অনেক বছর আগের এক সাক্ষাৎকারে মান্নাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কতদিন বাঁচতে চান? উত্তরে স্মিত হেসে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেছিলেন, ‘বাঁচার অনেএএএক ইচ্ছা, তবে ভাগ্যে কী আছে জানি না; আরও অনেকদিন বাঁচতে চাই।’ এই সাক্ষাৎকারটির ঠিক কয়েক বছর পর; ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি। আজ তার ১৮তম প্রয়াণ দিবস।
২০০৮ সালের সেই দিনটিতে মান্নার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে এক ভারী শোক নেমে আসে। বিশেষ করে ঢাকার রাজপথ পরিণত হয়েছিল রণক্ষেত্রে। প্রিয় নায়কের শেষ বিদায়ে রাস্তায় নেমেছিল লাখো মানুষের ঢল। এফডিসি থেকে যখন মান্নার মরদেহবাহী গাড়িটি বের হচ্ছিল, তখন উত্তেজিত জনতাকে সামলাতে পুলিশকে টিয়ারশেল পর্যন্ত নিক্ষেপ করতে হয়। দেশের ইতিহাসে কোনো তারকার মৃত্যুতে এমন গণবিস্ফোরণ ছিল নজিরবিহীন। ঠিক কতটা আপন হলে মানুষ সব বাধা উপেক্ষা করে প্রিয় নায়ককে একবার দেখতে চায়, মান্নার বিদায়বেলায় সেটিই প্রমাণ করেছিল।
আজ থেকে ১৮ বছর আগে বর্তমানের মতো ইন্টারনেটের প্রসার বা সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট ছিল না। শুধু টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রিয় নায়কের চলে যাওয়ার খবর। আট থেকে আশি- সব শ্রেণির মানুষের কাছে মান্না ছিলেন নিজের কেউ। বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যখন তার অভিনীত ‘মনের সাথে যুদ্ধ’ সিনেমার ‘আসবার কালে আসলাম একা’ গানটি বাজানো হচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষের হৃদয় যেন আরও বেশি হাহাকার করে উঠেছিল। গানটি মান্নার নিজেরও খুব পছন্দের ছিল।
মান্না অনেকদিন বাঁচতে চাইতেন। ভক্তরাও তাকে অমর করে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি দেখিয়েছে অন্য কিছু। জীবনাবসানে অসংখ্য কালজয়ী সিনেমার রূপকার এই নায়ক। আম্মাজানের সেই বাদশা হোক কিংবা দাঙ্গা সিনেমার সেই সংগ্রামী তরুণ; আবার কষ্ট সিনেমার প্রেমিক যুবক- যেই চরিত্রেই ছিলেন, দর্শকের মনের অন্তস্থলে জায়গা করে নিয়েছিলেন কিংবদন্তি। তাকে বলা হতো ‘গণমানুষের নায়ক’। পর্দায় নায়ক হলেও ঘরে ঘরে মান্না হয়েছিলেন কারও সন্তান, কারও ভাই, কারও স্বপ্নের পুরুষ আবার কারও আইডল।
তবে পর্দার বাইরে মান্না মনে করতেন, চলচ্চিত্র জগৎটা আসলে অনেক বেশি স্বার্থকেন্দ্রিক। তিনি একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এই রঙিন জগতে স্বার্থ ছাড়া আর কিছু নেই, নেই কোনো খাঁটি ভালোবাসা। মান্নার সেই উপলব্ধি আজও সিনেমার অনেক সচেতন শিল্পীকে ভাবিয়ে তোলে।
১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইলে জন্ম নেওয়া আসলাম তালুকদার মান্না ১৯৮৪ সালে ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কার্যক্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। ১৯৮৫ সালে কাজী হায়াতের ‘পাগলী’ দিয়ে অভিষেক হলেও ১৯৯২ সালে ‘দাঙ্গা’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি নিজেকে চিনিয়ে দেন। এরপর ১৯৯৭ সালে ‘তেজি’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘কে আমার বাবা’, ‘আম্মাজান’ ও ‘লাল বাদশা’র মতো সুপারহিট সিনেমা দিয়ে তিনি ঢালিউডে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করেন। শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, প্রযোজক হিসেবেও তিনি ছিলেন দারুণ সফল। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘লুটতরাজ’, ‘স্বামী-স্ত্রীর যুদ্ধ’ ও ‘পিতা-মাতার আমানত’ এর মতো ব্যবসাসফল সিনেমা মুক্তি পেয়েছে।
মান্নার ১৮তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে মান্না ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আজ মিলাদ মাহফিল ও কোরআন খতমের আয়োজন করা হয়েছে। মান্নার সহধর্মিণী ও ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন শেলী মান্না সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছেন, সারা দেশের মানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসা পেয়েছিলেন মান্না। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সবার কাছে শুধু দোয়া চাইছি।
Publisher & Editor