বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

কেন সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটনের এই হাল?

প্রকাশিত: ০৭:১০, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ২৪

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গলের সবুজ চা-বাগান কিংবা বান্দরবানের মেঘ-পাহাড়ের প্রকৃতি যেন নিজের সব সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে বাংলাদেশে। তবে রূপের এমন অপার লীলাভূমি হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ বহু যোজন পিছিয়ে।

বিদেশি পর্যটক টানা তো দূরের কথা, নানামুখী হয়রানি আর মাত্রাতিরিক্ত খরচের চাপে এখন দেশের পর্যটকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দেশীয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো থেকে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সর্বশেষ ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৬’-এ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে একদম তলানিতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে কোটি কোটি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা পকেটে পুরছে, সেখানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন বলতে গেলে নামমাত্র।

আন্তর্জাতিক পর্যটক তো দূরের কথা, সাধারণ দেশি পর্যটকদের জন্যও দেশে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ানোর ‘পরিবেশ নেই’।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সিন্ডিকেটের হয়রানি, অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া এবং নিম্নমানের সেবার বিপরীতে আকাশচুম্বী আবাসন খরচ সব মিলিয়ে পর্যটন খাত যেন এখন ‘আইসিইউ’-তে কাতরাচ্ছে।
কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন কিংবা বান্দরবানের মতো জনপ্রিয় স্পটগুলোতে ছুটির সময়ে ভ্রমণ করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা দিয়ে অনায়াসেই ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশগুলো ঘুরে আসা সম্ভব। ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে। 

এছাড়া বিভিন্ন পর্যটন স্পটে নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, বান্দরবানের বগালেক কিংবা কেওক্রাডং যাওয়ার পথে পাকা রাস্তা হয়ে গেলেও বাধ্যতামূলক গাইড নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। শুধু তাই নয়, গাইড ও গাড়িচালকের পারিশ্রমিকের পাশাপাশি তাদের থাকা-খাওয়ার খরচও বহন করতে হয় পর্যটকদের, যা বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ হলেও সঠিক পরিকল্পনা, দূষণ ও নদী ভরাটের কারণে নদ-নদীভিত্তিক পর্যটনের সুযোগগুলো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে দেশে নারীবান্ধব পর্যটন পরিবেশ এখনো অত্যন্ত সীমিত। নিরাপত্তার অভাব ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অসচেতনতার কারণে কক্সবাজার, সিলেটের মতো নির্ধারিত কয়েকটি স্থান ছাড়া পরিবার কিংবা নারী পর্যটকরা দেশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে যেতে চান না।

আর বিদেশি পর্যটক টানার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কিংবা বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের রূপ-সৌন্দর্য প্রচারের কোনো সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং নীতি নেই। বিদেশি ট্রাভেল সংস্থা ও পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণীয় স্থানগুলোর তথ্য সঠিকভাবে পৌঁছে না। 

এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার শঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নেতিবাচক খবর এবং ট্রাভেল অ্যাডভাইজরি অনেক সময় বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হোটেল ও খাবারের দাম আনুপাতিক হারে বেশি, যা বিদেশি পর্যটকদের কাছে ব্যয়বহুল মনে হয়। 

বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও বিনোদন চাহিদার কথা মাথায় রেখে নির্দিষ্ট কোন ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ নেই কক্সবাজার বা অন্য কোন পর্যটন স্থানে। এছাড়া বাংলাদেশের সংস্কৃতির আসল সৌন্দর্য তাদের সামনে তুলে ধরারও নেই তেমন কোন ব্যাবস্থা। 

এত অসুবিধার মধ্যেও পর্যটন খাত নিয়ে আছে আশা, আছে স্বপ্ন। অপার সম্ভাবনাময় এই খাতকে বাঁচাতে হলে সরকারকে নিতে হবে বড় পদক্ষেপ। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যেকোন সমস্যায় দ্রুততম সময়ে পর্যটন পুলিশের কার্যকর সমাধান দেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। 

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor