রবিবার, ৩১ আগস্ট ২০২৫

আদালতে অবৈধ ঘোষণার পর ট্রাম্পের শুল্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

প্রকাশিত: ০৬:৪৫, ৩১ আগস্ট ২০২৫ |

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আপিল আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত বেশিরভাগ শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালত জানায়, প্রেসিডেন্ট জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে যেভাবে বৈশ্বিক ‘রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ’ আরোপ করেছিলেন, তা আইনের আওতার বাইরে। এই রায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত একই রকম রায় দিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, ট্রাম্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জরুরি আইনকে (ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট—আইইইপিএ) শুল্ক আরোপের জন্য ব্যবহার করেছেন, যা আইনের উদ্দেশ্য নয়। তবে আপিল আদালত শুল্ক সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করেনি। রায়ের ভাষ্যে বলা হয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বহাল থাকবে এবং এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়াবে।

আপিল আদালতের ১১ জন বিচারকের মধ্যে সাতজন নিম্ন আদালতের রায় সমর্থন করেন, চারজন এর বিরোধিতা করেন। আদালত জানায়, আইইইপিএ প্রেসিডেন্টকে শুল্ক বা কর আরোপের ক্ষমতা দেয় না। আইনে এমন কোনো শব্দ বা প্রক্রিয়া নেই, যা শুল্ক আরোপকে বৈধতা দেয়। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি ‘আইনের পরিপন্থী এবং অবৈধ।’ রায় ঘোষণার পর ট্রাম্প তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, আপিল আদালত ‘চরম পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বড় বিপর্যয়’। তার দাবি, এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে তা দেশকে ধ্বংস করে দেবে।

১৯৭৭ সালে প্রণীত আইইইপিএ আইন প্রেসিডেন্টকে জাতীয় নিরাপত্তা বা বিদেশ থেকে আসা গুরুতর হুমকির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই আইনে নিষেধাজ্ঞা দেন। জো বাইডেনও ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর একই আইন ব্যবহার করেছিলেন। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, এই আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের অধিকার দেয় না।

ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাই তিনি শুল্ক আরোপকে জরুরি অবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু আদালত জানায়, কর ও অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে, প্রেসিডেন্টের হাতে নয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। শুল্ক হলো এক ধরনের কর, যা আমদানিকারকদের দিতে হয় এবং এর ফলে পণ্যের দাম ও ব্যবসার লাভে প্রভাব পড়ে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিজনেস স্কুলের অর্থনীতিবিদ ড. লিন্ডা ইউহ বিবিসিকে বলেন, 'ব্যবসায়ীরা এখন অনিশ্চয়তায় পড়বে।' শুল্ক অব্যাহত থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টের ওপর। যদি সুপ্রিম কোর্ট আপিল আদালতের রায় বহাল রাখে, তবে কয়েক বিলিয়ন ডলার আমদানি শুল্ক ফেরত দিতে হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। চলমান আলোচনাগুলোও আটকে যেতে পারে।

সব নজর এখন সুপ্রিম কোর্টের দিকে। সেখানে রিপাবলিকান নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, যাদের মধ্যে তিনজনকে ট্রাম্প নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর অবস্থান টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আদালত একাধিকবার প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতার সীমা নিয়ে সতর্ক করেছে। সম্প্রতি আদালত বাইডেন প্রশাসনের পরিবেশ নীতি ও শিক্ষাঋণ মওকুফ পরিকল্পনা বাতিল করেছে, যুক্তি দেখিয়েছে, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেস অনুমোদিত ক্ষমতার বাইরে গিয়ে পদক্ষেপ নিতে পারেন না।

যদি শুল্ক চূড়ান্তভাবে অবৈধ ঘোষণা হয়, তাহলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের জন্য বড় ধাক্কা হবে। তবে উল্টোটা হলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগে নতুন নজির তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে আরও আক্রমণাত্মক শুল্কনীতির পথ খুলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor