শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬

‘আমি নিজেকে একজন সামান্য মানুষ বলেই মনে করি’

খালেদা জিয়ার জবানবন্দি

প্রকাশিত: ০৬:২৭, ০২ জানুয়ারি ২০২৬ |

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার শুনানি ও যুক্তিতর্ক চলাকালে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে আদালতে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেই বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য দুই পর্বে তুলে ধরা হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব

সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও পুরোপুরি বানোয়াট মাননীয় আদালত, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে কেন্দ্র করে আমিসহ অন্যান্যের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলার সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও পুরোপুরি বানোয়াট। সমস্ত অভিযোগ স্ববিরোধী বক্তব্যে ভরপুর। 

এই ট্রাস্টের অর্থায়ন, পরিচালনা বা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং এখনো নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের আইনগত কর্তৃত্ব ও এখতিয়ারের বাইরে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর এমন একটি ভিত্তিহীন অভিযোগে দায়ের করা এ মামলায় বিচারের নামে দীর্ঘদিন ধরে আমি হয়রানি, পেরেশানি ও হেনস্তার শিকার হচ্ছি।...

এই ক্ষমতা অপপ্রয়োগের ভয় তাই বিচারকদের মনে থাকাটাই স্বাভাবিক। নিম্ন আদালতে এই পরিস্থিতি ও পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি প্রকট। আমি একটিমাত্র ছোট্ট উদাহরণের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং আমার ও শহীদ জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমানকে অর্থ পাচারের একটি বানোয়াট অভিযোগ থেকে তার অনুপস্থিতিতেই একজন বিচারক বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন।

এই অপরাধে শাসক মহল উক্ত বিচারককে হেনস্তা ও হয়রানির উদ্দেশ্যে এমন সব তৎপরতা শুরু করে যে তাতে তাকে আত্মরক্ষার জন্য সপরিবারে দেশত্যাগ করতে হয়েছে। এই একটিমাত্র উদাহরণই ন্যায়বিচার ব্যাহত করতে এবং ব্যক্তি বিচারকদের নিজস্ব নিরাপত্তাবোধের ব্যাপারে শঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। 

...মনে পড়ে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের শাসনামলের কথা মাননীয় আদালত, আপনি কোথায় বসে এই মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছেন? কোথায় স্থাপন করা হয়েছে আপনার এই এজলাস? এটা কি বিচারের কোনো প্রাঙ্গণ? এটা কি কোর্ট-কাচারির কোনো এলাকা? 

আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বিচারের জন্য বিশেষ আদালত বসেছে আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। এই মাদ্রাসা প্রাঙ্গণের সঙ্গে বিচার ও কোর্ট-কাচারির কোনো সম্পর্ক আছে কি? এখানে এলেই আমার মনে পড়ে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের অবৈধ ও অসাংবিধানিক শাসনামলের কথা। 

...আমরা সকলে জানি এবং আপনিও জানেন, এর জন্য আপনি দায়ী নন। এই সিদ্ধান্ত আপনি নেননি। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারকাজ কোথায় বসে পরিচালিত হবে, এজলাস কোথায় স্থাপিত হবে, সেটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে শাসক মহলের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় জড়িত। তারাই এখানে এজলাস বসিয়েছে আমার মামলার বিচারের জন্য।

আমি কেন রাজনীতিতে এসেছিলাম? নিশ্চিত ও নিরাপদ জীবন ছেড়ে কেন আমি ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চিত পথে পা দিয়েছিলাম? তখন আমার সামনে মসনদ কিংবা ক্ষমতার কোনো হাতছানি ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতার অবৈধ দখলদারেরা চায়নি আমি রাজনীতিতে থাকি। আমি রাজনীতি না করলে তারা আমাকে অনেক বেশি সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিল। রাজনীতি করলে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে আমাকে ভয়ভীতিও দেখানো হয়েছিল।
শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিদ্রোহ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও খুন-ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের যেখানে বিচার হয়েছে সেখানে এজলাস বসিয়ে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারের আয়োজন তারাই করেছে। সেখানে আমাকে হাজির হতে হচ্ছে। 

ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য, এর মাধ্যমে বিচারের আগেই, বিচার চলাকালেই এবং বিচারের নামেই আমাকে জনসমক্ষে হেয় করা, অপমান করা, অপদস্থ করা। এটাও বিচারপ্রক্রিয়ায় একধরনের হস্তক্ষেপ। এই পদক্ষেপ এমন একটি ভীতিকর পরিবেশের জন্ম দিয়েছে, যার কারণে জনমনে ন্যায়বিচার সম্পর্কে চরম সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। 

ইসলাম
এর মাধ্যমে আমাকে বিচারের আগেই এবং বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একধরনের চরম হেনস্তা ও অসম্মানিত করা হচ্ছে। এর প্রতিবিধান আমি কার কাছে চাইব? কোথায় পাব এর প্রতিকার? প্রধানমন্ত্রীর এমন উক্তির আমি কী জবাব দেব? 

...১১ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে আমি প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তি তুলে ধরছি। ‘বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতিমের টাকা চুরি করে খেয়েছেন। এতিমের নামে টাকা এসেছে। মামলায় হাজিরা দিতে যান। এক দিন যান তো ১০ দিন যান না, পালিয়ে বেড়ান। ব্যাপারটা কী? এতেই তো ধরা পড়ে যায় যে চোরের মন পুলিশ পুলিশ।’ 

একটি বিচারাধীন মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন মানহানিকর, জঘন্য ও কদর্য উক্তির আমি কী জবাব দেব? 

...মামলার অভিযোগ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাগজপত্র আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন। আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে নিশ্চিতভাবেই জেনেছেন যে জিয়াউর রহমানের নামে এতিমখানা স্থাপনের জন্য বিদেশ থেকে অনুদানের যে অর্থ এসেছিল, তার একাংশ দিয়ে স্থাপিত এতিমখানায় এতিমদের কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। সেই অর্থের বাকি অংশ যা ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল, তার প্রতিটি পয়সাই রক্ষিত রয়েছে। ব্যাংকের সুদ যুক্ত হয়ে সেই টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেড়েছে। এর একটি পয়সাও অপচয় বা তছরুপ হয়নি। কেউ চুরি করে খাওয়ার প্রশ্নও ওঠেনি। 

তাহলে প্রধানমন্ত্রী কেমন করে এতিমের টাকা চুরি করে খাওয়ার মতো মানহানিকর ও কুৎসিত উক্তি করলেন? বিচারাধীন বিষয়ে এমন মন্তব্য করার অধিকার ও এখতিয়ার কি তাঁর আছে? এটা কি আইনের লঙ্ঘন ও বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়? 

...মাননীয় আদালত, আমি নিজেকে একজন সামান্য মানুষ বলেই মনে করি। তবে দেশ-জাতির স্বার্থ ও কল্যাণে আমার জীবন, সীমিত শক্তি-সামর্থ্য এবং মেধা ও জ্ঞানকে আমি উৎসর্গ করেছি। 

প্রায় তিন যুগ আগে মানুষের ডাকে ও ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে আমি রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখি। সেদিন থেকেই বিসর্জন দিয়েছি নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে। 

আমি কেন রাজনীতিতে এসেছিলাম? নিশ্চিত ও নিরাপদ জীবন ছেড়ে কেন আমি ঝুঁকিপূর্ণ অনিশ্চিত পথে পা দিয়েছিলাম? তখন আমার সামনে মসনদ কিংবা ক্ষমতার কোনো হাতছানি ছিল না। রাষ্ট্রক্ষমতার অবৈধ দখলদারেরা চায়নি আমি রাজনীতিতে থাকি। 

আমি রাজনীতি না করলে তারা আমাকে অনেক বেশি সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিল। রাজনীতি করলে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে আমাকে ভয়ভীতিও দেখানো হয়েছিল। 

সবকিছু উপেক্ষা করে আমি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখি। কারণ, দেশে তখন গণতন্ত্র ছিল না। জনগণের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেওয়া হয়েছিল। জনগণের অধিকার ছিল না। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু থেকেই আমাকে রাজপথে নামতে হয়েছিল। 

আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শের পতাকা হাতে নিয়ে। আমার সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্য নিয়ে। আমি সব সময় চেয়েছি, বাংলাদেশ যেন গণতান্ত্রিক পথে পরিচালিত হয়। মানুষের যেন অধিকার থাকে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে। বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থাকে। 

আমি চেয়েছি, আমাদের অর্থনীতি যেন শক্তিশালী হয়। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মর্যাদার আসন পায়। সেই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্যই আমার রাজনীতি। 

আমি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে দেশ ও জনগণের ভাগ্যের সঙ্গে নিজের ভাগ্যকে একাকার করে ফেলেছি। আমার নিজের কোনো পৃথক আশা-আকাঙ্ক্ষা নেই। 

জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাই আমার আশা-আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। আমার জীবন পুরোপুরি জড়িয়ে গেছে এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ও প্রত্যয়ের সঙ্গে। তাদের সুখ-দুঃখ ও উত্থান-পতনের সঙ্গে; দেশের মানুষের জীবনের চড়াই-উতরাই ও সমস্যা-সংকটের সঙ্গে। তাদের বিজয়, বিপর্যয় এবং সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে। 

দেশ জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গেই একাকার হয়ে গেছে আমার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সম্ভবত সে কারণেই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষ যখনই দুর্যোগ ও দুর্বিপাকের মুখে পড়েছে, তখন আমিও দুর্যোগের মুখে পড়েছি। 

...আমার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হয়েছে মাননীয় আদালত, আপনি নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা মামলা-মোকদ্দমা দায়ের করা হচ্ছে। জারি করা হচ্ছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। 

প্রায় চার দশকের স্মৃতিবিজড়িত বসতবাড়ি থেকে আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমাকে আমার বাসা ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে বালির ট্রাক দিয়ে কয়েক দফায় দীর্ঘদিন অবরোধ করে রাখা হয়েছে। আমি আমার অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় সে সময় বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। 

সেই অবরুদ্ধ অবস্থাতেই আমি মৃত্যুসংবাদ পাই বিদেশে চিকিৎসাধীন আমার একটি সন্তানের। আর সেদিনই আমার এবং আমার সঙ্গে অবরুদ্ধদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ করা হয় রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো এবং বিস্ফোরক দিয়ে মানুষ হত্যার। অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায়ই নাকি আমরা এসব করেছি। এগুলো কি কোনো সভ্য ও মানবিক আচরণ?

মাননীয় আদালত, আপনি দেখেছেন, শাসক মহলের নির্দেশে আমার স্বাধীন চলাচল বিভিন্নভাবে ব্যাহত করা হয়েছে। প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে আমার ওপর বারবার হামলার ঘটনা সারা বিশ্ব দেখেছে। আমার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চালানো হয়েছে। আমার গাড়ির ওপর গুলি চালানো হয়েছে। 

আমার গাড়িবহরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা তাতে আহত হয়েছে। সন্ত্রাসীরা কেউ আটক হয়নি। কোনো ঘটনার বিচার হয়নি আজ পর্যন্ত। 

আমার নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে বারবার। আমার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে অসত্য ও কুৎসিত অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এর কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং এ দেশের জনগণের বর্তমান সার্বিক দুর্দশার সঙ্গে আমার এসব হেনস্তা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলেই আমার সুদৃঢ় বিশ্বাস। 

তাই মাননীয় আদালত, আমি যত সামান্য মানুষই হই না কেন, আমার প্রতি বর্তমান শাসক মহলের আচরণের কারণ, পটভূমি ও প্রেক্ষাপটের ব্যাপ্তি কিন্তু সামান্য নয়। দেশ–জাতির দুর্দশা থেকে এটিকে আলাদা করে দেখা যাবে না।

কাজেই আলোচ্য মামলাটি দায়ের এবং এর সকল কার্যক্রম ও পরিণতি কেবল ফৌজদারি বিধিবিধান, আইন-কানুন ও বিচারব্যবস্থার মধ্যেই সীমিত নয়। অনুরোধ করব আমার কথাগুলো একটু শুনবেন, পুরো বিষয়গুলো ব্যাখ্যা না করলে কেবল আইনগত খুঁটিনাটি দিক তুলে ধরে এই মামলাটির সঠিক চিত্র বিশদ ও নিখুঁতভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়।...

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor