শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

হাঁড়িবুড়ি

প্রকাশিত: ০২:১৭, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ |

এক যে ছিল হাঁড়িবুড়ি। সবাই ডাকত, ‘ও হাঁড়িবুড়ি, তোমার বয়স কত শুনি?’ হাঁড়িটা গুনতে গুনতে বলত, ‘এই যা, ভুলে গেছি!’
বুড়ো হলেও বেশ কাজ করত হাঁড়িবুড়ি। সকাল সকাল চুলায় বসত। আগুন পোহাতে পোহাতে রাঁধত ভাত, তরকারি—আরো কত কী!

এমনি করে দিন যেত, রাত পোহাত।

হাঁড়িবুড়ির কাজ ফুরাত না। চাল ফুটাও রে, ভাত রাঁধো রে, তরকারি ভাপাও রে। বড্ড হাপুস হয়ে যেত হাঁড়িবুড়ি।
একদিনের কথা।

রোজকার মতো রাঁধতে বসেছে হাঁড়ি। পেটে চাল আছে, ডাল আছে, আছে পানি। পানিতে আঁচ লেগেছে। শুরু হয়েছে টগবগানি।

এমন সময় একটা চাল বলে উঠল, ‘ওমা, ফুটব না আমি!’
চমকে উঠল হাঁড়িবুড়ি। কত বয়স হলো, কত চাল ফুটল পেটে, কেউ তো এমন বলেনি! হাঁড়িবুড়ি চোখ পাকাল। তাই দেখে বাকিদের কী হুড়াহুড়ি! চালের দানারা ভাবল, এই বুঝি বকবে হাঁড়িবুড়ি।

এক বুড়ো চাল বলল, ‘বলো কি? ফুটবে না মানে? ভাত হবে না বুঝি?

‘না গো, ভাত হব না। ঘুরতে যাব, দেশ-বিদেশ দেখব।

তারপর না হয় ফুটব!’
তাই শুনে বাকি চালরা রেগে বুম। আধফোটা হয়েছে সবাই। সময় নেই মোটে। সবাই মিলে না-ফোটা চালটাকে ঠোনা দিতে এলো, ‘আবোলতাবোল বকবে না। চাল মানেই ভাত। চালরা ঘোরে না, বেড়ায় না। চড়ে না মাঠে-ঘাটে। ওরা শুধু ভাত হয়, বুঝলে?’

না-ফোটা চালটা বলল, ‘বললেই হলো! ঘুরলে কে মানা করবে শুনি?’

আধফোটা চালগুলো এলো তেড়ে, ‘আমরা মানা করব। বলি, সাহস তো কম না। আমাদের কথা শুনবে না, নিজের মতো চলবে? তা হবে না। শিগগিরই নিচে এসো। হাঁড়িবুড়ির তলায় গিয়ে বসে থাকো, যাও!’

না-ফোটা চালটা ককিয়ে উঠল, ‘একদম যাব না। ফুটব না আমি।’

আধফোটা চালরা সত্যি ধেয়ে এলো, ‘যাবে না বুঝি? তাহলে জোর করে নিয়ে যাব।’

না-ফোটা চাল ছুটল পড়িমড়ি। টগবগে পানিকে বলল, ‘ও দাদু, আমি ফুটব না। ওরা আমাকে জোর করে ফোটাবে। একটু বকে দাও না ওদের।’

দুষ্টু দাদু বলল কী শোনো, ‘আমার কাজই তোমাদের ফোটানো। তোমাকে না ফুটিয়ে ছেড়ে দেব কেন? ওসব আমি পারব না। যাও দেখি।’

কী করবে চালের দানা? কোথায় যাবে? ওই তো হাজারটা চাল আসছে ধেয়ে। ছুটছে পিছু পিছু। ওকে নিচে নিয়ে যাবে। একদম হাঁড়িবুড়ির তলায়। ঘুম পাড়িয়ে দেবে। ফুটিয়ে দেবে তাড়াতাড়ি।

উপায় একটা বের করতেই হবে। ভাবল চালের দানা। লাফিয়ে এলো হাঁড়ির ওপরে।

ওদিকে সব শুনল হাঁড়িবুড়ি। ছোট্ট চালের জন্য বড্ড মায়া হলো তার! আহা, মেয়েটার কী ইচ্ছা! বেড়াতে যাবে, দেখবে সব মন ভরে। ছোটবেলায় এমন ইচ্ছাই ছিল হাঁড়িবুড়ির!

হাঁড়িবুড়ি ভাবল, নিজের ইচ্ছাটা সে চালের দানাকে দেবে। চালের দানাটা ঘুরলেই তার ঘোরা হবে। চালের দানা বেড়ালেই হবে বেড়ানো। বাহ্, কী মজা!

হাঁড়িবুড়ির পেটে বলক উঠেছে। টগবগ টগবগ। বুদ্ধি করল হাঁড়িবুড়ি। ছোট্ট চালের দানাকে ডাকল, ‘খুকি, এদিকে আয়। একটা বলকের মাথায় চড়ে বস জলদি।’

চালের দানা তা-ই করল। চড়ে বসল এক বলকের মাথায়। হাঁড়িবুড়ি অমনি পেটের আঁচ বাড়িয়ে দিল। বলকটা বলল, ‘আরে, করো কী হাঁড়িবুড়ি? পড়ে গেলাম যে আমি!’

টস! বলকটা পড়ে গেল সত্যি সত্যি। মাথায় ছিল চালের দানা, সেও পড়ল হুড়মুড়িয়ে। ‘ওমা গো’—বলকটা আছাড় খেয়ে কাঁদতে বসল।

চালের দানা বলল, ‘আহা রে, খুব লেগেছে বুঝি?’ হাঁড়িবুড়ি হাসতে হাসতে বলল, ‘ধুর, ও কিছু না! একটু মালিশ করলেই সেরে যাবে।’

হাঁড়িবুড়ির মাথায় আবার বুদ্ধি এলো। সে চালের দানাকে বলল, ‘ও খুকি, তুই কি পাখি হবি?’ চালের দানা অবাক, ‘কী বলছ হাঁড়িবুড়ি? চাল কখনো পাখি হয় বুঝি?’

হাঁড়িবুড়ি বলল, ‘হয় না আবার! বানিয়ে দিচ্ছি এক্ষুনি। একটা ফরফরে পাতার ওপর শুয়ে পড় দেখি।’

চালের দানা তা-ই করল। শুয়ে পড়ল পাতার ওপর। খানিক বাদেই পাতাটা লেপটে গেল। পাখার মতো আটকে গেল পিঠে!

হাঁড়িবুড়ি বলল, ‘এই তো হয়ে গেলি পাখি!

চালের দানা দেখল, তাইতো তাইতো! কী সুন্দর ডানাখানি!

এমন সময় বাতাস এলো। ভাসতে লাগল পাতা, সঙ্গে চালের দানা। উড়তে উড়তে চালটা বলল, ‘টা টা ‍বুড়িমা। যাই তাহলে, বেড়িয়ে আসি।’

চালের দানা ‍উড়ল। আর খুশিতে টগবগিয়ে গান জুড়ল হাঁড়িবুড়ি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor