শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

বিনুদের মুরগি

প্রকাশিত: ০৬:২০, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ২

মুরগি দুটো এত উৎপাত শুরু করেছে! কখনো অভদ্রের মতো জোরে জোরে কু্ক্কুরু কু...উ বলে ডেকে উঠছে। আবার বেশ রাগের গলায় কক্ কক্ করে উঠছে।

সাথে সাথে বিনুও রেগে ওঠে, আরে, তোদের কি স্কুলে ভদ্রতা শেখায়নি? বিনু একটা মুরগির পিঠে একটা ছোট চাপড় মারে। এটা আবার নানির চোখ এড়ায় না। নানি চোখ গরম করে বলে ওঠে, এই, মুরগিকে মারলি কেন?
- কই মারলাম? বিনু জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় দোষ ঢাকার জন্য। মুরগিগুলো আবার ডেকে ওঠে যাচ্ছেতাইভাবে।

কিন্তু বিনু এবার আর মুরগিকে শাসন করে না। অবশ্য মুরগিগুলোর দোষ নেই। বাসে যা ভিড়! এই গরমে আর ভিড়ে মানুষেরই মুরগির মতো হাঁসফাঁস করে ডেকে ওঠার কথা। কিন্তু মানুষের মুরগির মতো ডাকার ক্ষমতা নেই।

তাই কষ্টসৃষ্ট হলেও মানুষ অনেক সময় মুখ বুজে কষ্ট সয়ে নেয়। মুরগির মতো ডেকে উঠতে পারে না।
বিনুকে আর নানিকে বিনুর বাবা সকালে বাসে উঠিয়ে দিয়েছে। সাভার থেকে ওরা যাবে মির্জাপুর। বিনুর মামা মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে ওদের নিয়ে যাবে।

বেশি দূরের পথ না। ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। ফোনে যোগাযোগ থাকবে। কোনো ব্যাপার না। আগেও বিনু ওর মায়ের সাথে এভাবে গেছে। আবার মায়ের বদলে নানি। মির্জাপুরে বিনুদের মামার বাড়ি। নানি এসেছিল বিনুদের বাসায় বেড়াতে, এখন ফিরে যাচ্ছে। পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ, তাই বিনুও সাথে যাচ্ছে। বিনু ক্লাস ফোরে পড়ে। বিনুর মা মায়ের সাথে মামার বাড়ির জন্য কিছু জিনিস দিয়েছে। তেমন কিছু না। সেরখানেক বাজরার ছাতু। গাছের ক্ষেতের লালশাক আর বরবটি। সাথে দুটো ছোট ছোট মুরগি। ড্রাইভারের পেছনের সিটে বসেছে ওরা। শাক আর বাজরার ব্যাগটা পায়ের নিচে রেখেছে। আর মুরগি দুটোও প্রথমে পায়ের নিচে রেখেছিল; কিন্তু ড্রাইভার নানিকে বলল, মুরগি ওপরে রাখেন, নাইলে গরমে ভাপ খাইয়া মইরা যাইব।
পাশের এক যাত্রী হেসে ওঠে ড্রাইভারের কথায়। বলে, বেশি গরম পাইলে রোস্টও হইয়া যাইতে পারে।

নানি রেগে ওঠে, হ, তখন তোমারে খাইতে ডাকুমনে। যতসব হাড় হাবাইত্তা!

মুরগি দুটোকে ইঞ্জিনের কাভারের ওপর রাখল।

বাসের গতি খুব ভালো; কিন্তু দশ হাত পর পর থামে। রাস্তা থেকে কেউ হাত ওঠালেই বাস থেমে পড়ে। আর বাস থামলে পেছন থেকে সব যাত্রী একবার করে চিৎকার করে ওঠে। কেউ বলে, ব্যাটা রিশকার ডেরাইভার! কিন্তু এসব নিয়ে বাসের ড্রাইভারের কোনো হেলদোল নেই। সে তার নিজের ইচ্ছামতোই বাস চালায়। একবার শুধু পেছনে তাকিয়ে বলে, এত হাড়াহাড়ি থাকলে পেরাইভেট গাড়ি কিইন্যা যান। এটা শুনে পেছনের যাত্রীরা তেড়ে ওঠে, ব্যাটা আবার কথা কয়...ফাঁক পেয়ে বিনুদের মুরগি দুটো আবারও ‘কুক্কুরু কু’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। এটা শুনে পেছনের একজন যাত্রী বলে, দ্যাখ ব্যাটা, তরে মুরগিও বকে! বাস যত যাচ্ছে তত গরম আর ভিড় বাড়ছে। এর মধ্যে আবার একজন হকার উঠে সমানে কথা বলতে শুরু করল, সম্মানিত যাত্রীগণ...আপনারা গরমে সিদ্ধ হইতে হইতে একবারে সিদ্ধ ডিম হইয়া যাইবেন। তার চাইতে এক শ টাকা দিয়ে আমার কাছ থেকে একটা চায়নিজ হাতফ্যান কিনেন। সিদ্ধ ডিম হওয়ার হাত থেকে বাঁচুন। কাঁচা ডিম হিসাবে বাড়ি যান।

কিন্তু এর মধ্যে আরেকজন যাত্রী উঠে ঘ্যাস্ করে মুরগির পাশে বসে পড়ল। এতে মুরগিগুলি চাপা পড়ার অবস্থা। বিনু তাড়াতাড়ি এক ঝটকায় মুরগি দুটো সরিয়ে আবার ব্যাগের ওপর রাখল। বাস যাচ্ছে।

বিনু হঠাৎ দেখে, মুরগিগুলো বাজরার ছাতুর পোঁটলা ভিজিয়ে ফেলেছে। সে নানিকে বলে, নানি, মুরগিগুলো তো ছাতুর পোঁটলা ভিজিয়ে ফেলছে!

নানি চোখ বড় বড় করে, আরে কী কইছিস? তাইলে তো লালশাক আর বরবটিও ভিজাইয়া ফেলছে! হায় হায়, এগুলি কি আর খাওয়া যাইব! নানি প্রায় কেঁদে ওঠে। তারপর হঠাৎ করেই মুরগি দুটোকে বেশ জোরে একটা চাটি মারল। মুরগিগুলো আরেকবার কক্ কক্ করে উঠল।

মির্জাপুর এসে গেছে প্রায়। যাত্রীরা উসখুস করছে নামার জন্য। বিনুর হঠাৎই চোখ গেল মুরগি দুটোর দিকে। ঘাড় নেতিয়ে আছে। বিনু বলল, নানি মুরগি তো মইরে গেছে!

নানি চিৎকার করে ওঠে, কেমনে, অ্যাঁ?

ড্রাইভার পেছন ফিরে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো বলে, গরমের ভাপে ইন্তেকাল করছে মনে লয়।

নানি ড্রাইভারকে খিঁচিয়ে উঠল, তুমি আর কথা কইয়ো না। সারা রাস্তা ঢ্যাপর ঢ্যাপর কইরা গাড়ি চালাইছ।

সব যাত্রী নেমে যাচ্ছে। ড্রাইভারকে বদদোয়া দিতে দিতে নানি নেমে আসে। সাথে বিনু। নানি আর বিনু বাস থেকে নেমে ব্যাগ চেক করে দেখতে পায় ছাতুর পোটলা, শাক, বরবটি সব মাখামাখি। নানি বলে, এহ্ হে সব গেল রে!

নানি বিনুর সাথে চোটপাট শুরু করে দিল, এই তুইই মুরগিগুলোকে প্রথমে থাপ্পড় মাইরা আধামরা করছস।

বিনু বলে, শেষেরটা তো তুমিই মারছ।

- আমি? আমার নাম দিতাছস? আমি মুরগি মারছি?

এর মধ্যেই ছোট মামা সামনে এসে দাঁড়ায়। নানিকে জিজ্ঞেস করে, মা, আসতে কোনো অসুবিধা হয় নাইতো?

নানি রেগে বলে, পুরাটাই সুবিধা হইছে। ফালতু কথা কবি না। এক থাপ্পড়ে দাঁত ফালায়া দিমু।

ভয়ে ছোট মামা গালে হাত দেয়। বিনুকে জিজ্ঞেস করে, বিনু, কী হয়েছে রে, ক...

বিনু সোজাসুজি বলে দেয়, নানি মুরগিকে থাবড়া দিয়ে মেরে ফেলেছে।

নানি আবার রাগে, আমি!

বিনুর ছোট মামা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলে, আরে না থাপ্পড়ে আবার মুরগি মরে যায় নাকি? চল, একটু মুরগির  ডাক্তার দেখাই। গরমে মনে হয় নেতিয়ে গেছে।

মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশেই পশু হাসপাতাল। ওরা তিনজন ঢুকতে যাবে এমন সময় দারোয়ান আটকায়, কই যাবেন? রোগী কই?

- এই যে, বলে বিনুর ছোট মামা ব্যাগে রাখা মুরগি দেখায়।

- মুরগির কী হইছে?

- আপনি কে? বিনুর মামা জানতে চায়।

- আমি এই অফিসের দারোয়ান। তবে চিকিৎসা করতে পারি। এই অফিসের সবাই ডাক্তারি করতে পারে। পিয়ন দারোয়ান সব্বাই ডাক্তার। ভিতরে যাওনের দরকার নাই, ভিতরে টাকা বেশি নিব। আপনি অফিসের পিছনে গিয়া দাঁড়ান, আমি আসতেছি।

- সবাই ডাক্তার! আচ্ছা।

তারা অফিসের পেছনে চলে আসে। একটু পরেই দারোয়ান-ডাক্তার সাব আসে। মুরগি দু-একবার হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করেই বলে ওঠে, মুরগি স্ট্রোক করছে।

এমন সময় বিনুর মামার কাছে ফোন আসে। মামা বলে, আসতে একটু দেরি হবে, মুরগি স্ট্রোক করেছে। বলে ফোন রেখে দেয়।

দারোয়ান এবার বলে, এর মধ্যে আমি নাই। মুরগি মনে লয় মইরা গেছে।

দারোয়ান-ডাক্তার সাব দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়। বিনুর মামা বলে, চল, কী আর করা। বাড়ি যাই। অটোরিকশায় উঠে সারা রাস্তা নানি বিনুর থাপ্পড়ের কথা বলতে লাগল।

বাসায় এসে দেখে কেউ নেই। ঘরদুয়ার ফাঁকা। শুধু পাশের বাসার খালেকের বুড়ি মা বসে কাঁদছে। বিনুর মামা বুড়ির কাছে জানতে চায়, বাড়ির সবাই কোথায়?

বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে জানায়, তর মায় ইস্টোক করছে। তারা হাসপাতালে গেছে।

নানি চিৎকার করে ওঠে, আমার ইস্টোক! এই যে আমি। বিনুকে জিজ্ঞেস করে, ঐ, আমার কি ইস্টোক করছে?

ছোট মামা আবার ফোন করে, ভাইয়া, আমরা সবাই বাসায়। তাড়াতাড়ি আইসা পড়ো। মা না তো, মুরগি স্ট্রোক করছে। তোমরা ভুল শুনেছ।

একটু পর বাড়ির সবাই কাঁদতে কাঁদতে বাড়িতে ঢোকে। এই কান্না আনন্দের। নানি মুরগির ব্যাগটা নিয়ে ভাগাড়ে ফেলে দেয়, এই অলক্ষ্মী মুরগির জইন্য সব গণ্ডগোল।

মুরগির সাথে মাখামাখি বাজরার ছাতু, লালশাক, বরবটি সবই গেল। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor