লোডশেডিংয়ের সময় তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আইপিএস (ইনস্ট্যান্ট পাওয়ার সাপ্লাই) ব্যাটারি। বাল্ব, ফ্যান, কম্পিউটারসহ জরুরি যন্ত্র চালু রাখে বলে এর চাহিদা বাড়ছে দিনকে দিন। তবে অযত্ন, ভুল ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আইপিএস ব্যাটারির কর্মক্ষমতা দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে ঘন ঘন নষ্ট হওয়া, মেরামতে বেশি খরচ হওয়া বা নতুন ব্যাটারি কেনার প্রয়োজন হয়। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ শুধু ব্যাটারির মেয়াদ বাড়ায় না, বরং অর্থ সাশ্রয় করে এবং হঠাৎ বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের ঝুঁকি কমায়। তাই জেনে রাখুন আইপিএস ব্যাটারি দীর্ঘজীবী করার ৫টি কার্যকর পরামর্শ।
১. সঠিকভাবে ইনস্টল ও বায়ু চলাচল নিশ্চিত করুন
আইপিএস ব্যাটারি কোথায় বসাতে হবে, এটা অধিকাংশ মানুষ ভুল করেন। প্রথম কাজ হলো সঠিক জায়গায় ব্যাটারি স্থাপন করা। ভুলভাবে বসালে এটি বিদ্যুৎ হারাতে পারে, অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে এবং এমনকি ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
উপযুক্ত জায়গা বেছে নিন: আইপিএস ব্যাটারি রাখুন পরিষ্কার, শুকনো এবং প্রচুর বাতাস চলাচল করে, এমন জায়গায়। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকলে তাপ জমে ধীরে ধীরে এর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।
সূর্যের আলো ও আর্দ্রতা এড়িয়ে চলুন: আইপিএস ব্যাটারির বাইরের আবরণ এবং ভেতরের যন্ত্রাংশ সূর্যের আলো বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এটি সব সময় শীতল ও শুকনো জায়গায় রাখার চেষ্টা করুন।
স্থির জায়গায় বসান: আইপিএস ব্যাটারি বসানোর করার সময় খেয়াল রাখবেন, তা যেন নড়াচড়া না করে। নড়াচড়া করলে সংযোগ ঢিলা হয়ে যেতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে তৈরি হতে পারে সমস্যা।
২. সঠিকভাবে চার্জ ও ডিসচার্জ করুন
আইপিএস ব্যাটারি দীর্ঘদিন কার্যকর রাখতে সঠিক চার্জ-ডিসচার্জ চক্র মেনে চলা জরুরি। ভুলভাবে চার্জ-ডিসচার্জ করলে ব্যাটারির কর্মক্ষমতা দ্রুত কমে যায়, আয়ুও কমে। তাই সচেতন ব্যবহারই নিশ্চিত করবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ঝামেলামুক্ত সেবা।
অতিরিক্ত চার্জ দেবেন না: আইপিএসের ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার অন্যতম কারণ অতিরিক্ত চার্জ দেওয়া। তাই এটি করতে যাবেন না। যদিও আধুনিক আইপিএসগুলোতে অতিরিক্ত চার্জ প্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকে, তবুও নিয়মিত পরীক্ষা করুন। আইপিএসের ব্যাটারি কেনার সময় ভালো মানের ব্যাটারি বেছে নিন, তাহলে ভালো ব্যাকআপ পাবেন, ভোগান্তি কম হবে এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।
পুরোপুরি ডিসচার্জ করবেন না: বারবার পুরোপুরি ডিসচার্জ হলে ব্যাটারির আয়ু কমে যায়। চার্জ লেভেল ২০-৩০ শতাংশের ওপরে রাখা সবচেয়ে ভালো এবং ব্যাটারি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগে চার্জ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
সঠিক চার্জার ব্যবহার করুন: সব সময় প্রস্তুতকারকের পরামর্শ অনুযায়ী চার্জার ব্যবহার করুন। অসামঞ্জস্যপূর্ণ চার্জার ব্যবহারে ওভার ভোল্টেজ বা আন্ডার ভোল্টেজ হতে পারে, যা ব্যাটারির ক্ষতি করতে পারে।
নিয়মিত ইকুয়ালাইজেশন চার্জিং করুন: ইকুয়ালাইজেশন চার্জিং ব্যাটারির সেলগুলোর চার্জের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং সিসা সালফেট জমা হওয়া (সালফেশন) কমাতে সাহায্য করে। ইকুয়ালাইজেশন চার্জিং কত দিন পরপর করতে হবে, তা আইপিএস ব্যাটারির সঙ্গে দেওয়া ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন।
৩. নিয়মিত ইলেকট্রোলাইট লেভেল পরীক্ষা করুন
লেড-অ্যাসিড আইপিএস ব্যাটারিতে ইলেকট্রোলাইটের স্তর সঠিক মাত্রায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইলেকট্রোলাইট রাসায়নিক প্রক্রিয়াগুলোতে সাহায্য করে, যা শক্তি সঞ্চয় ও সরবরাহ করে।
ডিস্টিল্ড ওয়াটার ব্যবহার করুন: ইলেকট্রোলাইটের স্তর নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং প্রয়োজনমতো ডিস্টিল্ড ওয়াটার যোগ করুন। ট্যাপ বা সাধারণ পানি ব্যবহার করবেন না; কারণ, এতে লবণ ও ময়লা থাকে, যা ব্যাটারির ক্ষতি করতে পারে।
প্লেট পর্যবেক্ষণ করুন: ব্যাটারির ভেতরে থাকা সিসার প্লেটগুলো ইলেকট্রোলাইটে পুরোপুরি ডুবে আছে কি না, তা নিশ্চিত করুন। যদি প্লেট বাইরে বেরিয়ে থাকে, তবে মরিচা ধরে যেতে পারে এবং ব্যাটারির শক্তি কমে যেতে পারে।
লিকেজ বা ছিদ্র পরীক্ষা করুন: ব্যাটারিতে কোনো লিকেজ বা ছিদ্র আছে কি না, খেয়াল করুন। লিকেজ শুধু ব্যাটারির ক্ষতিই করে না, বিপজ্জনকও হতে পারে। তাই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৪. টার্মিনালগুলো পরিষ্কার ও দৃঢ় রাখুন
আইপিএসের টার্মিনাল বলতে মূলত আইপিএস ব্যাটারির সঙ্গে সংযুক্ত দুটি প্রান্তকে বোঝায়। এই টার্মিনাল ঢিলা হলে বা ময়লা জমলে বিদ্যুতের অপচয় হয় এবং এতে ব্যাটারির আয়ু কমে যেতে পারে। তাই সংযোগগুলো পরিষ্কার এবং নিরাপদ রাখা খুবই জরুরি।
করোশন বা মরিচা পরিষ্কার করুন: ব্যাটারির সংযোগস্থলে যদি মরিচা ধরে যায়, তাহলে তা বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ করে ব্যাটারির ক্ষতি করে। বেকিং সোডা এবং পানির মিশ্রণ দিয়ে টার্মিনালগুলো হালকাভাবে পরিষ্কার করুন। পরিষ্কার করার পর যেন মরিচা না ধরে, তার জন্য পেট্রোলিয়াম জেলি বা টার্মিনাল প্রটেক্টর লাগানো উচিত।
সংযোগগুলো শক্ত করুন: সংযোগগুলো খুব ঢিলা থাকলে স্পার্কিং বা অনিয়মিত চার্জিং হতে পারে, এতে ব্যাটারির ক্ষতি হতে পারে। সংযোগগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং শক্ত করে দিন।
ক্ষয়ক্ষতি পরীক্ষা করুন: তার এবং সংযোগে ছিদ্র, ক্ষয় বা কোনো ক্ষতি আছে কি না, খেয়াল করুন। বিদ্যুৎ-বিভ্রাট এড়াতে সেসব দ্রুত বদলে ফেলুন।
৫. সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করুন
সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতি ব্যাটারির মেয়াদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই সঠিক উপায়ে ব্যাটারি ব্যবহার করতে হবে। অযত্ন ও ভুল ব্যবহারের কারণে ব্যাটারি দ্রুত অকেজো হয়ে যেতে পারে। নিয়মিত পরীক্ষা, সঠিক চার্জিং ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করলে ব্যাটারি দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে।
ব্যটারির ওপর কিছু রাখবেন না: অনেক সময় ব্যাটারির ওপর বিভিন্ন সরঞ্জাম রাখা হয়। এতে ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। ফলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। তাই ব্যাটারির ওপর কিছু রাখবেন না।
দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করলেও যত্নে রাখুন: অনেক সময় বাড়ির বাইরে গেলে আইপিএস ব্যবহার করা হয় না। তখন ব্যাটারি পুরো চার্জ দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ঠান্ডা ও শুকনো স্থানে রেখে দিন, এতে ব্যাটারি নষ্ট হবে না।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন: সাধারণত ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ব্যাটারি ভালো কাজ করে। অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা তাপমাত্রা ব্যাটারির কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং আয়ু হ্রাস করে।
ঘন ঘন চালু-বন্ধ করবেন না: ঘন ঘন চালু-বন্ধ করলে ব্যাটারির ওপর চাপ পড়ে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারিটি ব্যবহার করুন।
সবশেষে
আইপিএস ব্যাটারির যত্ন নেওয়া কঠিন নয়। শুধু সঠিকভাবে ইনস্টল করা, চার্জ-ডিসচার্জের খেয়াল রাখা, ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা, টার্মিনাল পরিষ্কার রাখা এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই ব্যাটারি বহু বছর ভালো থাকবে। আর একটু যত্ন নিলে খরচসাধ্য পরিবর্তনের ঝামেলা এড়ানো যাবে।
Publisher & Editor