলে থামেনি। ছুটে চলেছি নাকি চলছি না, বুঝতেই পারছি না। মহাকাশ এমনই। ওজন নেই। শূন্যে ভাসছি। সোজা নাকি উল্টো, বুঝতে পারছি না। মহাশূন্য মজার তো!

কানে এলো নভোচারীদের কথা। রকেট থেকে নামতে হবে। এ কেমন কথা!

আমি নামব না! আরো দূরে যাব। দূরে নিশ্চয়ই মস্ত খোসা আছে। ভেঙে বের হতেই হবে।

শূন্যে ভাসছে একটা ছোট ঘর। মানুষগুলো টুপটাপ নেমে গেল। আমাকেও নিতে চাইল। আমি কি কম চালাক! মানুষগুলো নামতেই রকেটের দরজা আটকে দিলাম।

ভাগ্যিস রকেট দাদু আমার কথা বোঝে। বললাম, জলদি চলো। অনেক দূরে যেতে হবে।

মানুষগুলো অবাক। তারা জীবনেও একটা মোরগছানাকে রকেট চালাতে দেখেনি।

‘রকেট দাদু, আরো জোরে ছুটতে হবে।’

‘এর চেয়ে জোরে তো যেতে পারি না। প্রকৃতির বারণ আছে।’

‘প্রকৃতি আবার কে? তাকে বলো আমার তাড়া আছে। তা না হলে ডিমের খোসা কখনোই ছুঁতে পারব না।’

‘আমি যে আলো নই। আলোর মতো ছুটতে পারলে সময়টা থমকে যেত। তখন যত দূর খুশি যেতে পারতাম।’

‘মানি না! বহুদূর যেতে হবে। এত এত খালি জায়গা ভালো লাগে না।’

‘খালি জায়গাটা চাদরের মতো, বুঝলে। খালি, তবে শূন্য নয়।’

‘কুক্কুরুক্কু! একটা বুদ্ধি এসেছে রকেট দাদু!’

‘বলো! বলো!’

‘বুদ্ধি খাটিয়ে চাদরটাকে ভাঁজ করে দাও! তোমার এআই অনেক চালাক। নিশ্চয়ই পারবে।’

‘মন্দ বলোনি। দেখি তো...।’

সাঁইসাঁই টুপ।

চোখের পলকে চলে গেলাম কোটি কোটি মাইল। সৌরজগত্টা হয়ে গেল দূরের ছোট্ট খেলনা। সূর্যটাকে ঘিরে মার্বেলের মতো ঘুরছে ইউরেনাস নেপচুনরা।

যেতে যেতে সৌরজগৎ হয়ে গেল গমের দানা।

এবার নাই হয়ে গেল।

যেতে যেতে এক পেল্লায় চাকতি।

‘ওহে মোরগছানা, ওটা আমাদের গ্যালাক্সি। আকাশগঙ্গা নাম।’

‘এত ছোট! সামনে যে বহু পথ। খোসাটা কোথায় শেষ হয়েছে?’

‘জানিনে বাপু। চাদর ভাঁজ করে যেতে থাকি।’

‘জলদি চলো! আরো জলদি!’

খালি জায়গাগুলোকে চাদর বানিয়ে টুপুরটাপুর লাফিয়ে চলল রকেট।

অনেকগুলো চাকতি। কেউ হাতে হাত ধরে চেইনের মতো, কেউ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে।

‘বাহ্, কত গ্যালাক্সি! রকেট দাদু, ওইখানে কী হচ্ছে?’

‘দুটি গ্যালাক্সির ঝগড়া বেধেছে। একটু পর মিলেমিশে এক হবে।’

‘সামনে কালো গর্ত!’

‘ওটা ব্ল্যাকহোল। কাছে ঘেঁষা যাবে না। সবাইকে আটকে রাখতে চায়। আলোকেও বের হতে দেয় না।’

ব্ল্যাকহোলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো সব আটকে আটকে যাচ্ছে। আমার গা গুলিয়ে উঠল। গমগম করে ওটা বলল, ‘মোরগছানা, আমার পাড়ায় বেড়াতে এসো।’

আমি না শোনার ভান করলাম।

দুটি তারা হাত ধরাধরি করে নাচছে।

‘ওরা বাইনারি স্টার। নাচতে নাচতে একসময় দুটি মিশে যাবে।’

রকেট দাদু সব জানে!

চললাম ছুটে। পথে ইয়া বড় গোলগাল এক দৈত্য। তারার সমান। চোখ বড় বড় করে চাইল। কিছু বলল না। এমন দৈত্যের জন্য কি আর গ্রহ লাগে! সে নিজেই তো এক কোটি পৃথিবীর সমান।

বহুদূরে ছেড়ে আসা গুচ্ছ গ্যালাক্সিগুলোকে মনে হলো মাকড়সার জালের মধ্যে থোকায় থোকায় আটকে আছে। মালার মতো সুতায় গাঁথা। মহাবিশ্বে কেউ বসে বসে নির্ঘাত জাল বুনেছে!

রকেট দাদু বলল, গ্যালাক্সিগুলো এভাবে দল বেঁধে থাকে অদৃশ্য শক্তির কারণে।

এত কিছুতে মন নেই। আগে খোসা ভেঙে বের হওয়া চাই!

দেখতে দেখতে কিনারায়। সামনে একরাশ আঁধার। হাত বাড়ালেই খোসা পাব?

‘রকেট দাদু, বের হওয়া যাক।’

‘শোনো, মোরগছানা। এই যে খালি জায়গা, সেটাই ছুটে চলছে। বেলুনের মতো। শোঁ শোঁ করে ফুলছে মহাবিশ্ব। আর এগোতে পারব না। রাস্তাই যদি না থাকে, তাহলে গাড়ি চলবে কিসের ওপর।’

‘মহাবিশ্ব কিসের মধ্যে ফুলছে? কী আছে ওপারে?’

‘এপারে মহাবিশ্ব। ওপারে নাইবিশ্ব।’

‘মানি না। রকেট দাদু, চাদরের সব দিক ধরে টান দাও। ভাঁজ করে দলা পাকিয়ে দাও। তর সইছে না। খোসাটা ছাড়াতেই হবে।’

এরপর আশপাশের শূন্য জায়গাটা এঁকেবেঁকে ঘিরে ফেলতে লাগল আমাদের। একরাশ আঁধারে ঝুপ করে হারিয়ে গেলাম।

বনবন ভনভন। মটমট মটর মট।

খোসা ভাঙছে! কুরুক্কু করে উঠলাম খুশিতে। সামনে একরাশ আলো। চোখ ধাঁধিয়ে গেল।

হাওয়ায় দুলছে অচেনা গাছের ডাল। নিরিবিলি চারপাশ। দূরে বিশাল পাহাড়। স্রোতের শব্দ বহুদূর থেকেও শুনছি। সামনে এসে দাঁড়াল মানুষের ছানার মতো কিম্ভূত এক প্রাণী। আমাকে দেখে কী যে খুশি সে!

‘মা! দেখো একটা ডিম ফুটেছে!’

ছানাটার মা এসে উঁকি দিল। আমাকে ঘুরেফিরে দেখল, যেন বহুকাল পর কেউ ডিমের খোসা ভেঙে বেরিয়েছে।

এদিক-ওদিক তাকালাম। পাশে সারি করে রাখা শয়ে শয়ে ডিম। সেগুলোর ভেতরে ছোট সাদা দানা। দেখেই চিনে ফেললাম। গ্যালাক্সি! একেকটা মহাবিশ্ব! ভাবছি, ডিম ফেটে বেরিয়ে এসে বাকিরা কী অবাকই না হবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor