মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

বাসে প্রসাধনী বিক্রি করতেন ‘মুন্নাভাই’ খ্যাত এই অভিনেতা

প্রকাশিত: ০৬:১২, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮

‘মুন্নাভাই’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমাগুলো দেখে থাকলে তাকে চেনা সহজ। সিনেমায় দর্শকের কাছে তার ‘সার্কিট’ নামের চরিত্রটি ছিল অতি জনপ্রিয়। বর্তমানে তার জীবন জাঁকজমকে ঘেরা থাকলেও অতীত ছিল কঠিন সংগ্রামের। বলা হচ্ছে আরশাদ ওয়ারসির কথা। 

রঙিন দুনিয়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অনেক তারকারই অন্ধকার অতীত। আরশাদ ওয়ারসির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এমন। বাবা ছিলেন সংগীতশিল্পী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার, মাত্র ১৪ বছর বয়সেই মা-বাবা দুজনকেই হারান আরশাদ। এরপরই শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধ।

ছোটবেলার দিনগুলো আর দশটা সাধারণ শিশুর মতো ছিল না আরশাদের। মহারাষ্ট্রের নাসিকের একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়তেন তিনি। বেঁচে থাকার তাগিদে এই অভিনেতা পথে পথে ঘুরেছেন, বাসে বাসে বিক্রি করেছেন লিপস্টিক আর নেইলপলিশ। সেই প্রসাধনী বিক্রেতা ছেলেই আজ বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও গুণী অভিনেতাদের একজন। 

নিজের অতীত রোমন্থন করতে গিয়ে এই অভিনেতা জানান, তার জীবনের সেই সময়টা ছিল বেশ অদ্ভুত। বোর্ডিং স্কুল থেকে যখনই তিনি বাড়ি ফিরতেন, দেখলেন তাদের বাসা পরিবর্তন হয়ে গেছে। ১০-১২ বছর বয়সের সেই ছোট্ট আরশাদ বুঝতে পারতেন না আসলে কী ঘটছে। তাকে বলা হতো, পুরোনো বাসায় মেরামতের কাজ চলছে, তাই কদিনের জন্য এই নতুন ঠিকানা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যতবার তারা বাসা বদলাতেন, তাদের ঘরের আকার তত ছোট হতে থাকত। এক অন্তহীন দারিদ্র্যের চক্রে যেন আটকে গিয়েছিল তাদের পরিবার।

তরুণ আরশাদ ওয়ারসি
আর্থিক অনটনের কারণে দশম শ্রেণির পরই পড়াশোনার পাট চুকাতে হয় আরশাদকে। এরপর শুরু হয় পেটের দায়ে জীবনযুদ্ধ। রোজগারের আশায় মুম্বাইয়ের বোরিভালি থেকে বান্দ্রাগামী লোকাল বাসে উঠে যাত্রীদের কাছে লিপস্টিক ও নেইলপলিশ বিক্রি করতেন তিনি। কাজ করেছেন একটি ফটো ল্যাবেও। তবে নিজের অদম্য ইচ্ছা আর পরিশ্রমের জোরে একসময় মহেশ ভাটের ‘কাশ’ ও ‘ঠিকানা’ সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পান তিনি। মূলত সেখান থেকেই তার স্বপ্নের বীজ বোনা শুরু হয়। 

নিজের এই কঠিন পথচলা নিয়ে আরশাদ বলেছিলেন, জীবনটা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। সব কিছু নিজে থেকেই শিখেছেন, লড়েছেন প্রতিকূলতার সঙ্গে। তবে আক্ষেপের বদলে জীবনের প্রতি তার রয়েছে এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। 

তার মতে, জীবনটা যদি এত সহজ হতো, তবে হয়তো তিনি তা পুরোপুরি উপভোগই করতে পারতেন না।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সেই তুমুল লড়াইয়ের পর ২০০৩ সালে আসে আরশাদের জীবনের মোড় ঘোরানো সুযোগ। ব্লকবাস্টার হিট ‘মুন্নাভাই এম.বি.বি.এস’ সিনেমায় ‘সার্কিট’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে যান তিনি। সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে তার দুর্দান্ত রসায়ন ও নিখুঁত কমেডি টাইমিং মুহূর্তেই জয় করে নেয় দর্শকদের হৃদয়। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 

এছাড়াও ‘গোলমাল’ ফ্র্যাঞ্চাইজির ‘মানব’ কিংবা ‘ধামাল’ সিরিজের ‘আদিত্য শ্রীবাস্তব’, প্রতিটি চরিত্রেই তিনি ছড়িয়েছেন মুগ্ধতা। 

আরশাদ ওয়ারসি
অভিনেতা আরশাদ ওয়ার্সি তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত চলচ্চিত্র। বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে তার ক্যারিয়ারের গ্রাফ ছিল চোখে পড়ার মতো; যেখানে কমেডি ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে শুরু করে ওটিটি এবং অ্যাকশন-থ্রিলার জোনারে তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছেন। ২০২৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জলি এলএলবি ৩’ সিনেমার সাফল্যের পর ২০২৬ সালটি যেন পুরোপুরি আরশাদ ওয়ারসির দখলে। চলতি বছরেই বড় পর্দায় মুক্তি পেয়েছে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ ও ‘ধামাল ৪’-এর মতো বড় ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমা। সেই ধারাবাহিকতায়, সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে তার অভিনীত ডাবল রোলের ক্রাইম-কমেডি ‘জীবন ইয়া ভীমা কন?’ 

এই সিনেমার পর গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে তার সর্বশেষ অ্যাকশন-থ্রিলার চলচ্চিত্র ‘ঘমাসান’। এই সিনেমাটিতে প্রতীক গান্ধীর বিপরীতে তার অনবদ্য ও ডার্ক পারফরম্যান্স ভক্তদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

আরশাদ ওয়ারসির এই হার না মানা জীবন সংগ্রাম নিঃসন্দেহে হাজারো মানুষের জন্য যে এক বড় অনুপ্রেরণা, তা বলাই বাহুল্য।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor