বাংলাদেশের শ্যুটিংয়ে যখন নতুন প্রজন্মকে ঘিরে প্রত্যাশা বাড়ছে, ঠিক তখনই উদ্বেগজনক খবর। জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত দুই শ্যুটার অর্ণব শারার ও শোভন চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। এ নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। অর্ণব জাতীয় দলের ক্যাম্পে ছিলেন।
ফেডারেশন কিংবা কোচ-কেউই জানেন না তার অবস্থান। সপ্তাহখানেক আগে বাবার নির্বাচনের জন্য ক্যাম্প থেকে ছুটি নিয়েছিলেন অর্ণব। এমনটাই জানালেন ভারতে অবস্থানরত জাতীয় শ্যুটিং কোচ শারমিন আক্তার। অর্ণবের কয়েকজন সতীর্থের দাবি, ‘দুজন আমেরিকা গেছেন। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ।’
অর্ণবের হোয়াটসঅ্যাপে বারবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। শ্যুটিংয়ের মতো সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিনির্ভর ক্রীড়ায় খেলোয়াড়ের ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ক্যাম্প, অনুশীলন সূচি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন শ্যুটারের অবস্থান। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ দুজন সম্ভাবনাময় শ্যুটারের দেশের বাইরে চলে যাওয়ার খবর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ক্রীড়াসংশ্লিষ্টদের মতে, সমস্যা শুধু দুজন খেলোয়াড়কে নিয়ে নয়, বরং এটি দেশের শ্যুটিং ব্যবস্থাপনায় বড় একটি প্রশ্নচিহ্ন। খেলোয়াড়রা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, শিক্ষা বা পেশাগত কারণে দেশের বাইরে যেতে বাধ্য হন, তবে সেটি নীতিগত আলোচনার দাবি রাখে।
আবার যদি কোনো যোগাযোগ ঘাটতি বা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে এমন প্রস্থান ঘটে, সেটিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের শ্যুটিং দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধা, অর্থনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় প্রতিভাবান শ্যুটারদের ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। অর্ণব ও শোভনের সম্ভাব্য প্রস্থান সেই চ্যালেঞ্জকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
এখন সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা-খেলোয়াড়দের কাছ থেকে যেমন, তেমনই সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের কাছে থেকেও। নীরবতা এখানে সমাধান নয়। কারণ, প্রতিটি অনিশ্চিত প্রস্থান ভবিষ্যতের আরেকটি প্রতিভাকে অনুপ্রাণিত নয়, বরং নিরুৎসাহিত করতে পারে।
নীরব নিশানায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল অর্ণবের। শ্যুটিং এমন এক খেলা, যেখানে শব্দ কম, চাপ প্রচণ্ড। প্রতিটি ট্রিগার টানার আগে শ্যুটারকে জিততে হয় নিজের স্নায়ুর সঙ্গে। সেই নীরব লড়াইয়ে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন অর্ণব। অল্প বয়সে শ্যুটিং রেঞ্জে তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মনোযোগ, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা-এই তিন শক্তিতে অর্ণব গড়ে তুলেছিলেন নিজের পরিচয়। প্রতিযোগিতার মঞ্চে নামার আগে দীর্ঘ সময় অনুশীলন, স্কোরের ওঠানামা সামলে নিজেকে ঠিক রাখা-সব মিলিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, শ্যুটিং শুধু হাতের নয়, মাথারও খেলা। কোচদের মতে, অর্ণবের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিক স্থিরতা। চাপের মুহূর্তে অন্যরা যখন তাল হারায়, তখন অর্ণব আরও গুছিয়ে নেন নিশানা। জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত অনুশীলন আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন বড় মঞ্চের জন্য। বাংলাদেশের শ্যুটিং অঙ্গনে নতুন প্রজন্মের যে কয়েকজনের নাম আলোচনায় আসছে, অর্ণব তাদের একজন। দেশের পতাকা বুকে নিয়ে আন্তর্জাতিক রেঞ্জে দাঁড়ানোর স্বপ্নটাই তাকে প্রতিদিন ট্রিগারের সামনে দাঁড় করাত।
শ্যুটিং রেঞ্জে প্রতিটি শটের আগে হৃদয়স্পন্দন বেড়ে যায়। জয়-পরাজয়ের ফারাক তৈরি হয় শ্বাস, চোখের স্থিরতা এবং এক সেকেন্ডের সিদ্ধান্তে। ঠিক সেই নিঃশব্দ ও চাপময় খেলা নিয়েই ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলাদেশের উদীয়মান শ্যুটার শোভন চৌধুরী। ১০ মিটার এয়ার রাইফেল আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শ্যুটিং ডিসিপ্লিনগুলোর একটি। লক্ষ্যবস্তু কাছে হলেও চাপ বহুগুণ। প্রতিটি শটের আগে প্রয়োজন নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্থিরতা এবং একাগ্রতা। শোভন অনুশীলন রেঞ্জে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন। একের পর এক শট, ভুল বিশ্লেষণ করে ফের শুরু-কঠোর শৃঙ্খলা তার প্রতিদিনের সঙ্গী। কোচদের মতে, তার সবচেয়ে বড় শক্তি ধৈর্য ও একাগ্রতা। স্কোর ওঠানামা করলেও দমে যাননি শোভন। প্রতিটি ব্যর্থতাকে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসাবে দেখতেন। জাতীয় পর্যায়ের নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শোভন নিজেকে বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। নীরব এই খেলায় আলো আসে ধীরে। শিরোনামে নাম ওঠা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু যারা প্রতিদিন নিঃশব্দে নিজেদের তৈরি করেন, তারাই পান সাফল্য। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে শোভনও সেই পথেই হেঁটেছিলেন-দৃঢ়প্রত্যয়ে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শ্যুটিং ফেডারেশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। সে সময় জাতীয় দলের শ্যুটার শোভন চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘লোহা দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হলে জং ধরে যায়; কিন্তু একটু ঘষামাজা করলেই তা আগের মতো চকচকে হয়ে ওঠে। কিন্তু একজন খেলোয়াড়? যে বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে, অগণিত ত্যাগ স্বীকার করে নিজের অবস্থান তৈরি করে, তার জন্য কি ফিরে আসা এত সহজ? শ্যুটিং আমাদের গৌরবের খেলা, অথচ শ্যুটারদের অনুশীলন নেই, নেই কোনো লক্ষ্য, দিকনির্দেশনা। অন্য সব খেলাধুলা যখন চলমান, আমাদের শ্যুটাররা শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারছে না।’ নীরব এই খেলায় যেমন নিশানা ঠিক রাখতে হয়, তেমনি নীতিগত সিদ্ধান্তেও চাই স্পষ্টতা। অর্ণব ও শোভনের যুক্তরাষ্ট্র-যাত্রা নিঃসন্দেহে দেশের শ্যুটিংয়ের জন্য অশনিসংকেত।
Publisher & Editor