বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

আজ হরমুজ, কাল কি তাইওয়ান?

প্রকাশিত: ০৯:২৮, ২২ এপ্রিল ২০২৬ | ১১

পৃথিবীর মোট পরিধি প্রায় ২৫ হাজার মাইল বা ৪০ হাজার কিলোমিটার। এ তথ্য আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাধারণত আমাদের শেখানো হয় না। তা হলো এই বিশাল পৃথিবীর অর্থনীতি আসলে নির্ভর করে মাত্র ১০০ মাইলের মতো কয়েকটি সংকীর্ণ পথের ওপর। এই পথগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো হরমুজ প্রণালি ও তাইওয়ান প্রণালি। এ দুটি জলপথ যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি হঠাৎ অনেক বছর পিছিয়ে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন ইরানকে ‘প্রস্তরযুগে ফেরত পাঠানোর’ কথা বলেছেন, ততটা না হলেও অন্তত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, যখন রোলিং স্টোনসের গানও শুরু হয়নি, সেই সময়ে ফিরে যাওয়া অসম্ভব নয়।

গত দেড় মাসে ইরান হরমুজ প্রণালিকে প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ মাইল। এখানে এখন জাহাজ চলাচল ভীষণভাবে কমে গেছে। তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ভয়ে থেমে থাকে, আর ইরানের ছোট নৌকা ও ড্রোনগুলো চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, যেন জলদস্যু। ফলে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। কারণ, বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি এই পথ দিয়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়ছে। কিন্তু বিষয়টি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। এটি আসলে এশিয়ায় সম্ভাব্য বড় সংঘাতের একটি মহড়া। চীন এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাইওয়ানকে ঘিরে একই ধরনের কৌশল নিতে পারে।

তাইওয়ান প্রণালি সবচেয়ে সরু জায়গায় প্রায় ৮১ মাইল চওড়া। তবে এর গুরুত্ব তেলের জন্য নয়। এর গুরুত্ব প্রযুক্তির জন্য। তাইওয়ানের টিএসএমসি কোম্পানি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপের ৯০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে। এই চিপই আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যুদ্ধবিমান, স্মার্টফোন—সবকিছুই এর ওপর নির্ভরশীল।

এই নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ পাস করে, যাতে দেশেই চিপ উৎপাদন বাড়ানো যায়। টেক্সাস, ওহাইও ও নিউইয়র্কে নতুন কারখানার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ তাইওয়ানের চিপের ওপর নির্ভরশীল।

এ কারণে যদি চীন তাইওয়ানকে অবরোধ করে বা আক্রমণ চালায়, তাহলে পুরো বিশ্বের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এটি কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক মন্দা নয়, বরং পুরো সরবরাহব্যবস্থার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য স্মরণীয় হতে চান না। তিনি চান ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করতে। তাঁর লক্ষ্য—মাও সে–তুংয়ের ঘোষিত ‘এক চীন’ নীতি পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে তিনি ৭৫ বছরের অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে চান এবং চিয়াং কাই-শেকের উত্তরসূরিদের আবার চীনের অংশ করতে চান।

এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কতটা দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করবে। যদি সি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধাগ্রস্ত হবে বা শেষ পর্যন্ত পিছু হটবে, তাহলে চীনের জন্য আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে যাবে।

সহজ প্রশ্নটা হলো—যদি যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়েও ইরানের মতো একটি তুলনামূলক দুর্বল দেশের বাধা অতিক্রম করে হরমুজ প্রণালি নিরাপদ রাখতে না পারে, তাহলে কেন চীন বিশ্বাস করবে যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য বড় যুদ্ধের ঝুঁকি নেবে?

এ অবস্থায় তাইওয়ান আর শক্ত দুর্গ মনে হবে না, বরং অনিশ্চিত এক প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি’—আপনি যা বলছেন, তা সত্যিই করবেন—এই বিশ্বাস প্রতিপক্ষের মধ্যে তৈরি করতে না পারলে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। হরমুজ প্রণালিকে শক্তি প্রয়োগ করে আবার পুরোপুরি চালু করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও জাহাজ নির্মাণ করতে হবে, অস্ত্রভান্ডার বাড়াতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের পথ তৈরি করতে হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে পাইপলাইন প্রকল্প বাড়াতে হবে, যাতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীর অধিকারী এবং অর্থনৈতিক শক্তিও তার হাতে রয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত যেন একধরনের অনুশীলন। আসল পরীক্ষা হবে তাইওয়ানকে ঘিরে পরিস্থিতি।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor