প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি গিজার খুফুর গ্রেট পিরামিডের পাশেই আজ শনিবার (১ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়েছে আধুনিক যুগের এক সাংস্কৃতিক বিস্ময়, গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম।
প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই জাদুঘরটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে যাত্রা শুরু করল। আশা করা হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮০ লক্ষ দর্শনার্থী এই যাদুঘর ভ্রমণে আসবেন।
এতে রয়েছে এক লাখেরও বেশি নিদর্শন, যা মিশরের প্রাক-রাজবংশীয় যুগ থেকে শুরু করে গ্রিক ও রোমান আমল পর্যন্ত সাত হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করছে।
তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে তুতেনখামেনের সম্পূর্ণ সমাধি। এই তরুণ রাজা মাত্র ৯ বছর বয়সে ‘ফারাও’ হন এবং ১০ বছর রাজত্ব করার পর মাত্র ১৯ বছর বয়সে মারা যান।
তার সমাধি প্রথমবারের মতো একত্রে প্রদর্শিত হচ্ছে দর্শনার্থীদের জন্য। বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার ১৯২২ সালে রাজা তুতেনখামেনের অক্ষত সমাধিটি আবিষ্কার করেন।
এবার দর্শকরা এক জায়গায় দেখতে পাবেন তার সোনার মুখোশ, রাজসিংহাসন, যুদ্ধরথ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী।
জাদুঘরের সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক ইজিপ্টোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ড. তারেক তাওফিক জানান, ‘আমাকে ভাবতে হয়েছিল, আমরা কীভাবে তাকে (তুতেনখামেন) অন্যভাবে দেখাতে পারি, কারণ ১৯২২ সালে সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে, সমাধির ভিতরে থাকা ৫ হাজার ৫০০টিরও বেশি নিদর্শনের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি নিদর্শন প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল।’
নতুনভাবে একত্রিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পুরো সমাধিটাই পুনর্গঠন করেছি। কিছুই আর গুদামে নেই, অন্য জাদুঘরেও কিছু নেই, দর্শকরা তুতানখামেনকে পুরোপুরি নতুনভাবে অনুভব করতে পারবেন।
বিশাল ৫ লাখ বর্গমিটার আয়তনের এই জাদুঘরটি প্রায় ৭০টি ফুটবল মাঠের সমান। এর বাইরের দেয়ালে খোদাই করা আছে হায়ারোগ্লিফ (প্রাচীন মিশরের চিত্রলিপি), আর আলাবাস্টার পাথরের স্বচ্ছ ত্রিভুজে তৈরি প্রবেশপথটি নিজেই যেন এক আধুনিক পিরামিড।
প্রবেশমুখেই দর্শকদের স্বাগত জানাচ্ছে ১১ মিটার উঁচু ফেরাউন রামেসিস দ্বিতীয়ের মূর্তি ও তার ৩২ শতাব্দী পুরনো বিশাল ওবেলিস্ক। রয়েছে খুফুর ৪ হাজার ৫০০ বছর পুরনো নৌকা, যা পৃথিবীর প্রাচীনতম সংরক্ষিত জাহাজগুলোর একটি।
তুতানখামেন গ্যালারি ছাড়াও পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত হয়েছে অন্যান্য প্রদর্শনী হল, যেখানে প্রাচীন রাজা-রানীদের ভাস্কর্য সাজানো বিশাল সিঁড়ি এবং উপরের তলা থেকে পিরামিডের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়।
প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে হোসনি মোবারকের আমলে, নির্মাণ শুরু হয় ২০০৫ সালে। দীর্ঘ সময় ধরে নানা প্রতিবন্ধকতা, আর্থিক সংকট, আরব বসন্ত, কোভিডের সময় অতিক্রম করে অবশেষে মিশরীয়দের স্বপ্নের জাদুঘরটি বাস্তব রূপ পেল।
মিশরের দীর্ঘদিনের পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রী ও প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. জাহি হাওয়াস বলেন, ‘এটা আমার জীবনের স্বপ্ন ছিল।’ মিশর নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস সংরক্ষণে সক্ষম বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমরা দুটি জিনিস চাই, প্রথমত, বিশ্বের জাদুঘরগুলো যেন চুরি হওয়া প্রত্নবস্তু কেনা বন্ধ করে, এবং দ্বিতীয়ত, রোজেটা স্টোন (ব্রিটিশ মিউজিয়াম), দেন্দেরা জোডিয়াক (লুভর) ও নেফারতিতির আবক্ষ মূর্তি (বার্লিন) যেন আমাদের ফেরত দেয়।’
Publisher & Editor