সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

হরমুজ যেভাবে বদলে দিচ্ছে চীনের তাইওয়ান সমীকরণ

প্রকাশিত: ০৮:২৯, ২০ এপ্রিল ২০২৬ |

ইরান তাদের পূর্ণশক্তির নৌবাহিনী ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অচল করে দিয়েছে। কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ফলে আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলো নিশ্চিত হয়েছে, এই পথে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানকে কোনো আনুষ্ঠানিক অবরোধ ঘোষণা করতে হয়নি, তবু এই সমুদ্রপথ বন্ধ হয়ে গেছে।

বেইজিংয়ের জন্য এ ঘটনা অনেক বড় একটি শিক্ষা। চীনের সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা দীর্ঘকাল ধরে তাইওয়ানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা এখন একটি সফল মডেল বা বাস্তব উদাহরণ খুঁজে পেয়েছেন।

বিশ্বের একটি বড় বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করতে বা যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে কেবল যুদ্ধজাহাজ ডোবানোর প্রয়োজন নেই। বেসরকারি খাতে কেবল চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করলেই চলে। মার্কিন প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি রাখেনি এবং এই যন্ত্রণা লাঘব করার কোনো সঠিক পরিকল্পনাও তাদের হাতে নেই।

ওয়াশিংটন হয়তো যুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ানকে ছেড়ে দিতে পারে। তবে তারা যদি প্রতিরোধের চেষ্টা করে, তবে বিশ্বজুড়ে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হরমুজ প্রণালির চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ হবে। তেলের বিকল্প বা দীর্ঘমেয়াদি মজুত থাকে, কিন্তু সেমিকন্ডাক্টরের বিষয়টি তেমন নয়। এগুলো তেলের মতো দীর্ঘদিন মজুত করে রাখা সম্ভব নয়। কারণ, সময়ের সঙ্গে চিপসের প্রযুক্তিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে।

আমেরিকার শত্রুরা তাদের এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থেকে মোকাবিলা করছে। ওয়াশিংটনকে দ্রুত এই সংকট নিরসনের পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে মার্কিন স্বার্থ বারবার জিম্মি ও হুমকির মুখে পড়বে।

বহু বছর ধরে ওয়াশিংটনে তাইওয়ান নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল কেবল একটি প্রশ্ন, আর তা হলো চীন কি সফলভাবে তাইওয়ান আক্রমণ করতে পারবে?

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্প্রতি জানিয়েছে, চীনের পক্ষ থেকে তাইওয়ানে আক্রমণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এই সংবাদ অনেককে আশ্বস্ত করলেও তারা আসলে ভুল করছে। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো চীন এখন মনে করছে যে তাইওয়ানে পূর্ণাঙ্গ কোনো সামরিক অভিযানের হয়তো আর প্রয়োজন নেই।

ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে যা করছে, বেইজিংয়ের হাতে তার চেয়েও উন্নত ও পরিশীলিত বিকল্প ব্যবস্থা আছে। উদাহরণ হিসেবে এমন একটি পরিস্থিতির কথা ভাবা যাক, যেখানে চীন তাইওয়ানের চারপাশের জলসীমায় নিজস্ব আইনি নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করল। এরপর তারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাল।

একই সঙ্গে বেইজিং দাবি করল, তারা জাহাজগুলোতে তল্লাশি চালাবে। এমন পদক্ষেপে হয়তো যুদ্ধ শুরু হবে না, তবে আন্তর্জাতিক বিমা বাজারের প্রতিক্রিয়া ঠিক তেমনি হবে, যেমনটি আমরা এখন হরমুজ প্রণালিতে দেখছি।

সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ‘ফাইভ পাওয়ার ক্লজ’ নামে একটি নিয়ম রয়েছে।

যদি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া বা চীনের কোনো সংঘাত তৈরি হয়, তবে জাহাজগুলো কোনো বিমা সুবিধা পায় না। যারা ইরানের ড্রোন আক্রমণের আশঙ্কায় জাহাজ চালায় না, তারা নিশ্চিতভাবে চীনা সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য হামলার মুখে তাইওয়ানের আশপাশে যাওয়ার ঝুঁকি নেবে না।

ফলে তাইওয়ানের বাণিজ্য একপ্রকার থমকে যাবে। এর আওতায় পড়বে পৃথিবীর সেই সব কারখানা, যেগুলো বিশ্বের ৯০ শতাংশ উন্নত মানের সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপ তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি চীনের এই আধিপত্য মেনে নেবে, নাকি একটি মহাযুদ্ধের ঝুঁকি নেবে।

ওয়াশিংটন হয়তো যুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ানকে ছেড়ে দিতে পারে। তবে তারা যদি প্রতিরোধের চেষ্টা করে, তবে বিশ্বজুড়ে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হরমুজ প্রণালির চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ হবে। তেলের বিকল্প বা দীর্ঘমেয়াদি মজুত থাকে, কিন্তু সেমিকন্ডাক্টরের বিষয়টি তেমন নয়। এগুলো তেলের মতো দীর্ঘদিন মজুত করে রাখা সম্ভব নয়। কারণ, সময়ের সঙ্গে চিপসের প্রযুক্তিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে।

তাইওয়ানে এমন সব চিপ তৈরি হয়, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। তাইওয়ানের সঙ্গে এই সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লে অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ ও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের প্রতিটি ক্ষেত্র স্থবির হয়ে পড়বে। তেলসংকটের জন্য জরুরি তহবিল বা আইইএর মতো সংস্থা থাকলেও সেমিকন্ডাক্টরের ক্ষেত্রে তেমন কোনো রক্ষাকবচ নেই।

দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকার সামর্থ্যেও চীন এখন অনেক এগিয়ে। তারা বছরের পর বছর ধরে তেল, খাদ্যশস্য ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতব খনিজের মজুত গড়ে তুলছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘কেল্লা অর্থনীতি’। ২০২২ সাল নাগাদ চীনের কাছে বিশ্বের ৬৯ শতাংশ ভুট্টা, ৬০ শতাংশ চাল ও ৫১ শতাংশ গম মজুত ছিল।

সি চিন পিং পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানিগুলোকে তেল মজুত বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের লক্ষ্য হলো যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় গণতান্ত্রিক মিত্রদেশগুলোর চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকা।

এখন পর্যন্ত এই সংকট মোকাবিলার জন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত কোনো প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে না। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মিত্রদের সাহায্য করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যে বিমা কর্মসূচি চালুর চেষ্টা করেছে, তা–ও ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে মিত্রদেশগুলো জরুরি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এখন একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

তাইওয়ানকেন্দ্রিক যেকোনো সংকট চোখের পলকে বিশ্ব অর্থনীতিকে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কেবল চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা করাই যথেষ্ট নয়। এর বদলে নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। মিত্ররাষ্ট্রগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় চিপ ও যন্ত্রপাতির নিজস্ব মজুত তৈরি করতে হবে। সংকটের মুহূর্তে যেন দ্রুত একে অপরকে সাহায্য করা যায়, সেই লক্ষ্যে একটি অগ্রিম সামরিক ও লজিস্টিক চুক্তি থাকা প্রয়োজন। আমাদের প্রস্তুত হতে হবে এখন থেকেই, সংকট যেন দরজায় এসে করাঘাত না করে।

Mahfuzur Rahman

Publisher & Editor