সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারকে আর্থিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি পেন্টাগনের

ইরান সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে নারাজ যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত: ০২:২৮, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলো প্রাপ্য বেতন ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জটিলতার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে এক সেনার বিধবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

মার্কিন বিমানবাহিনীর মেজর অ্যালেক্স ক্লিনার (৩৩) গত মার্চে ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহায়তার সময় বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ওই বিমানে থাকা ছয় সদস্যের সবাই নিহত হন।

অ্যালেক্সের স্ত্রী লিবি ক্লিনার অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি অতিরিক্ত কিছু সুবিধা পাওয়ার জন্য যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করায় তিনি কিছু সুবিধার জন্য যোগ্য নন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে লিবি বলেন, ‘আমার স্বামী যুদ্ধে থাকার কারণেই জীবন হারিয়েছেন। অথচ আমাকে বলা হয়েছে, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ নয় বলে আমরা কিছু সুবিধা পাব না।’ তার ভাষায়, বিষয়টি শুধু অর্থের নয়; এর সঙ্গে নীতির প্রশ্নও জড়িত।

লিবির এ অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মার্কিন বিমানবাহিনী বিষয়টি পরিষ্কার করে। কর্মকর্তারা জানান, অ্যালেক্সের শেষ বেতনেই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের জন্য অতিরিক্ত ভাতা এবং যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট কর-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে শুরুতে তাকে দেওয়া তথ্য সঠিক ছিল না বলে স্বীকার করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

বিমানবাহিনী জানায়, অ্যালেক্সের বেতনে মাসে ২২৫ ডলারের ‘কমব্যাট পে’ বা যুদ্ধকালীন ভাতাও ছিল। এই ভাতা পাওয়ার জন্য কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা প্রয়োজন হয় না। তবে তার শেষ বেতনপত্রে ভাতাটি ভুলভাবে দেখানো হয়েছিল।

লিবি বলেন, স্বামীকে হারানোর পর একটি পরিবারের জন্য সরকারি নিয়ম, পরিভাষা ও বিভিন্ন প্রক্রিয়া বোঝা অত্যন্ত কঠিন। শোকাহত কোনো পরিবারকে প্রাপ্য সুবিধা বুঝতে সরকারি ভাষার বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘অ্যালেক্স তার দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতেন। সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটলে তার পরিবার দেখভাল করা হবে-এই বিশ্বাস তার ছিল।’

মার্কিন সেনাদের বেতন ও বিভিন্ন ভাতা নির্ধারিত হয় তাদের মোতায়েনের স্থান, দায়িত্ব ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায়। ফলে একজন সেনার বেতন বছরে একাধিকবার পরিবর্তিত হতে পারে। এতে অনেক সময় পরিবারগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং ভুল তথ্য দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর পর ছয় মাসের বেশি সময়ে অন্তত ১৮ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৮০ জন আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

লিবির ঘটনা নিয়ে বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, ক্লিনার পরিবার যাতে প্রাপ্য সব সুবিধা পায়, তা নিশ্চিত করতে সরকার যতটা সম্ভব সহযোগিতা করবে।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা তাকে ভালোবাসি, তার আত্মত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞ এবং তাকে যা প্রয়োজন, তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি।’ তবে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানকে ‘যুদ্ধ’ বলতে রাজি হননি ভ্যান্স। তিনি দাবি করেন, সেখানে বর্তমানে ‘সক্রিয় গোলাগুলি’ চলছে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও শুক্রবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে ‘যুদ্ধ’ না বলে ‘সামরিক সংঘাত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলেন না। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ‘ছোটখাটো বিষয়’ এবং হামলা হচ্ছে বিরতিতে বিরতিতে।

এদিকে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পেন্টাগনের বিরুদ্ধে সংঘাতের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার অভিযোগও উঠেছে। কিছু পরিবার দাবি করেছে, আহত সেনাদের অনেককেই সামরিক বাহিনী যুদ্ধাহত হিসেবে বিবেচনা করছে না। তবে মার্কিন সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরান সংঘাতে মার্কিন সেনাদের আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। সেনা সদস্যরা দ্রুত দায়িত্বে ফিরতে পারলে এসব তথ্য প্রকাশে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের বাধ্যবাধকতা নেই।

এদিকে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। নিহত লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহানের (২৫) মা শারি ফিহান বলেন, ট্রাম্প তার সঙ্গে একজন সন্তানহারা মায়ের মতো করে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি একজন মায়ের মতো আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, যে তার সন্তানকে হারিয়েছে। তিনি আমার কষ্ট দেখেছেন।’

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor