শুক্রবার, ২৯ আগস্ট ২০২৫

ডাবের পানি সবার জন্য নয়, কারা এবং কেন অবশ্যই এড়িয়ে চলবেন

প্রকাশিত: ১২:৩৯, ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ২১

ডাবের পানি প্রাকৃতিক সুপারড্রিংক। ক্যালরি কম, ইলেকট্রোলাইটে ভরপুর আর ব্যায়ামের পর শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করে। ত্বক ভালো রাখা থেকে হজমে সহায়তা—এর গুণ অনেক। তবে এই পানীয় সবার জন্য উপযুক্ত নয়। কারা এবং কেন ডাবের পানি এড়িয়ে চলবেন, জেনে রাখুন।

প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যগুণের আড়ালে কারও কারও জন্য ডাবের পানি ডেকে আনতে পারে সমস্যা। চিনি, ইলেকট্রোলাইটের মাত্রা এবং ঠান্ডা প্রকৃতির কারণে, বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই কিছু স্বাস্থ্যসমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সৃষ্টি করতে পারে জটিলতা।
ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা খাবারে অ্যালার্জির মতো নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থা থাকলে ডাবের পানি উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করতে পারে। তাই কখন এই পানীয় শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তা জানা জরুরি। গবেষণা, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এখানে বিস্তারিত বলা হলো কারা ডাবের পানি এড়িয়ে চলবেন এবং কেন।

ডায়াবেটিক রোগীরা
প্রতি ২০০ মিলিলিটার ডাবের পানিতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে ৬–৭ গ্রাম। ফলের রস বা কোমল পানীয়ের তুলনায় কম হলেও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স আছে, এমন ব্যক্তিদের জন্য এই প্রাকৃতিক চিনি নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত ওঠানামা করতে পারে। আজকাল বোতলজাত ডাবের পানিও পাওয়া যায়। এসবে অতিরিক্ত চিনি যোগ করা থাকে, যা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

অতএব ডায়াবেটিক রোগীদের ডাবের পানি অল্প পরিমাণে খাওয়া কিংবা পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। আপনার ডায়েটের জন্য সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে অবশ্যই কোনো চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অ্যালার্জির প্রবণতা আছে যাঁদের
ডাবে অ্যালার্জি তুলনামূলকভাবে বিরল, তবুও সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে। ডাবের পানি বা ডাব দিয়ে তৈরি খাবার খাওয়ার পরপরই চুলকানি, চাকা চাকা দাগ, ফোলা বা ত্বকে লালচে ভাব দেখা দিতে পারে।

গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, হজমের সমস্যা, এমনকি অ্যানাফাইল্যাক্সিস (একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে গুরুতর অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া) হতে পারে।

‘এশিয়া প্যাসিফিক অ্যালার্জি’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডাবে অ্যালার্জি থাকা শিশুদের প্রায় ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে ত্বক-সংক্রান্ত উপসর্গ দেখা দেয়, আর প্রায় ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জটিল অ্যানাফাইল্যাক্সিস হয়।

আরেকটি গবেষণা ‘অ্যালার্জোলজিয়া এট ইমিউনোপ্যাথোলজিয়া’য় নিশ্চিত করা হয়েছে যে ডাবের প্রোটিন শিশুদের মধ্যে অ্যানাফাইল্যাক্সিসের কারণ হতে পারে।

যদিও ডাবের সঙ্গে অন্যান্য বাদামের অ্যালার্জির ক্রস-রিঅ্যাকটিভিটি বিরল, তবুও যাঁদের আগে থেকেই বাদামে অ্যালার্জি আছে, তাঁদের সতর্ক থাকা উচিত। খাবারে অ্যালার্জির ইতিহাস বা সংবেদনশীলতা থাকলে ডাবের পানি খাওয়ার সময় সচেতন থাকুন। খাওয়ার পর কোনো অস্বাভাবিক বা গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কিডনির সমস্যায় ভুগছেন যাঁরা
ডাবের পানি পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ। এই পটাশিয়াম এমন এক খনিজ, যা শরীরে তরল ভারসাম্য বজায় রাখা ও হৃদ্‌যন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে যাঁদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) আছে বা কিডনির কার্যক্ষমতা কম, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত পটাশিয়াম বিপজ্জনক হতে পারে।

কিডনি সঠিকভাবে পটাশিয়াম ছেঁকে ফেলতে না পারলে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে গিয়ে হাইপারক্যালেমিয়া হতে পারে। এতে পেশি দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, এমনকি হৃদ্‌স্পন্দনের অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

তাই যদি আপনার কিডনিসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকে, বিশেষ করে মাঝারি বা উচ্চপর্যায়ে, তাহলে ডাবের পানি এড়িয়ে চলা বা সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। এ বিষয়ে অবশ্যই কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

সর্দি-কাশি বা ফ্লুর সময়
আয়ুর্বেদসহ কিছু প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিতে ডাবের পানি শরীরে প্রাকৃতিকভাবে শীতলতা আনে বলে মনে করা হয়। গরম আবহাওয়া বা গ্রীষ্মকালে এটি উপকারী হলেও সর্দি, কাশি বা ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার সময় খেলে ডাবের পানি সমস্যা বাড়াতে পারে।

এর শীতল প্রকৃতি শরীরে শ্লেষ্মা উৎপাদন বাড়াতে পারে অথবা দেহের তাপমাত্রা আরও কমিয়ে দিতে পারে, যা অসুস্থ অবস্থায় ভালো নয়। নাক বন্ধ, গলা ব্যথা বা কণ্ঠস্বর ভাঙার মতো উপসর্গ থাকলে ডাবের পানি খাওয়ার ফলে অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে বা সুস্থ হতে সময় লাগতে পারে।

যাঁরা ঘন ঘন সর্দি-কাশিতে ভোগেন বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের জন্য শীতকালে বা অসুস্থ অবস্থায় ডাবের পানি বদলে গরম পানীয় খাওয়াই উত্তম, যা রোগ প্রতিরোধ ও দ্রুত আরোগ্যে সহায়ক।

উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
পটাশিয়াম থাকে বলে ডাবের পানি হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী। শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব কমিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে ডাবের পানিতে থাকা পটাশিয়াম। তবে এই উপকারিতাই কারও কারও জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করেন।

এ ধরনের ওষুধ শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা ধরে রাখে, আর ডাবের পানি খেলে পটাশিয়ামের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে। এতে হাইপারক্যালেমিয়া হতে পারে, যার উপসর্গের মধ্যে আছে বুকব্যথা, বমিভাব, পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়া বা অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন।

উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সেবন করলে নিয়মিত ডাবের পানি খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ রকম অবস্থায় ডাবের পানি উপকার করতে পারে, তবে ভুলভাবে গ্রহণ করলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

ইলেকট্রোলাইট-নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে থাকলে
কম পটাশিয়াম বা স্বল্প মাত্রায় ইলেকট্রোলাইট–সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার নিয়ম থাকলে (যেমন হৃদ্‌রোগ বা উচ্চপর্যায়ের কিডনির সমস্যায়) ডাবের পানি আপনার জন্য উপযুক্ত না–ও হতে পারে।

এতে থাকা পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মিশ্রণ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে সহজেই ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এর ফলে ক্লান্তি, পেশি টান ধরা বা অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দনের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তাই যেকোনো খাবারের মোড়কে সব সময় পুষ্টি-তথ্যের লেবেল ভালোভাবে পড়ুন এবং আপনার চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের দেওয়া খাদ্যনির্দেশিকা মেনে চলুন।

শেষ কথা
ডাবের পানি নিঃসন্দেহে অনেকের জন্য স্বাস্থ্যকর—শরীর আর্দ্র রাখে, পুষ্টি দেয় এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও ত্বকের সুস্থতায় সহায়তা করতে পারে। কিন্তু যেকোনো খাবার বা পানীয়ের মতোই, যা একজনের জন্য ভালো, তা অন্যজনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

যদি আপনার ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা, খাবারে অ্যালার্জি, ঘন ঘন সর্দি লাগা বা ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যের সমস্যা থাকে, তাহলে ডাবের পানি হয়তো সেরা বিকল্প নয়, অথবা খুব সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor