শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

বিশ্বকাপ ২০২৬: বাকিদের বেলায় সমালোচনা, আমেরিকা হলেই চুপ

প্রকাশিত: ০৭:৩৬, ১২ জুন ২০২৬ | ১৩

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আগে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও জার্মানির মতো বহু দেশের ফুটবল ফেডারেশন আয়োজক দেশের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তৈরি হয় বিশেষ আর্মব্যান্ড। দেওয়া হয় একের পর এক বিবৃতি। আমাদের বোঝানো হয়েছিল, ফুটবল মানে শুধু গোল দেওয়া নয়, কিছু মূল্যবোধও থাকে। গোটা আসরটা কাতারের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে উঠেছিল।

এখন ২০২৬ সাল। বৈপরীত্যটা এড়ানো অসম্ভব।

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে সোমালি রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অথচ তাঁর কাছে বৈধ ভিসা ছিল। ফিফা মনোনীত আরতান এবারই প্রথম পুরুষ বিশ্বকাপে সোমালিয়ার কোনো রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ফিফা নিশ্চিত করেছে, তিনি পুরো টুর্নামেন্ট মিস করবেন। কারণ, সব রেফারিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ট্রেনিং বেস থেকে কাজ করতে হবে।

আরতান কোনো সাধারণ রেফারি নন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাদ পড়ার মতো সাধারণ কর্মকর্তা তিনি নন। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস মাতানো আফ্রিকার অন্যতম সেরা রেফারি তিনি। গত বছরই তিনি আফ্রিকার বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি হয়েছেন। অথচ তাঁর বিশ্বকাপ স্বপ্ন ফুটবল মাঠে নয়, শেষ হলো অভিবাসন ডেস্কে।

এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া কেমন? পিনপতন নীরবতা।

যদি এটা আমেরিকা না হতো?

সাবেক টেনিস তারকা মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা একমাত্র ক্রীড়াবিদ, যিনি এ নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু ২০২২ সালের আগে কাতারের বিরুদ্ধে যেভাবে নৈতিক ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছিল, সেই তুলনায় এবার নীরবতা চোখে পড়ার মতো।

এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন, কাতার যদি বিশ্বকাপের প্রাক্কালে কোনো রেফারিকে তাঁর জাতীয়তা, ধর্ম বা লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে প্রবেশাধিকার না দিত, তবে কী হতো? বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠত। সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয়, রাজনীতিক ও ক্রীড়া সংস্থাগুলো জবাবদিহি চাইত। কিন্তু আয়োজক দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্র, তখন নিয়মকানুনগুলো হঠাৎ যেন নমনীয় হয়ে যায়।

আরতানের ঘটনাটি মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।

ইরান বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে আছে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ফেডারেশন সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট টিকিট পায়। ইরানের দাবি, তাদের সেই টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের সাংবাদিক, কর্মকর্তা এবং টিকিট থাকা সমর্থকেরাও ভিসা জটিলতা নিয়ে অভিযোগ করেছেন।

গত সপ্তাহে ইরাকি স্ট্রাইকার আইমেন হুসেনকে শিকাগোতে নামার পর প্রায় সাত ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর ফোনও তল্লাশি করা হয়। দলের আলোকচিত্রীকে ১০ ঘণ্টার বেশি আটকে রেখে শেষ পর্যন্ত দেশটিতে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধের পটভূমিতেই এসব ঘটছে। নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ইবোলা প্রাদুর্ভাবের মতো বিষয়গুলোকে কঠোর প্রক্রিয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনের আরেকটি ঘটনার সঙ্গে এর পার্থক্য বেশ স্পষ্ট।

সর্বজনীন মূল্যবোধ, তবে প্রয়োগে দ্বিমুখী নীতি
২০১৯ সালের ঘটনা। পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার পর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শুটিং বিশ্বকাপে পাকিস্তানি শুটারদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত ও কঠোর। তারা ভারতে ভবিষ্যতের সব আসর নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে। আন্তর্জাতিক ফেডারেশনগুলোকে ভারতে অলিম্পিক বাছাইপর্বের কোনো প্রতিযোগিতা আয়োজন না করতে বলা হয়। বার্তাটি পরিষ্কার ছিল: আয়োজক দেশগুলো বাছাই করে কাউকে বাদ দিতে পারবে না।

কিন্তু আয়োজক যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ, তখন এই নীতি প্রয়োগ করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

কাতারের সমালোচনা করা সহজ ছিল। কারণ, এর পেছনে কোনো ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বা ক্ষতি ছিল না। কিন্তু বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আলাদা। ফিফার বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই উত্তর আমেরিকার বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সম্প্রচারক, স্পনসর ও ক্রীড়া সংস্থা, সবাই জানে ক্ষমতার উৎস কোথায়। দোহার সমালোচনা করলে ক্ষতি ছিল না, কিন্তু ওয়াশিংটনের সমালোচনা করা একেবারেই ভিন্ন বিষয়।

এর মানে এই নয় যে কাতারের সব সমালোচনা ভুল ছিল। অনেক সমালোচনাই যৌক্তিক ছিল। আবার এর মানে এটাও নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অসম্ভব কোনো মানদণ্ড আশা করা হচ্ছে। প্রতিটি আয়োজক দেশেরই নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ ও অভিবাসন চ্যালেঞ্জ থাকে।

কিন্তু ধারাবাহিকতা থাকা জরুরি।

সমস্যা কাতারের সমালোচনা করা নিয়ে নয়। সমস্যা হলো অন্য কোথাও একই ধরনের প্রশ্ন উঠলে সেই সমালোচনা উধাও হয়ে যায়।

ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার অনেক পরও এই বিশ্বকাপের স্মৃতি শুধু ফুটবল নিয়ে থাকবে না। বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনের একটি নগ্ন সত্য উন্মোচনের জন্যও এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সত্যটি হলো নীতি এখানে সবার জন্য সমান নয়, ক্ষোভ এখানে বেছে বেছে প্রকাশ করা হয় এবং নৈতিকতা নির্ভর করে ক্ষমতার ওপর।

এটা শুধু ফুটবলের বিষয় নয়
এর প্রভাব শুধু ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আর মাত্র দুই বছর পর লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০২৮ সালের অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ মাসগুলোতে এই আয়োজন হতে পারে। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশগুলোর ক্রীড়াবিদ, কোচ, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদেরও তখন সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হবে।

অলিম্পিক সনদে সর্বজনীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে। অভিবাসন নীতির সামনে সেই প্রতিশ্রুতি টিকিয়ে রাখাই হবে এই গেমসের সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

আগের বিশ্বকাপগুলো দেখিয়েছে, খেলা শুরু হলেই বিতর্ক কীভাবে ফিকে হয়ে যায়। মাঠের নাটকীয়তা সব ঢেকে দেয়। দারুণ সব গোল, আন্ডারডগদের গল্প আর রোমাঞ্চকর ম্যাচ রাজনীতিকে পেছনে ঠেলে দেয়।

এবারও হয়তো তা-ই হবে। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার অনেক পরও এই বিশ্বকাপের স্মৃতি শুধু ফুটবল নিয়ে থাকবে না। বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনের একটি নগ্ন সত্য উন্মোচনের জন্যও এটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সত্যটি হলো নীতি এখানে সবার জন্য সমান নয়, ক্ষোভ এখানে বেছে বেছে প্রকাশ করা হয় এবং নৈতিকতা নির্ভর করে ক্ষমতার ওপর।

মাঠের যেকোনো ফলাফলের চেয়ে এটাই ২০২৬ বিশ্বকাপকে এক ‘ভণ্ডামির বিশ্বকাপ’ হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor