ছবি: সংগৃহীত
গত ২৮ আগস্ট একাত্তর টিভির ‘বিজনেস উইকএন্ড’ অনুষ্ঠানে সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার এক সাক্ষাৎকার নেন উপস্থাপক ইকবাল আহসান। সেখানে অর্থ উপদেষ্টা জোরের সঙ্গে দাবি করেন, বর্তমানের সব সংকটই পতিত সরকারের তৈরি। তিনি আরও দাবি করেন, এই সরকার নাকি অতীতের সেই জঞ্জাল সাফ করছে।
উপদেষ্টা মহোদয় উন্নয়ন অর্থনীতির অধ্যাপক। কিন্তু তিনি তাঁর বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথকে প্রাসঙ্গিক করে ফেললেন, ‘যা–কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, “কেষ্টা বেটাই চোর।”’ তিনি বলেন, কোনো সংকটই সমসাময়িক নয়। সবই পুঞ্জীভূত সংকট। তাহলে কোনো উন্নতিও সমসাময়িক নয়। সবই অতীতের দান।
অর্থনীতির ইতিহাস আমাদের যা শেখায়, তা হলো চলমান কোনো সংকটের জন্য অতীতের শাসন দায়ী হতেই পারে। কিন্তু পতিত আওয়ামী সরকারের শাসন তো দুই বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। সংকট কি তাহলে মধ্যবর্তী ইউনূস সরকারের আমল লাফ দিয়ে পার হয়ে বিএনপির ঘাড়ে পড়ল? আওয়ামী লীগের সংকট তো ইউনূস সরকারের ঘাড়ে পড়ার কথা। উপদেষ্টা মহোদয় মাঝখানের দেড় বছরের শাসন নিয়ে কোনো কথা বলেননি।
স্বয়ং অর্থমন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেছেন, ১৮ মাসের শাসন অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। তথ্যও তা-ই বলে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ বেকারত্বের কবলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি—দুই-ই কমেছে। মবোক্রেসির স্বর্ণযুগে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ওপর এক উচ্চলম্ফ দিলেন।
এই জিডিপিকেই এখন বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১০০০ বিলিয়ন বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ৪৫০ বিলিয়নকে ধ্বংসের সমতুল্য বানিয়ে ফেললে তো বিপদ। উন্নয়ন একটি ক্রমসঞ্চয়মান প্রক্রিয়া। এখানে অতীতের ভালোমন্দ সবটাই স্বীকার করা জ্ঞানগত সৌজন্যের লক্ষণ। ১৯৫৮ সালে চীনের নেতা মাও সে-তুং মহালম্ফের তত্ত্ব দিয়েছিলেন দেশটির শিল্পায়নে। সেটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। কিন্তু অর্থ উপদেষ্টা দায় চাপানোর লক্ষ্যে যে সময়গত উচ্চলম্ফতত্ত্ব প্রদান করলেন, তা কি সঠিক মূল্য পাবে? আরেকজন উপদেষ্টাও বর্তমানের জ্বালানিসংকটের কোনো দায় বর্তমান সরকারের ঘাড়ে পড়বে না—এমন তত্ত্ব দিয়ে খ্যাতি পেয়েছেন। রাজনৈতিক বক্তব্যে আজকাল উপদেষ্টারা যেভাবে মাঠ গরম করছেন, তাতে সংসদ সদস্যদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ওই সাক্ষাৎকারে অর্থ উপদেষ্টা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন, তাঁরা একটি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ অর্থনীতি হাতে পেয়েছেন। যদি জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতা এ রকম মন্তব্য করতেন, তাহলে এর উত্তর দেওয়ার তাগিদ অনুভব করতাম না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির একজন শিক্ষক ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ শব্দটির সংজ্ঞা না বুঝে তা ক্রমাগত উচ্চারণ করে গেলে বুঝতে হবে, সরকার এ বয়ানই শুনতে চাইছে সমাজস্বীকৃত পণ্ডিতদের মুখ থেকে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ শব্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি এর সপক্ষে সরকারের কাছে দলিল দাবি করেছেন। এই সরকারের উচিত ছিল কোভিড-উত্তর গত পাঁচ বছরের অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে একটা ‘রিভিউ’ রচনা করে কাজ শুরু করা। তাতে আওয়ামী ও ইউনূস সরকার—দুটোই অন্তর্ভুক্ত করা যেত। পুরোনো শ্বেতপত্র থেকে সংখ্যা নিয়ে কথা বলতে হতো না।
যারা আগে বিনা মূল্যে শ্বেতপত্র করে দিয়েছে, সেই কমিটিকে আহ্বান জানালে তারাও হয়তো কাজটি করে দিত। ইউনূস সরকারের জ্ঞানীগুণীরা এতে বিরক্ত হবেন—সম্ভবত এ ভয়েই সরকার এই ‘স্টকটেকিং’-এর কাজটি থেকে বিরত থেকেছে। ভালো হোমওয়ার্ক ছাড়াই হঠাৎ কাজ শুরু করেছে। সে সুযোগে উপদেষ্টারা ‘নেকড়ে ও মেষশাবকের গল্প’ অনুসরণ করে একের পর এক ‘দায় চাপানোর তত্ত্ব’ দিয়ে যাচ্ছেন। এগুলোর কোথাও কোনো তথ্যের নামগন্ধ নেই।
ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি বা ‘ডেভাস্টেটেড ইকোনমি’র উদাহরণ খুঁজতে গিয়ে আমরা যদি গুগল সার্চ দিই বা এআইয়ের কাছে প্রশ্ন করি, তাহলে প্রধানত চারটি রাষ্ট্রগত দৃষ্টান্ত হাজির হয়। এগুলো হচ্ছে—১. যুক্তরাষ্ট্রে তিরিশের মহামন্দা, ২. বিশের দশকে জার্মানির উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ৩. মহালম্ফ ১৯৫৮-১৯৬২ কালপর্বে চীনের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও ৪. ১৯৯৮-২০০২ কালপর্বে আর্জেন্টিনার সংকট।
এখানে ধ্বংসপ্রাপ্তির প্রধান নির্দেশক হচ্ছে জিডিপির ব্যাপক সংকোচন ও অনাহার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিডিপি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে। অর্থাৎ সে দেশগুলোয় জিডিপি পেয়েছে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি, যা বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন ঘটেনি। তাহলে উপদেষ্টা মহোদয় এই ‘ইকোনমিক ডেভাস্টেশন’ আবিষ্কার করলেন কোন তত্ত্ববলে? উন্নয়ন অর্থনীতিতে কি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির আলাদা কোনো সংজ্ঞা আছে?
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশ বাজার অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির নতুন যুগে প্রবেশ করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই ৩৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ সময় মাত্র পাঁচটি বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি
তিনের কোঠায় নেমেছিল।
এই বছরগুলো হলো—১. বিএনপি ক্ষমতা নেওয়ার প্রথম বছর, অর্থাৎ ১৯৯১, ২. একই ক্ষমতাপর্বের আরেক বছর ১৯৯৪, ৩. বিএনপির আরেকবার ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতে অর্থাৎ ২০০২, ৪. আওয়ামী আমলে কোভিডের বছর ২০২০ ও সর্বশেষ ৫. ইউনূসের শাসনামলে ২০২৫ সাল। এই মন্দ প্রবৃদ্ধির বছরগুলোতেও কি কোনো অর্থনীতিবিদ বলেছেন যে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে?
বাংলাদেশের জন্য একমাত্র ১৯৭১ সাল ছাড়া আর কোনো বছর অর্থনীতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি। তখন প্রবৃদ্ধি নেমেছিল ঋণাত্মক ৫ দশমিক ৫ শতাংশে এবং ১৯৭২ তা ঋণাত্মক ১৪ শতাংশে নেমে যায়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে জিডিপি সংকোচনের মন্দতম রেকর্ড। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও অবকাঠামো ধ্বংসের পর প্রবৃদ্ধির এই রেকর্ড পতন অস্বাভাবিক ছিল না। সেই হিসাবে আজকের অর্থ উপদেষ্টা যদি ১৯৭৩ সালে দাঁড়িয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির গল্প শোনাতেন, তাহলে তা দালিলিক ভিত্তি পেত।
আওয়ামী লীগের শেষ বছর, ২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২২ শতাংশ হলেও তাদের শাসনের ১৬ বছর ২০০৯-২০২৪ কালপর্বে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। এখানে ধ্বংসপ্রাপ্তির আলামত কোথায়? আওয়ামী আমলে অর্থনীতিতে অনেক অনাচার হয়েছে—বিশেষ করে শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতে।
সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদেরা বিস্তর বলেছেন, লিখেছেন। আমারও একাধিক গ্রন্থ রয়েছে। কিন্তু কোথাও কেউ ভিত্তিহীন দাবিতে ফেটে পড়েননি। আবেগপ্রবণ নয়, গবেষকদের হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৬ সালের পর বিএনপি ৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানিয়ে গেছে। এরপর আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হাতে পেয়ে সেটিকে ২০২৪ সালে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানিয়ে গেছে। ২০২৫ সালে জিডিপি ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। ২০২৬ সালে এটি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি এসেছে বলে অনুমিত হয়।
এই জিডিপিকেই এখন বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১০০০ বিলিয়ন বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ৪৫০ বিলিয়নকে ধ্বংসের সমতুল্য বানিয়ে ফেললে তো বিপদ। উন্নয়ন একটি ক্রমসঞ্চয়মান প্রক্রিয়া। এখানে অতীতের ভালোমন্দ সবটাই স্বীকার করা জ্ঞানগত সৌজন্যের লক্ষণ।
একজন মন্ত্রী বা এমপি যা করতে পারেন বা বলতে পারেন, একজন উপদেষ্টার ক্ষেত্রে তা যথাযথ না-ও হতে পারে। একজন মন্ত্রী কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরবেন। পক্ষান্তরে একজন উপদেষ্টা তথ্য ও জ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ নিবেদন করবেন। গবেষণা দিয়ে মানুষকে সমৃদ্ধ করবেন।
Publisher & Editor