বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪

আর্জেন্টিনা কেন ইসরায়েলের এত বড় বন্ধু হয়ে গেল

প্রকাশিত: ০৪:১০, ০৭ জুলাই ২০২৪ | ৩৪

গত বছরের অক্টোবর মাসে হামাস যখন ইসরায়েলে আক্রমণ করছিল, সে সময় আর্জেন্টিনার ভোটাররা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফার ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর্জেন্টিনার রাজনীতিবিদ ও প্রার্থীরা খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মতামত প্রকাশ করেন।

মধ্যবামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্দেজ থেকে শুরু করে উগ্র ডানপন্থী হাভিয়ার মিলেই (বর্তমান প্রেসিডেন্ট)—সবাই ইসরায়েলের প্রতি সংহতি জানিয়ে হামাসকে নিন্দা করলেন। তাঁদের কেউই গাজা, ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনিদের কথা উল্লেখ করলেন না।

বামপন্থী প্রার্থী মেরিয়াম ব্রেগম্যান অবশ্য নিরীহ মানুষের প্রাণহানির ঘটনার দুঃখ প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের বিতর্ককালে তিনি বর্তমান সংঘাতের জন্য ইসরায়েলের দখলদারি ও বর্ণবাদকে দায়ী করেন।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনই ছিল প্রভাববিস্তারী। নতুন প্রেসিডেন্ট মিলেইয়ের প্রশাসন সরাসরি ইসরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। যদিও কিছু আরব গণমাধ্যম ভুলভাবে উপস্থাপন করছে যে লাতিন আমেরিকার সব দেশই ফিলিস্তিনের প্রতি সংবেদনশীল।

গাজা যুদ্ধের শুরুর দিকে আলজাজিরা ফিলিস্তিনের প্রতি লাতিন আমেরিকার ব্যাপক সমর্থনের দৃষ্টান্ত হিসাবে মহাদেশটির সরকারগুলোর বিবৃতি তুলে ধরেছিল। দ্য নিউ আরব–এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ‘লাতিন আমেরিকা কেন ফিলিস্তিনের প্রতি এতটা সহানুভূতিশীল’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থেকে অঞ্চলটির ক্রমাগত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, বামপন্থী আন্দোলন ও আরব দেশগুলো থেকে যাওয়া অভিবাসীর সংখ্যাকে কারণ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে।

এর বিপরীতে ব্রাজিলের শিক্ষাবিদ ফার্নান্দো ব্রাঙ্কোলি দেখিয়েছেন রাজনৈতিক মতাদর্শ, অভিবাসী রাজনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো কীভাবে ইসরায়েলপন্থী ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান গ্রহণ করে।

মতাদর্শিক সখ্য
২০১০ সালে ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ দে কির্চনার যখন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট তখন দেশটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাঁর মধ্যবাম সরকার পেরোনিজমের তিনটি নীতি পুনর্জীবন করতে চেয়েছিল। সেগুলো হলো সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পেছনে ছিল ক্রিস্টিনা সরকারের রাজনৈতিক মতাদর্শ।

এ স্বীকৃতি ছিল ২০০০-এর শূন্যের দশকের শুরুর দিকে লাতিন আমেরিকায় যে ‘গোলাপি জোয়ার’ শুরু হয়েছিল, তারই একটি প্রতিফলন। বামপন্থী রাজনীতির উত্থান, জোরালো আঞ্চলিক সংহতি ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আরও স্বায়ত্তশাসন অর্জন—এই বিষয়গুলোই ছিল এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল কেন্দ্র।

মেক্সিকো ও পানামা ছাড়া লাতিন আমেরিকার সব কটি দেশই এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে মোড় নিয়েছিল। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে আর্জেন্টিনার সেই অবস্থান ছিল যুগের হাওয়ায় গা ভাসানোর মতো ব্যাপার।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট মাক্রির আমলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় ওঠে। সে বছরই ইসরায়েলের কাছ থেকে টহল নৌযান ও নজরদারি সরঞ্জাম কেনে আর্জেন্টিনা। নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মিলেইয়ের আমলে সেটি আরও গভীর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সেই গোলাপি জোয়ারে একসময় ভাটার টান এল। এরপর লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে রক্ষণশীল, জাতীয়তাবাদী ও যুক্তরাষ্ট্রপন্থী সরকার ক্ষমতায় এল। দৃষ্টান্ত হিসেবে ২০০৯ সালে হন্ডুরাসের সামরিক অভ্যুত্থান ও ২০১২ সালে প্যারাগুয়ের প্রেসিডেন্টের অভিশংসনের কথা বলা যায়। ২০১২ সাল থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোয় ডানপন্থীরা ক্ষমতায় বসে। এটি ছিল লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন আরেকটি তরঙ্গ।

এ সময়ে ব্রাজিলের জইর বলসোনারো ও আর্জেন্টিনার মাউরিসিও মাক্রির মতো প্রেসিডেন্টরা খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দেন এবং লাতিন আমেরিকা-ইসরায়েল সম্পর্কের আদর্শিক সখ্যের প্রাসঙ্গিকতাকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলেন। আর্জেন্টিনার নতুন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেইয়ের রক্ষণশীল সরকারের অবস্থান জইর বলসোনারোর অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়।

মিলেই বেশ কয়েকবার ইসরায়েলের প্রতি তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দ্বিতীয় দফা নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ইসরায়েলের পতাকা ওড়ান।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিলেই প্রথম বিদেশ সফর করেন ইসরায়েলে। জেরুজালেমে তাঁর দেশের দূতাবাস খোলার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন, ইরান প্রতিশোধ নিলে ইসরায়েলের প্রতি দ্ব্যর্থহীন সমর্থন ঘোষণা করেন। এমনকি জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সদস্যপদ দেওয়ার বিরোধিতা করে আর্জেন্টিনার নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসেন তিনি।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মিলেইকে ইহুদি রাষ্ট্রের মহান বন্ধু বলে উচ্চসিত প্রশংসা করেন।

অভিবাসী রাজনীতি
আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে অভিবাসী রাজনীতি, বিশেষ করে ইসরায়েলি লবি দেশটির পররাষ্ট্রনীতি বদলে দিতে বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে, এমন তথ্য-প্রমাণ খুব একটা নেই।

দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনা একটা নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রেখে আসছিল। তারা যে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল—দুই রাষ্ট্র সমাধান চায়, এই নীতি ছিল তারই প্রতিফলন। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত ১৮১ (২) নম্বর প্রস্তাবটি ভোটদানে বিরত থাকে। এই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি দুই রাষ্ট্রে ভাগ করার কথা বলা হয়েছিল।

জাতিসংঘের ৩৩৭৯ নম্বর প্রস্তাবটিতেও ভোটদানে বিরত ছিল আর্জেন্টিনা। এই প্রস্তাবের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জায়নবাদ বর্ণবাদ ও বর্ণবাদী বৈষম্যের একটি রূপ।’ ২০১০ সালে জাতিসংঘে উত্থাপিত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রস্তাবে আর্জেন্টিনার সমর্থনটা ছিল অভিবাসী রাজনীতি থেকে পৃথক একটি বিষয়। স্থানীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতির ফলাফল ছিল সেটি।

এ ছাড়া ইহুদি সম্প্রদায় আর্জেন্টিনার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ। তারা নানা দলে বিভক্ত।

আর্জেন্টাইন সমাজের সঙ্গে ইহুদিদের মিশে যাওয়া এবং এই সম্প্রদায়ের মধ্যকার ভিন্নতা—এই দুই কারণে ইসরায়েলপন্থী এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশটির ইহুদিদের একত্র হওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাপারে অভিবাসী রাজনীতির চেয়ে মতাদর্শিক সখ্য ও নিরাপত্তাসহায়তা অনেক বড় ভূমিকা রাখে।

নিরাপত্তা সহযোগিতা
ইসরায়েল থেকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে অস্ত্র, নজরদারি সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ যে এসেছে সেটা ভালোভাবেই প্রমাণিত।

১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে ইসরায়েলের সংবাদপত্র হারেৎজে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ‘দেড় মাস সময়ের মধ্যে ইসরায়েলের তিনজন জেনারেল আর্জেন্টিনা সফর করেন।’ লাতিন আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যকার সামরিক সম্পর্ক নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ১৯৮১ সালের মধ্যে আর্জেন্টিনা ইসরায়েল থেকে অস্ত্র কেনা ১৭ শতাংশ বাড়িয়েছিল।

আর্জেন্টিনার কর্তৃত্ববাদী-আমলাতান্ত্রিক সরকারকে ইসরায়েল অস্ত্র বিক্রি করত। তারা আর্জেন্টিনায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট মাক্রির আমলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় ওঠে। সে বছরই ইসরায়েলের কাছ থেকে টহল নৌযান ও নজরদারি সরঞ্জাম কেনে আর্জেন্টিনা। নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। মিলেইয়ের আমলে সেটি আরও গভীর হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor